প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপির কাছে কার্যকর প্রতিশ্রুতি চায় বিদেশিরা

বাংলা ট্রিবিউন : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কিনা, তা পরিষ্কারভাবে জানতে চেয়েছেন বিদেশি কূটনীতিকরা। দলটির বন্ধু ও উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্রগুলো মনে করে, নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কাছে বিএনপির দাবি জানানো প্রয়োজন। এরমধ্য দিয়ে শাসকদল বিএনপির অধিকাংশ প্রস্তাব মেনে নিতে পারে। ইতোমধ্যে বিএনপিসহ ৪ দলীয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে সংলাপে সম্মতি জানিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। শিগগিরই আলোচনার স্থান ও সময় নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।

সম্প্রতি বিএনপির নীতি-নির্ধারণী ফোরাম—স্থায়ী কমিটিকে লেখা এক চিঠিতে এ বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে দলটির ফরেইন অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এফএসি, বিদেশি বিষয়ক কমিটি)। যদিও এ চিঠি স্থায়ী কমিটির একজন সদস্যকে দেওয়ার পর তা আর ফোরামের টেবিলে আলোচনায় ওঠেনি। আর এই সদস্যের মন্তব্য না পাওয়ায় তার নামটি অনুল্লেখ থাকলো।

ফরেইন অ্যাফেয়ার্স কমিটি-সূত্র বলছে, গত ২১ আগস্ট এই বিশেষ চিঠিটি দেওয়া হয় স্থায়ী কমিটির একজন সদস্যের কাছে। ওই সদস্য আর ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করেননি। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ কারণে কিছুই বলতে পারলেন না। গত ২৬ অক্টোবর বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কোনও চিঠির খবর জানি না। তাই এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না।’

ফরেইন অ্যাফেয়ার্স কমিটির আহ্বায়ক ইনাম আহমেদ চৌধুরী গত আড়াই মাস ধরে বিদেশে থাকায় তিনিও এ বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না।’

স্থায়ী কমিটিকে লেখা চিঠিতে ফরেই উইং কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করে। ‘বিদেশ বিষয়ক কমিটির পক্ষ থেকে ‘বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সম্মানিত সদস্যদের প্রতি’ শীর্ষক চিঠিতে বলা হয়, ‘কয়েক মাস ধরে বিদেশ বিষয়ক কমিটি (এফএসি) আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে থাকা আমাদের সব বন্ধু ও উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে প্রায় একই ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। আর তাদের প্রায় সবাই কোনও ধরনের আকাঙ্ক্ষা ছাড়াই আমাদের একই ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন।’

চিঠিতে আরও বলা হয়, আমাদের (ফরেইন অ্যাফেয়ার্স কমিটি) সবসময় যে প্রশ্নটি করা হচ্ছে, তা হলো, বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা। কৌশলগত কারণে, আমরা সবসময় কায়দা করে সরাসরি উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থেকেছি। আমাদের দলের অবস্থানের সঙ্গে একই সুরে কথা বলেছি। আমরা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশের বিষয়টিকে সামনে এনেছি।

কমনওয়েলথ সেক্রেটেরিয়েট প্রতিনিধিদের সঙ্গে গত কয়েক মাসের বৈঠক ও আলোচনায় কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের দাবি জানানো হয়েছে। কমনওয়েলথ প্রতিনিধিরা বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার শর্ত হিসেবে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট বিষয় নির্ধারণ করার জন্য আমাদের বলেছেন। এসব শর্ত পূরণ করা হলে বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে, এ বিষয়ে তারা আমাদের কাছে কার্যকর প্রতিশ্রুতিও চেয়েছেন। কমনওয়েলথ প্রতিনিধিরা আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ক্ষমতাসীন দলের কাছে পেশ করার কথা বলেছেন। তারা এই ধারণা নিয়ে আছে যে, শাসক দল আমাদের এসব প্রস্তাবের বেশকিছু বিষয় মেনে নেবে।

