প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নারীবাদ ও আজকের নারী

লীনা পারভীন : সৃষ্টির আদি থেকেই নারীর ইতিহাস মানে লড়াই, সংগ্রাম করে টিকে থাকার ইতিহাস। অস্তিত্বের সংকটে পড়ার ইতিহাস। সম্প্রতি আমাদের দেশে-বিদেশে যে বিষয়টি খুব বেশি দেখা যাচ্ছে, তা হলো নারীর মর্যাদা ও অধিকার আদায়ের প্রসঙ্গ। নারীর মর্যাদা বা অধিকার বিষয়ে যারাই কথা বলে গতানুগতিক সংজ্ঞায় তাদের নারীবাদী বলে ট্যাগ করা হয়। আসলে ‘নারীবাদ’ বিষয়টা কি এত সহজ? নারীবাদী হওয়াও কি এত সহজ?

নারীবাদ কথাটির অনেক বড় ব্যাখ্যা থাকলেও আমি সাধারণভাবে যা বুঝি, তা হলো নারীকে একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। মূলত ‘নারীবাদ’ প্রসঙ্গটি একদিনে সমাজে আসেনি। আজ আমরা যত সহজে ব্যাখ্যা দিতে পারি, তার ইতিহাস অত সহজ ছিল না। একেক ধাপে একেকবার নারীদের নানা অধিকারের ইস্যু নিয়ে একটি সম্পূর্ণ কনসেপ্ট দাঁড়িয়েছে।

নারীকে একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মানেই হচ্ছে, সমাজে একজন ব্যক্তির যেসব স্বাভাবিক অধিকার পাওয়ার কথা, সেগুলো নিশ্চিত করা। এর মধ্যে আছে তার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অধিকার। পরবর্তী সময়ে আধুনিককালে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নারীর মতো প্রকাশের অধিকার, শরীরকে কেন্দ্র করে তার পছন্দ নির্ধারণের অধিকার, যেখানে নারী পাবে তার পোশাক নির্ধারণের স্বাধীনতা, তার যৌন স্বাধীনতা, সঙ্গী নির্ধারণের ক্ষমতা ইত্যাদি। নারীবাদ কখনোই নারীকে একজন পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলে না। এখানে একজন পুরুষ একজন নারীর আইডল না কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বীও নয়। সমাজে একজন পুরুষেরও অধিকার বঞ্চনা আছে। একজন পুরুষ সে যদি ব্যক্তিত্ববান না হয়ে থাকে বা আত্মনির্ভরশীল না হয়ে থাকে, যে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে না, সেক্ষেত্রে আমি মনে করি, সেও একজন বঞ্চিত মানুষ। তাই প্রচলিত ধারার যে ‘নারীবাদী’ চিন্তা, তা কোনও অংশেই সম্পূর্ণ ঠিক হতে পারে না।

তার মানে হচ্ছে, নারীবাদ হচ্ছে একটি থিওরি, একটি মতবাদ; যেখানে একজন ব্যক্তি হিসেবে সমাজের নারী কী কী অধিকার পাওয়া উচিত, তার একটি দিক নির্ধারণ করে কেবল। তাই নারীবাদ কথাটিকে কয়েকটি সীমার মধ্যে আটকে ফেলাটাকে আমি মনে করি আবারও নারীকে একই গ-ির ভেতরে রেখে দেওয়া।

আমরা অনেকেই আজকাল খোলামেলা কথা বলতে পছন্দ করি। শহুরে শিক্ষিত অনেক নারীরা আজকাল তাদের অভিমত অনেক খোলামেলাভাবেই দিয়ে থাকেন। এটি একটি ইতিবাচক দিক অবশ্যই। তবে তার পাশাপাশি যে বিষয়টি আমাকে ভাবতে বাধ্য করে তা হচ্ছে, যারা আমরা নারীর শরীর, নারীর যৌনতা, এমনকি আজকাল নারীর অর্গাজম নিয়েও অনেকে চিন্তিত এবং এ বিষয়ে বিপ্লবের ডাক দেয়ার কথাও ভাবছে। আসলেই কি আমরা বুঝি? আমরা কী বলতে চাই, আর কী বলি এবং তার ব্যাখ্যা সমাজে কী দাঁড়ায়, এসব কি আমরা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারি? আমরা যারা নিজেদের নারীবাদী হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি, তাদের মধ্যে কতজন আছেন, যারা নারীবাদের ইতিহাস সঠিকভাবে জানেন?

