প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’ ও কিছু মৌলিক প্রশ্ন

ড. তারেক শামসুর রেহমান : ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’ শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অঘটন না ঘটিয়ে ভারতের উড়িষ্যা ও অন্ধ্র প্রদেশ অতিক্রম করেছে গত শুক্রবার। ‘তিতলির’ তান্ডবে সেখানে ৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে সংবাদপত্র খবর দিয়েছে। ‘তিতলির’ কারণে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি এটা সত্যি। কিন্তু এটা একটা ‘ওয়েক আপ’ কল। আগামীতে আমাদেরকে এ ধরনের সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি হতে হবে বারবার। কারণ বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সাগর মহাসাগরে সামুদ্রিক ঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হচ্ছে।

প্রায় একই সময় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ঘূর্ণিঝড় মাইকেল এর বড় প্রমাণ। বলা হচ্ছে এ শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ছিল মাইকেল। এ ব্যাপারে জাতিসংঘের আইপিসিসি বারবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেও, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অসহযোগিতার কারণে বিশ্বের উষ্ণতা কমানোর ব্যাপারে কোনো কার্যকরি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বলা ভালো, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্যারিসে একটি জলবায়ু চুক্তিতে (কপ-২১) বিশ্বের প্রায় সকল দেশের ঐকমত্যে পৌঁছা এবং ২০১৬ সালে নিউইয়র্কে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করলেও ট্রাম্প প্রশাসন ওই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর থেকেই জলবায়ু চুক্তিটি একরকম অকার্যকর হয়ে গেছে। উষ্ণতা কমানোর ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা, অর্থাৎ বিশ্বের উষ্ণতা হ্রাস করার ব্যাপারে বিশ্বের দেশগুলো নানা গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এবং এক এক গ্রুপের ছিল এক এক এজেন্ডা। দেশগুলো আলাপ আলোচনার মধ্যদিয়ে প্যারিসে ন্যূনতম একটি ঐকমত্যে পৌঁছে ছিল।

কিন্তু সেই ঐকমত্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ট্রাম্প জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। তিনি যে এ কাজটি করবেন, তা একরকম নিশ্চিতই ছিল। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার আগে ও পরে একাধিকবার তিনি এটা নিশ্চিত করে ছিলেন যে তিনি জলবায়ু চুক্তিটিকে মানেন না। নানা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এটা প্রমাণিত হয়েছিল এবং জাতিসংঘ কর্তৃক গঠিত বৈজ্ঞানিক প্যানেলও এটা স্পষ্ট করেছিলো যে, অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুতরাং বিশ্বের উষ্ণতা কমাতে হবে। আর এটা কমাতে হলে জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে। কিন্তু ট্রাম্প বিজ্ঞানের এই গবেষণা অস্বীকার করেছিলেন। অতিরিক্ত জীবাষ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণেই যে বিশ্বের উষ্ণতা বাড়ছে, আর্কটিকের বরফ যে গলছে, ট্রাম্প এটা বিশ্বাস করেন না। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর স্বর্থেই যে যুক্তরাষ্ট্র কপ-২১ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন, এটা অনেকে মনে করেন। গত মে মাসের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউরোপ সফরে গিয়েছিলেন। তার ওই সফরও যথেষ্ট বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। সিসিলিতে তিনি জি-৭ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন।

সেখানে জি-৭ ভুক্ত ৬টি দেশ জলবায়ু পরিবর্তন রোধে প্যারিস কপ-২১ চুক্তির ব্যাপারে তাদের সমর্থন ‘কমিটমেন্ট’ হারায় উল্লেখ করলেও, ট্রাম্প সেখানে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেননি। ফলে এখন বিশ্বের উষ্ণতা রোধ করা কীভাবে সম্ভব হবে, সেটাও বড় প্রশ্ন। তবে বলা হচ্ছে ট্রাম্প একটি সিদ্ধান্ত নিলেও, তা র্কাযকর করতে অন্তত ৩ বছর সময় লাগবে। এখন যে উদ্দেশ্যটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে? টেড স্ট্রান, যিনি প্যারিস কপ-২১ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তিনি বলেছেন ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিবে। যুক্তরাষ্ট্র তার গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত বিশ্বের বড় কার্বন সরবরাহকারী দেশগুলো কীভাবে নেবে? এটা নিয়ে একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও অতি সম্প্রতি দুটো সংবাদ আমাদের জন্য আশার সঞ্চার করেছে।

চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন তারা জীবাষ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমানোর ব্যপারে তাদের ‘কমিটমেন্ট’ তারা রক্ষা করবেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সাহায্য করার ব্যাপারে ১০০ মিলিয়ন ডলার ফান্ড সংগ্রহের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করবে। একই সাথে রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে প্যারিস সমঝোতাকে (কপ-২১) যাতে গুরুত্ব দেয় এবং মনে করে বড় কার্বন সংগ্রহকারী দেশগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া এই চুক্তি অর্থহীন। রাশিয়ার বক্তব্য মূলত মার্কিন বর্তমান অবস্থানকেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। বলা ভালো এখন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি সিরিয়া ও নিকারাগুয়াও জলবায়ু চুক্তিতে স্বাক্ষর না করা দেশের তালিকায় থাকলেন। প্রসঙ্গক্রমেই প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বা সমঝোতা, যা কপ-২১ নামেও পরিচিত, সে বিষয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। প্যারিস সমঝোতা স্মারকে ১৯৫টি দেশ স্বাক্ষর করেছিল, আর জাতিসংঘে স্বাক্ষর করেছিল ১৭০টি দেশ। চুক্তিতে বলা আছে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশে^র তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা হবে। এর জন্য বায়ুম-লে কার্বন নির্গমণ হ্রাস করতে হবে। প্রশ্ন ছিল তখন কে কতটুকু হ্রাস করবে। তা সুষ্ঠুভাবে উল্লেখ করা হয়নি। প্রশ্ন ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে কী একই কাতারে আমরা দেখবো? কিংবা রাশিয়াসহ ইউরোপের দেশগুলো কতটুকু কমাবে?