কমনওয়েলথের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট সংস্থাটির সদস্য দেশগুলোয় গণতন্ত্র, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার, সুশাসন, সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ও তরুণদের ক্ষমতায়নে কাজ করে।

এ বছরের ১৬ এপ্রিল লন্ডনে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সম্মেলনের আগে সংস্থাটির ৫৩টি রাষ্ট্রের কাছে একটি চিঠি দেয় বিএনপির ফরেইন অ্যাফেয়ার্স কমিটি। ওই চিঠিতে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পরিবেশ, খালেদা জিয়ার বিচার প্রক্রিয়া ও আগামী সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়। পরবর্তী সময়ে কমনওয়েলথের মহাসচিব প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ডকেও দেশের পরিস্থিতি তুলে ধরে চিঠি দেয় বিএনপি। আগে-পরে গত এপ্রিল ও আগস্টে কয়েক দফায় সংস্থাটির মহাসচিবকে ব্রিফ করে দলটির নেতারা। এর জবাব হিসেবে চলতি মাসের ৪ তারিখ বিএনপির মহাসচিবকে চিঠি দেন কমনওয়েলথ মহাসচিব। ওই চিঠিতে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার উৎসাহ দেন প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড।

গত ১৮ অক্টোবর বনানীর হোটেল লেকশোরে প্রায় ২৫টি দেশের ঢাকায় নিযুক্ত কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ওই অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকা দূতাবাসের রাজনৈতিক অফিসার উইলিয়াম মুলারের প্রশ্নে ফ্রন্টের অন্যতম প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেন জানিয়েছেন, নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, সেটা নির্বাচিত সংসদ ঠিক করবে।

ফরেইন ফ্যাফেয়ার্সের চিঠিতে বলা হয়েছে, এক্ষেত্রে এফএসি’র অভিমত হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে সুনির্দিষ্ট দাবি নির্ধারণের জন্য এটাই যথাযথ সময়। আমরা (বিএনপি) নির্বাচন কমিশন ও সাধারণ জনগণের সামনে আমাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরেছি, এটা বোঝা গেলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের দাবিগুলোকে আরও গভীরভাবে দেখতে চাইছে। বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও বিবেচনা থেকে এফসিএ নিচের বিষয়গুলোকে আমাদের (বিএনপির) দাবি হিসেবে তুলে ধরার বিষয়ে প্রস্তাব করেছে। আমরা এই দাবিগুলোকে আমাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে পূর্বশর্ত হিসেবে নিশ্চিতভাবে এগিয়ে নিতে পারি। এগুলো হচ্ছে—প্রথমত, অবিলম্বে খালেদা জিয়াকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। তৃতীয়ত, নির্বাচনের ৯০ দিন আগে থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার অথবা নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দায়িত্ব দিতে হবে। এই সরকারের মন্ত্রিসভায় সব দল থেকে প্রতিনিধি থাকতে হবে। (তবে এসব প্রতিনিধির কেউই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।) চতুর্থত, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। পঞ্চম, তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সংসদ ভেঙে দিতে হবে। ষষ্ঠত, নির্বাচন চলার সময় বা তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েন করতে হবে।

বিদেশিদের সঙ্গে আলোচনা করে চারটি সতর্কবার্তাও পেয়েছে বিএনপির ফরেইন অ্যাফেয়ার্স কমিটি। চিঠিতে চারটি বিষয় সম্পর্কে বলা হয়েছে। বর্ণিত দাবি ছাড়াও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে ফরেইন অ্যাফেয়ার্স কমিটির চারটি পর্যবেক্ষণ নির্ধারণ করেছে। এই বিষয়গুলো হচ্ছে, ক) যদি খালেদা জিয়াকে মুক্তি নাও দেওয়া হয়, আওয়ামী লীগকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন করতে দেওয়া বিএনপির উচিত হবে না। আওয়ামী লীগকে কোনোভাবেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। খ. যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়, তাহলে দলটির নেতাকর্মীদের আবারও মামলা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অথবা ক্ষমতাসীন দলের হাতে হয়রানির শিকার হতে হবে। গ. বিএনপিকে বুঝতে হবে, আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি চাইবে। আর এই বিষয়টি স্পষ্ট যে, বর্তমান সরকার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার নয়। তাই যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়, আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচন করতে পারবে। সেটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলেও অসাংবিধানিক বা অবৈধ হবে না। ঘ. যদি বিএনপি নির্বাচনে যেতে রাজি হয়, তাহলে আমাদের বিদেশি বন্ধুরা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে একটি সংলাপ শুরু করার চেষ্টা করতে পারবে। আর দেখবে কোনও দাবি মানা যায় কিনা।

সোমবার (২৯ অক্টোবর) সরকারের প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, একাদশ জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ-অংশ নিতে কয়েকটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রের জোর দাবি ছিল সরকারের কাছে। বিশেষ করে প্রধান বিরোধী নেতা খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার রেখে নির্বাচন সুষ্ঠু না করার কোনও যৌক্তিকতা নেই, এ বিষয়টি শাসকদলের কাছে প্রভাবশালী দুটি রাষ্ট্র তুলে ধরে বেশ কিছুদিন আগেই।

বিএনপির বিদেশি বন্ধুদের হস্তক্ষেপমূলক সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে চিঠিতে বলা হয়, দলটি নির্বাচনে যাবে কি, যাবে না, তা সঠিক সময়ে দলের নেতা একাই সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তাদের কাছে কিছু দাবি তুলে ধরা উচিত। দাবিগুলো হলো: এক. নির্বাচনের একমাস আগে থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের বিষয়টি বিদেশি সংগঠন ও বন্ধুদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। এই পর্যবেক্ষণ কোনোভাবেই শুধু প্রতীকী, নামমাত্র বা দায়সারা হলে চলবে না। ৩০০ আসনের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার মতো বেশি সংখ্যায় ও দক্ষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। শুধু স্থানীয় এনজিও গুলোর ওপর ভরসা করলে চলবে না। দুই. আমাদের সদস্য ও কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ক্ষমতাসীন দলকে রাজি করাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কাজ করতে হবে। নির্বাচনে সব দলের অংশ নেওয়া নিশ্চিত করার জন্য আওয়ামী লীগকে অবশ্যই সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি-আইসিসিপিআর স্বাক্ষরকারী দেশ। তাই বাংলাদেশকে এই চুক্তির বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই ক্ষমতাসীনের দলের সামনে বিষয়টি তুলে ধরতে হবে। তিন. জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই নজরদারি রাখতে হবে আর নির্বাচন কমিশন যাতে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাংলাদেশে যেন আন্তর্জাতিক মানের নির্বাচন হয়, সেই বিষয়টি তাদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

স্থায়ী কমিটিকে দেওয়া প্রস্তাবে ফরেইন অ্যাফেয়ার্স কমিটি মানবাধিকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক কিছু আর্টিকেলের উপস্থাপন করেছে। বলা হয়েছে, মানবাধিকারের চিরন্তর ঘোষণা আর্টিকেল ২১(১) অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষেরই সরাসরি বা মুক্তভাবে প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে তার দেশের সরকারে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

চিঠির শেষ দিকে বলা হয়, ‘বিএনপির বিদেশ বিষয়ক কমিটির সদস্য হিসেবে আমরা আমাদের বিদেশি বন্ধুদের খুব পরিষ্কার করে বলেছি যে, যদি আগামীকালই কোনও নির্বাচন হয় আর বিএনপি যদি সেই নির্বাচনে অংশ নেয়, তাহলে বিএনপি নিশ্চিতভাবে তাতে জয়লাভ করবে এবং সরকার গঠন করবে। এই বার্তাটি আমাদের দলের কাছ থেকে সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছানো দরকার। আমাদের সবার জন্য একটি কৌশল দরকার।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