তসলিমা নাসরিন অবশ্যই এক্ষেত্রে অনেক বড় একটা ভূমিকা রেখেছেন, তিনি নারীদের নিজের কথা বলার জন্য উৎসাহিত করেছেন লেখনির মাধ্যমে। কিন্তু আমরা যদি সমাজ বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কেবল বিপ্লবিপনা দেখিয়েই যাই, তাহলে তার পরিণতি কী হতে পারে, সে ব্যাপারে কি আমরা ওয়াকিবহাল?

আমি একা নারীবাদী হলেই কি সমাজ মুক্ত হয়ে যাবে? এই সমাজ কি প্রস্তুত আমাকে আমার কথা বলার অধিকার, পছন্দ প্রকাশ করার অধিকার তুলে ধরতে? যারা নারীর অর্গাজম নিয়ে চিন্তিত তারা কি জানে এই সমাজে এখনও কত শত নারী রাতের পর রাত চোখের পানিতে নির্ঘুম রাত কাটায়?

বেশিদূর যেতে হবে না, আমাদের এই শহুরে শিক্ষিত সমাজের দিকেই তাকান। গ্রামের নারীর কথা নাই বা আনলাম। সাম্প্রতিক আমার ব্যক্তিগত জীবন এবং আশেপাশের বেশ কয়েকজন নারীকে খুব কাছ থেকে দেখে এই উপলব্ধিতে এসেছি যে, আমরা নারীরা শিক্ষিত হয়েছি, উচ্চপদে চাকরি করছি, সমাজে একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে ঘুরে বেড়াচ্ছি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি কিন্তু এই স্বাধীনতা ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ আপনি আপসের সীমায় আছেন। ধরে নিন আপনি একজন বিবাহিত নারী। আপনার একটি ভালো চাকরি আছে, সংসারে স্বামী আছে, সন্তান আছে। একাধারে আপনাকে সংসারের জন্য অর্থের সংস্থান করতে হচ্ছে, কারণ এই সমাজে খুব কম মেয়েই আছে, যারা কেবল টাইম পাস করার জন্য ফুলটাইম চাকরি করে, বেশিরভাগই আত্মমর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার আশায় এবং সংসারের সচ্ছলতার জন্যই আয়ের রাস্তায় যায়।

অন্যদিকে সংসারের ঝাড়– থেকে শুরু করে বিছানা পর্যন্ত গুছিয়ে রাখাটাও আপনার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। সন্তানের দেখভাল করা, পড়াশোনার দেখভাল করা, রান্নাঘরের আয়োজন করা, রাতে স্বামীর সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানো, এ সবই আপনার দায়িত্ব ও কর্তব্য।

যতদিন আপনি এই চেইন সুচারুভাবে টেনে নিয়ে যাবেন, ততদিন আপনি ঘরের ‘ভালো বউ’। আপনার স্বামীও আপনাকে নানারকম সুরেলা ডাকে ডাকবে। একদিন আপনি নিজে অনুভব করবেন, এই করতে করতে আপনি টায়ার্ড। আপনার আশেপাশে বন্ধুরা অনেক দূরে, জীবনে আপনি যা হতে বা করতে চেয়েছিলেন, তার ধারেকাছেও আপনি নেই। আপনি নিজের মতো করে বাঁচতে চান, আপনিও চান কিছুটা সময় বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে, যেখানে অন্তত সংসারের ঘানি থেকে আপনি বাইরে থাকতে পারবেন।

বিছানায় গিয়ে আপনি আর আগের মতো সুখ পান না। কারণ কারও সঙ্গে যৌনসঙ্গমে জড়ানোটা পুরোপুরি মানসিক, এখানে শারীরিক দিকটা হচ্ছে বাধ্য হয়ে করার মতো। আপনি যদি কাউকে মন থেকে ফিল না করেন, তাহলে তার সঙ্গে কেবল শরীরে শরীর মেলাতে পারবেন কিন্তু তৃপ্তির বিষয় থাকবে অনুপস্থিত। তাহলে কোথায় তখন নারীর অর্গাজমের ব্যাপার? আপনি দিনের পর দিন আর ঘানিটানা বলদ থাকতে চান না। আপনি আকাশে উড়তে চান। আপনি চান আপনার মনের কথা বোঝে এমন কারও সঙ্গে সময় কাটাতে। আছে কি সেই স্বাধীনতা?

