প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাইরে কলেজের সাইনবোর্ড ভেতরে নকল শিশুখাদ্যের কারখানা

বণিক বার্তা : ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের পথে সাইনবোর্ড মোড় পেরিয়ে আধা কিলোমিটার এগোলে হাতের বাঁয়ে পিডিকে পেট্রলপাম্প। এর ঠিক পাশেই উঁচু পাঁচিলঘেরা পাঁচতলা ভবন। পাঁচিলে লেখা এমএ ওয়াজেদ (ডিগ্রি) কলেজ। তবে বাইরে যা-ই লেখা হোক, ভেতরে কোনো শিক্ষা কার্যক্রম চলে না। পরিবর্তে যা হয়, সেটাকে আড়াল করতেই কলেজ নাম দেয়া হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশেই উঁচু পাঁচিলঘেরা ছয় কাঠা জায়গা। ফটকের পাশে লেখা এমএ ওয়াজেদ (ডিগ্রি) কলেজ। হোল্ডিং নম্বর ১২৫/১। ভেতরে পাঁচতলা ভবনের বিভিন্ন জানালায় ঝুলছে লুঙ্গি, মশারি। তালাবদ্ধ ফটকের বাইরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই বেরিয়ে এল দুই কিশোর। পরনে লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি। হাতে গামছা। শরীরের ঘাম মুছতে মুছতেই বেরোল দুজন।

ক্লাস ছুটি নাকি— প্রশ্ন করতেই দুই কিশোর পাল্টা জিজ্ঞাসা করল, কিসের ক্লাস? কলেজের কথা বলতেই রহস্যের হাসি তাদের মুখে। পরিচয় গোপন রেখে তাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে গল্প চলতে থাকে। কথায় কথায় জানা যায়, এটি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়। মূলত এটি একটি কারখানা। এখানে প্রস্তুত হয় নকল শিশুখাদ্য, পানীয়, মশার কয়েল ও অন্যান্য পণ্য।

গল্প শেষে আবার মূল ফটকে অপেক্ষা। কিছুক্ষণ পর আসে একটি ডেলিভারি ভ্যান। চালক নিজেই নেমে গেটে দু-তিনবার ধাক্কা দেন। ভেতর থেকে এসে গেট খুলে দেন ১৮-২০ বছর বয়সী এক তরুণ। ডেলিভারি ভ্যানের পেছনে হাঁটতে হাঁটতে কৌশলে ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, ভবনের নিচতলার সব কক্ষই তালাবদ্ধ।

ভ্যানটি কাছে যেতেই একটি কক্ষের তালা খুলে দেয় গেটের দায়িত্বে থাকা কিশোর। কক্ষের ভেতরে লাইট জ্বলছে। তবে কোনো ফ্যান নেই। চেয়ার-বেঞ্চ বা ব্ল্যাকবোর্ডেরও দেখা নেই। আছে কিছু ড্রাম আর প্লাস্টিকের বোতল। ভ্যানচালক দ্রুত সেখান থেকে কয়েকটি কার্টন বের করে নেন। কার্টনগুলোর ওপরে লেখা ‘ফ্রুটো’, বাজারে পরিচিত ব্র্যান্ডের লোগো। পরে ওই ভ্যানের সঙ্গেই বাইরে বেরিয়ে দেখা যায়, আরো কয়েকটি ভ্যান গেটে অপেক্ষা করছে।

বেশ কয়েকজন স্থানীয় অধিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এটাকে বাড়ি হিসেবেই জানেন। এলাকার মানুষ জানান, এ জমির মালিক এমএ ওয়াজেদ। প্রথমে তিনি পাঁচতলা বাড়ি করেছিলেন। পরে ২০১৬ সালের প্রথম দিকে বাড়ির সামনে কলেজের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন। কিন্তু বাড়িতে কখনো কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থী আসতে দেখেননি স্থানীয়রা। তবে প্রতিদিনই আসে ডেলিভারি ভ্যান। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও আসেন।

পুলিশের কাছে রহস্যময় কলেজটি নিয়ে তেমন তথ্য পাওয়া না গেলেও র্যাবের কাছে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। র্যাবের গোয়েন্দা শাখার তথ্যমতে, শুধু এ কলেজ নয়, সানারপাড় এলাকায় এমন আরো বেশকিছু রহস্যজনক সাইনবোর্ড রয়েছে, যা দেখে মনে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অথবা অফিস। কিন্তু সাইনবোর্ডধারী হোল্ডিংগুলোয় তৈরি করা হয় নকল শিশুখাদ্যসহ নানা সামগ্রী।

র্যাব সদর দপ্তর সূত্র বলছে, সানারপাড়ে গড়ে ওঠা এসব ভুয়া প্রতিষ্ঠানেই মূলত নকল শিশুখাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা হয়। পরবর্তী সময়ে এসব পণ্য পাঠিয়ে দেয়া হয় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আসল পণ্যের মতো দেখায় নকল পণ্যগুলোও। প্রকৃত উৎপাদকের অনুরূপ ডিজাইন, লোগোসহ মোড়কীকরণ হয় নকল কারখানায় তৈরি জুস, চকোলেট, আচার, জেলি, চিপসসহ নানা পণ্য। এ পর্যন্ত তিনবার এমএ ওয়াজেদ কলেজে অভিযান চালিয়েছে র্যাব।

