প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বরেন্দ্র মিউজিয়াম : অতীতের স্বর্ণযুগ

ড. আখতার বানু : রাজশাহীর বরেন্দ্র মিউজিয়ামটি আমার ভীষণ পছন্দ। অনেকগুলো অসাধারণ প্রাচীন মূর্তি, শিলালিপি, মুদ্রা, তৈজসপত্র, হাতিয়ার ইত্যাদি এখানে সংরক্ষিত আছে। যা দেখে আমি রীতিমত হতভম্ব হয়ে যাই। আমাকে সবচেয়ে বেশী বিমোহিত করে মূর্তিগুলোই। কারণ, পাথরের উপরে খোদাই করা কী অসাধারণ কারুকার্যখচিত এক একটা অবয়ব। মূর্তির শরীরের পোশাক ও গহনার ডিজাইন দেখে সে সময়কার মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, রুচি ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এই মূর্তিগুলো যারা বানিয়েছেন, আমি তাদের কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা ও দক্ষতার কথা ভেবে হতবাক হয়ে যাই। তখনকার শিল্পকলা কতটা উন্নত ছিল, তার প্রমাণ এই জাদুঘর। ঐরকম একটা মূর্তি বানানোর মত একজন শিল্পীও কি এখন বাংলাদেশে আছে? এরকম মূর্তি কি এখনও তৈরি হয়? আমি জানিনা। গত শীতে মেয়েদেরকে নিয়ে গিয়েছিলাম বরেন্দ্র মিউজিয়ামে।

ছবি তোলার কড়া নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এই ছবিটা নিতে পেরেছি। আমার বাসায়, চেম্বারে নানারকম শোপিস আছে যার অনেকগুলো প্রাণীর, এমনকি মানুষেরও। আমার কাছে ওগুলো শুধুই সৌন্দর্যের প্রতীক। আমি মনে করি, ওগুলোর পূজা যেহেতু আমি করিনা, তাই ওগুলো আমার ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী নয়। তাছাড়া ছবি আঁকা, মাটি বা পাথর দিয়ে কোনকিছু বানানো, সেলাই করা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো ইত্যাদি কাজগুলো মানুষের কল্পনাশক্তি বাড়ায়, হাতের ব্যালেন্স করার ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ায় যা মানুষের বুদ্ধি এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াতে খুবই সহায়ক। মানুষের দৈহিক ও মানসিক বিকাশে এগুলো ভীষণভাবে সাহায্য করে। আর সুন্দর যেকোন কিছুই মানুষের ভাললাগার উৎস হিসেবে কাজ করে যা আমাদের মনের খোরাক যোগায়। আমি ছোটবেলায় ছবি আঁকার চেষ্টা করেছি। যদিও আমি ভালো ছবি আঁকতে পারি না।

মাটির ফুলদানি, হাঁড়িপাতিল বা পুতুল বানাতাম কাদা দিয়ে। এসব বানানো, গান গাওয়া কোনটাই ঠিকমত শিখতে পারিনি, যদিও এগুলো আমার খুবই ভাল লাগে। তবে আমি সেলাই পারি। কুরুশকাঁটা থেকে শুরু করে প্রায় সবরকমের সেলাইয়ের কাজ আমি জানি। সুন্দর কোন একটা কিছু বানিয়ে ঘরের কোন এক জায়গায় রাখার পর কী যে আনন্দ পাওয়া যায়! কোনকিছুর সাথেই তার তুলনা চলে না। আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক হাওয়ার্ড গার্ডনার ১৯৮৩ সালে ‘বহুমুখি বুদ্ধি মতবাদ’ দেন যাতে গার্ডনার বলেন, মানুষের মধ্যে কমপক্ষে আট রকমের বুদ্ধিমত্তা বা সামর্থ আছে (মৌখিক বা ভাষাতাত্ত্বিক বুদ্ধিমত্তা, যৌক্তিক বা গাণিতিক বুদ্ধিমত্তা, শারীরিক গতিমূলক বুদ্ধিমত্তা, অন্তঃব্যক্তিক বুদ্ধিমত্তা, আন্তঃব্যক্তিক বুদ্ধিমত্তা, স্থানসংক্রান্ত বুদ্ধিমত্তা, প্রকৃতিবিষয়ক বুদ্ধিমত্তা, সঙ্গীতমূলক বুদ্ধিমত্তা), (আরও বেশীও থাকতে পারে) যার প্রত্যেকটিই ভিন্ন ভিন্ন কিছু লক্ষণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই আট রকমের প্রবণতাসম্পন্ন প্রতিটা মানুষই বুদ্ধিমান। এই বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মানুষরাই সবসময় পড়ালেখায় ভাল নাও হতে পারে। তারমানে এই নয় যে তারা বুদ্ধিমান নয়।

আট রকমের বুদ্ধিমত্তার মধ্যে একটি হল স্থানসংক্রান্ত বুদ্ধিমত্তা। এই বুদ্ধিমত্তা বলতে বোঝায়, কোন স্থানের বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষণ করা ও তার পার্থক্য বুঝতে পারা। এই বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ হলো, শিশু বা ব্যক্তি কোন জিনিস সহজে খুঁজে বের করতে বা দেখতে পায়, জিনিসটির উপাদানসমূহ অনুমান করতে পারে এবং সৃজনশীলতার সাথে কোন স্থানকে নিজের সুবিধাজনকভাবে ব্যবহার করে কোনকিছু সৃষ্টি করতে পারে। চিত্রকে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, বস্তুকে সুন্দরভাবে সাজাতে গোছাতে বা বানাতে পারে।

এই বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন শিশুরা কারিগর, মিস্ত্রী, চিত্রশিল্পী, স্থপতি, ফটোগ্রাফার, ইনটিরিয়র ও ফ্যাশন ডিজাইনার ইত্যাদি হতে পারবে। প্রতিটা শিশুর মধ্যেই এই আট ধরনের বুদ্ধিমত্তার কোন না কোনটি অবশ্যই আছে। তবে কারো কারো মধ্যে কোন এক বা একাধিক বুদ্ধি প্রবল, কোনটি আবার প্রচ্ছন্ন বা সুপ্ত অবস্থায় থাকে। অনুকূল পরিবেশ পেলে প্রবল বুদ্ধিমত্তা আরও প্রবলতর হয়ে প্রকাশ পায়, সুপ্ত অবস্থায় থাকা বুদ্ধিমত্তা প্রবল হয়। তাই প্রতিটা শিশুর বুদ্ধির বিকাশের উপযোগী পরিবেশ দিতে হবে। তাদেরকে নানা দর্শনীয় জিনিস দেখাতে হবে এবং শিশু কোনকিছু সৃষ্টি করতে চাইলে তাকে উৎসাহিত করতে হবে, বাধা দেয়া যাবে না। তাই যারা বরেন্দ্র মিউজিয়ামটি দেখেননি, তারা সদলবলে (অবশ্যই বাচ্চাসহ) ঘুরে আসুন বরেন্দ্র মিউজিয়ামটি। দেখে আসুন অতীতের সেই মোহনীয় স্বর্ণযুগ! লেখক : প্রফেসর, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়।

সম্পাদনা : রেজাউল আহসান

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত