প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তসলিমার গান্ধী ভাবনা ও চিন্তার স্বাধীনতা

কাকন রেজা : তসলিমা নাসরিনের বেশ আলোচনা হচ্ছে আবার। হোক অসুবিধা নেই। আলোচনা খারাপ কিছু নয়, আলোচনা থেকেই ভালো কিছু বেরিয়ে আসে। এসব আলোচনার আলাপ করতে গিয়েই তসলিমা নাসরিনের মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে নিয়ে ফেসবুকের একটি লেখা চোখে পড়লো। ভারতের গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতি শ্রদ্ধা তো ছিলোই, তসলিমার লেখার কারণে সেখানকার পরমত সহিষ্ণুতার প্রতিও সম্মান দেখানোটা প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ালো।

তসলিমা নাসরিন ভারতীয় নন, ভিনদেশি একজন মানুষ তিনি, রয়েছেন আশ্রয়ে। যার কর্মকা-কে বিতর্কিত আখ্যায়িত করা হয়েছে নিজ দেশে। এমন একজন মানুষ লিখলেন যার সম্বন্ধে অঘোষিত হলেও যাকে ভারতে জাতির পিতা মানা হয়। যার নামের আগে বিশেষণ হিসাবে যোগ করা হয়েছে ‘মহাত্মা’ শব্দটি। তসলিমা তার লেখায় আত্মা’র অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিক ভাবে অস্বীকার করার ছলে, মহাত্মা বিশেষণের বিশেষত্বটিই অস্বীকার করেছেন। বলেছেন সেই ‘মহাত্মা গান্ধী’র জীবন নিয়ে, বিশেষ করে যৌন জীবন নিয়ে। কিন্তু তারপরেও তিনি ভারতে টিকে আছেন, লিখে যাচ্ছেন। তসলিমা ভারতে আছেন বলেই বুঝতে পারছেন না, সেখানকার পরিবেশ কতটা সহিষ্ণু।

হ্যাঁ, ভারতেও যে অসহিষ্ণুতা নেই, তা নয়। তসলিমা নিজেও তার লেখায় সেই অসহিষ্ণুতার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে সেই উল্লেখ ছিল ভয়হীন, শংকামুক্ত। এটাও ভারতের পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা আরেকটি নজির। আক্রান্ত একজন মানুষ তার কষ্টের কথা লিখেছেন, তাতে কেউ বাধা দেয়নি। অসহিষ্ণু হবার অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি ঘটাননি তারা। যার ফলেই তসলিমা আজ পর্যন্ত নির্বিঘেœ লিখতে পেরেছেন। এই নির্বিঘœতা একটা বড় পাওয়া। মত প্রকাশের স্বাধীনতা একটি দেশের উন্নতির জন্য বড় একটা ফ্যাক্টর। নরওয়ের কথা বলি। ধনী নয়, শক্তিধরও নয়, কিন্তু দেশটি পৃথিবীর সর্বোন্নত দেশ। শুধুমাত্র সুসংগঠিত সমাজ ব্যবস্থা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষা, জীবনযাত্রার মান মিলিয়ে এই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন। ধন ও শক্তির চেয়ে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ সেরা হওয়ার শর্তে অনেক বেশি প্রয়োজন। যা ভারতে পেয়েছেন তসলিমা।

আমি তসলিমা নাসরিনের দর্শনের অনুগামী নই। তার চিন্তার সাথে আমার রয়েছে বিস্তার ফারাক, কোনো ক্ষেত্রে পুরো উল্টা। কনফ্লিক্ট রয়েছে তার জীবনযাপন প্রণালীর সাথেও। বিভিন্ন কারণে বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে ভারতেরও ভক্ত হতে পারিনি। তবে ভারতের গণতান্ত্রিক চর্চা, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ আর সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ঈর্ষণীয় বলেই প্রশংসা করি। এসব থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। শেখার আছে তসলিমার থেকেও। পুরো বিশ্বটাই একটা পাঠশালা, নয় কী?

নিজে বরাবর শেখার পক্ষে, তাই সুযোগ পেলেই চেষ্টা করি শিখতে। আর লব্ধ শিক্ষা থেকে চেষ্টা থাকে বোঝার। সেই বোঝার জায়গা থেকেই বলা ‘দ্বন্দ্বে’র কথা। ‘দ্বন্দ্ব’ সৃষ্টি না হলে মূল সত্যটা বেড়িয়ে আসে না। দর্শন বলে ‘দ্বন্দ্ব’ থেকেই পাওয়া যায় সঠিক চিন্তা, মত-পথ। সুতরাং কোনো আলোচনাকেই বোঝার আগে বাদ দেয়া উচিত নয়। তসলিমার গান্ধী বিষয়ক আলোচনাকে তো নয়ই। আলোচনা যতই হতে থাকবে, ততই মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী’র ‘মহাত্মা’ হয়ে উঠার জাস্টিফিকেশন মিলবে। আর আলোচনায় যদি তিনি ছিটকে পড়েন, তাহলেও মঙ্গল। অন্তত মানুষকে ভুলের বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে না। সুতরাং সত্য জানতে দ্বান্দ্বিক আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। অন্তত লক্ষ্যটা যদি মানুষের তথা রাষ্ট্রের সর্বসাধারণের মঙ্গলের জন্য হয়।

পৃথিবীর সব কৃতি মানুষকে নিয়েই আলোচনা হয়েছে। দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে, দ্বন্দ্বের কষ্টি পাথরে যাচাই হয়ে মানব থেকে মহামানব হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন তারা। তারপরেও আলোচনার তীর্যকতা পিছু ছাড়েনি তাদের। ধর্ম প্রবক্তা, ঋষি, দার্শনিক সবাই আলোচিত হয়েছেন, সাথে হয়েছেন সমালোচিতও। মানুষের কেউ তাদের আলোচনার দিকটাকে সত্য ভেবেছেন, কেউ সমালোচনার। যার যার বোধ, বুদ্ধির উপর নির্ভর করেছে ভাবনার বিষয়টি। প্রতিটি মানুষই স্বতন্ত্র, ভাবনাও স্বতন্ত্র। সেই স্বাতন্ত্রের উপর প্রভূত্ব করার অধিকার অন্য কোনো মানুষকে সৃষ্টিকর্তা বা প্রকৃতি দেয়নি। দেয়া উচিতও নয়। আরেকটা কথা, মানুষ দেবতা নয়, জোর করে দেবতা বানানো, দেবত্ব আরোপও এক ধরনের গোয়ার্তুমি। সভ্যতা গোয়ার্তুমিকে বরাবরই প্রত্যাখান করেছে। লেখক : সাংবাদিক, কলাম লেখক