জানা যায়, কলেজের সাইনবোর্ড স্থাপনের পর ২০১৬ সালে নকল শিশুখাদ্য উৎপাদনের জন্য সৃষ্টি ফুড প্রডাক্টস নামে একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন এমএ ওয়াজেদ। ওই বছরের মাঝামাঝি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃষ্টিগোচর হলে প্রতিষ্ঠানের নাম পাল্টে হয়ে যায় নিউ সৃষ্টি ফুড প্রডাক্টস। এরপর ২০১৭ সালে র্যাবের অভিযানে ধরা পড়েন প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মোহাম্মাদ আলী। তাকে দুই বছরের সাজা দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। মোহাম্মাদ আলী কারাগারে থাকাবস্থায় প্রতিষ্ঠানের নাম আবার পরিবর্তন হয়। নতুন নাম হয় অপ্সরা এগ্রো অ্যান্ড ফুড প্রডাক্টস। এ নামে কিছুদিন কার্যক্রম চলতেই র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত সেখানে অভিযানে যান। এবার নকল শিশুখাদ্য উৎপাদনের সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন এমএ ওয়াজেদ।

র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বণিক বার্তাকে বলেন, এমএ ওয়াজেদ মিয়া সানারপাড়কেন্দ্রিক নকল শিশুখাদ্য উৎপাদনকারী চক্রের অন্যতম সদস্য। তাকে দুই বছর আগে একবার ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। সে সময় ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারকে কারাদণ্ড দেয়া হয়। এরপর ছয় মাস আগে ওয়াজেদ মিয়া আবারো নকল শিশুখাদ্য উৎপাদন শুরু করেন। তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

এ অভিযানে নকল ফ্রুটো জুস, চকোলেট ডেইরি মিল্ক, প্রাণের লিচিসদৃশ লিচি, লেবুর স্বাদযুক্ত ট্যাং শরবত, নকল পণ্য বানানোর মেশিন, পোশাকে ব্যবহূত রঙ, স্যাকারিন ও ফ্লেভার উদ্ধার করা হয়। র্যাব জানায়, কারখানার মালিক ওয়াজেদ মিয়া ছয় মাস ধরে এসব পণ্য তৈরি করছিলেন। পরে তাকে দুই বছর সাজার পাশাপাশি ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নকল ও ভেজাল শিশুখাদ্য তৈরিতে নামহীন ও মানহীন উপকরণ-ফ্লেভার ব্যবহার করতে গিয়ে পণ্যে ক্যাডমিয়াম, সিসা, পারদ, আর্সেনিক ইত্যাদির অনুপ্রবেশ ঘটছে। বিভিন্ন বয়সী ভোক্তাকে টার্গেট করে প্রস্তুতকৃত পণ্যেও এসব ফ্লেভার ও উপকরণ ব্যবহূত হচ্ছে। এতে সৃষ্টি হচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি।

মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যমতে, সস্তায় শিশুখাদ্য বাজারজাত করতে অনেক ক্ষেত্রে নকল দুধ ব্যবহার হচ্ছে। মেলামিনযুক্ত ও মানহীন দুধেরও ব্যবহার বাড়ছে। এতে শিশুর কিডনিতে পাথরের ঝুঁকি বাড়ছে। পরবর্তী জীবনে তাদের প্রজননস্বাস্থ্য নিয়েও আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এমএ ওয়াজেদ পরিবারের কেউ না কেউ বরাবরই কারাগারে থাকেন। নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান সত্ত্বেও তারা নকল শিশুখাদ্য উৎপাদন করে সারা দেশে পাঠান। নকল শিশুখাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে এমএ ওয়াজেদ ছাড়াও সানারপাড়ের অন্তত ৫০টি পরিবার জড়িত। এরা মূলত ট্যাংসদৃশ পাউডার, শিশুখাদ্য, পেস্টসহ বিভিন্ন নকল প্রসাধনী ও মশার কয়েল তৈরি করে।

র্যাব সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, শুধু সানারপাড়েই গত দুই বছরে অন্তত ২০ বার ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ভেজাল পণ্য উৎপাদনকারী ৫০টিরও বেশি কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়। এ কারখানাগুলো থেকে নিয়মিত দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠানো হতো নকল পণ্যসামগ্রী। মূলত অক্ষরজ্ঞানহীন ভোক্তাদের টার্গেট করেই নকল শিশুখাদ্য ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদন করে সানারপাড়ের কারখানাগুলো।

র্যাবের তথ্যের সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এমএ ওয়াজেদের মতো রানা শেখ, দুলাল মালিথা, শিপলু বিশ্বাস, ফরিদ হোসেনসহ ডজনখানেক ব্যক্তি নিয়মিত গ্রেফতার হয়ে জেল খাটেন এবং পরবর্তী সময়ে বেরিয়ে এসে নতুন করে নকল পণ্য উৎপাদন শুরু করেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