এ ব্যাপারে সমঝোতা চুক্তিতে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। সমঝোতায় আছে উন্নত কিংবা জলবায়ুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে বছরে ১০ হাজার কোটি ডলার সাহায্য দেবে। এটা শুনতে ভালোই শোনায়। কিন্তু এই অর্থ কে দেবে? কেন দেবে, কতটুকু দেবে, তার কোনো উল্লেখ নেই। দ্বিতীয়ত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো নানা ক্যাটাগরিতে বিভক্ত (ভলনারেবল ২০, রেইন ফরেস্ট কোয়ালিশন ইত্যাদি) এই দেশগুলোর মাঝে অর্থ বণ্টনের ভিত্তিটি কী হবে? তৃতীয়ত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো এই অর্থ কীভাবে ম্যানেজ করবে? কেননা উন্নয়নশীল বিশে^ দুর্নীতির বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত। বাংলাদেশের জলবায়ু খাতে প্রাপ্ত টাকা বরাদ্দ নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। একসময় কথা হয়েছিল প্রাপ্ত টাকা বিলি-বণ্টনের বিষয়টি দেখভাল করবে বিশ্ব ব্যাংক। পরে বিশ্ব ব্যাংক এখান থেকে সরে যায়। বিষয়টা যে শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, তা নয়। বরং উন্নয়নশীল বিশ্বে, বিশেষ করে সাগর পাড়ের অনেক দেশ নিজে এ রকম সমস্যায় আছে। সমঝোতা স্মারকে উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থ দেখা হয়নি। আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও অত কঠোর নয়। অর্থাৎ সাগর পাড়ের দেশগুলো, যারা বিশ্বের উষ্ণতা বেড়ে গেলে সাগর মহাসাগরে পানির পরিমাণ বেড়ে গেলে, তাদের বিশাল এলাকা সাগর গর্ভে হারিয়ে যাবার আশঙ্কা রয়েছে, কোন ক্ষতিপূরণ এর জন্য দাবি করতে পারবে না। ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আসবে বড় দেশগুলোর মর্জি-মাফিকের উপর।

নিউইয়র্কে, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। এর প্রয়োজন ছিল। কেননা বিশ্বের উষ্ণতা যে হারে বেড়ে যাচ্ছে,সাগর উত্তপ্ত হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট্ হচ্ছে। এ সবই বাস্তব।এ ব্যাপারে কারো কোন বক্তব্য নেই। পৃথিবী উত্তপ্ত হচ্ছে,গ্রীনল্যান্ড ও এন্টার্কটিকায় বরফ গলছে। এ জন্য একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়া প্রয়োজন ছিলো। এটা সবাই উপলব্ধি করেন। কিন্তু কর্মপরিকল্পনাটা কী, কীভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানো যাবে তার কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্যারিস সম্মেলনে নেওয়া হয়নি। এটা বলা যাচ্ছে বিশ্বে জীবাষ্ম জালানি ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার কারণে বায়ুমন্ডলে কার্বনের পরিমাণ বাড়ছে। অর্থাৎ শিল্পে, কল-কারখানায় যান-বাহনে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার করার ফলে বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে। কিন্তু এই জ্বালানির ব্যবহার আমরা কমাবো কিভাবে? জ্বালানি ব্যবহারের সাথে উন্নয়নের প্রশ্নটি সরাসরিভাবে জড়িত। জীবাষ্ম জ্বালানি কম ব্যবহার করলে কার্বন নিঃসরণ কম হবে, এটা সত্য। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বিশ্বের কাছে কি বিকল্প জ্বালানি আছে? উন্নয়নশীল বিশ্বে জীবাষ্ম জ্বালানির ওপর পরিপূর্ণভাবে নির্ভরশীল। উন্নত বিশ্বের কাছে ‘নয়া প্রযুক্তি’ থাকলেও তাদের অনীহা রয়েছে উন্নয়নশীল বিশ্বে এই প্রযুক্তি সরবরাহের। সোলার এনার্জির একটা বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও, উন্নয়নশীল বিশ্বে এই এনার্জির ব্যবহার বাড়ছে না। বাংলাদেমে যে পরিমাণে এর ব্যবহার বাড়ানো উচিত ছিল, তা কিন্তু হয়নি। কেননা এর জন্য যে খুচরা যন্ত্রপাতি প্রয়োজন হয় তা বিদেশ থেকে আনতে হয়। খরচ অনেক বেশি পড়ে, যা আমাদের সাধ্যেও মধ্যে পড়ে না। এই সেক্টরে যতদিন পর্যন্ত না বৈদেশিক সাহায্য পাওয়া যাবে, ততদিন এই সেক্টর বিকশিত হবে না।

বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সাগর-মহাসাগর উত্তপ্ত হচ্ছে। বাড়ছে ঘূণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসও। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা জাপানের মতো দেশও এই ঘূণিঝড় আর জলোচ্ছাস থেকে ‘মুক্ত’ হচ্ছে না। ভুলে গেলে চলবে না ‘মাইকেল’ ১৫৫ মাইল বেগে ফ্লোরিডায় আঘাত করেছিল। আমাদের জন্যও এটা যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ। কেননা ‘তিতলি’ এবার বড় ক্ষতি করতে পারেনি কিন্তু ‘সিডর’ কিংবা ‘আইলার’ কারণে যে ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছিল, তা থেকে আমরা আজও বের হয়ে আসতে পারিনি।

লেখক : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