সম্প্রতি আমার খুব কাছের একজন নারী যে নিজে ইনকাম করে, তার যত অর্জন সব নিজের ক্ষমতায় করা। তার স্বামী ব্যক্তিটি শিক্ষাজীবনে ডাক্তারি নামক একটি সার্টিফিকেট অর্জন করেছেন, কেবল কিন্তু বাস্তবে সে লবডঙ্কা। আয়-রোজগারে নেই কোনও স্থায়িত্ব। দুই সন্তানের সংসার তাদের। মেয়েটি তার ব্যক্তিজীবনে ছিল অত্যন্ত চঞ্চল, আধুনিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত এবং প্রচ- বন্ধুপ্রিয় আড্ডাবাজ। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সে একজনকে পছন্দ করেছিল কিন্তু যেহেতু প্রেম করেছে, তাই ছেলেটি প্রতিষ্ঠিত হলেও তার বাবা তাকে সেখানে বিয়ে না দিয়ে এই সার্টিফিকেটধারীর কাছে বিয়ে দিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই মেয়েটি সেখানে মানসিকভাবে জড়িয়ে ছিল না। প্রতিনিয়ত লেগেই আছে অশান্তি। দু’দিন আগে দেখলাম মেয়েটি আমার কাছে এসেছে সাহায্য চাইতে, তার স্বামীর সন্দেহ সে অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ সে স্বামীর প্রতি সেভাবে অনুরক্ত নয়।

কেবল সন্দেহের ওপর নিভর্র করেই যতভাবে অপমান করা যায়, তাকে করেছে। খেয়াল করে দেখলাম তার নাক ফোলা, ঠোঁটের নিচে কাটা। ফোঁপাতে ফোঁপাতে আমাকে বলল তার স্বামীর হাতে কিভাবে মার খেয়েছে। এরপর থেকে মেয়েটির পরিবার তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখেছে। এই ঘটনাটি আমাকে মারাত্মকভাবে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে।

সন্দেহের বশেই যেখানে একটি শিক্ষিত এবং আর্থিকভাবে স্বাধীন একজন নারীকে এমনভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়, সেখানে যেসব নারী স্বামীর ওপর নির্ভরশীল, তার ক্ষেত্রে কিসের মত প্রকাশ, কিসের অর্গাজম, কিসের শরীরের স্বাধীনতা আর কোথায় পোশাক নির্ধারণের অধিকার?

এই মেয়েটি এখন দিনে রাতে ভয়ের মধ্যে থাকে, কী করবে সিদ্ধান্তহীনতায় আছে। নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস পাচ্ছে না কারণ কার ওপর ভরসা করে ঘর ছাড়বে? না পারছে বেকার এবং অত্যাচারী স্বামীকে মন থেকে মেনে নিতে, না পারছে নিজের ভালোলাগাকে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারছে পরিবারের কাছে খোলামেলা নিজের কষ্টকে শেয়ার করতে। প্রতিনিয়ত গুমরে মরছে। আরেকজন নারী হিসেবে আমিও কেবল শুনেই যাচ্ছি, নিজেকে নিজের জীবনের ছবি মেলানোর চেষ্টা করছি। এক্ষেত্রে আমিও অসহায়। তাই এই লেখাটা একান্তই আমার বিবেকের তাড়নায়।

এই গল্পটি বলার অর্থ হচ্ছে, আজ আমরা যতই ফেসবুকে আমি নারীবাদী, অমুক নারীবাদী নয়, আমি এই অধিকার চাই, কেন আমাকে দেয়া হবে না, বলে চিৎকার করি না কেন, বাস্তবে সমাজে এসব শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে না পারলে দিন শেষে আমার চিৎকারে কেবল আমার গলাটাই চিরে যাবে, এর সঙ্গে মেলানোর আর কোনও গলা পাওয়া যাবে না। তাই কে কতটা নারীবাদী এই প্রতিযোগিতা বাদ দিয়ে সত্যিকার অর্থেই একজন নারীকে সমাজে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার যে পরিবেশ, সে পরিবেশ তৈরিতেই লড়াই করে যেতে হবে সম্মিলিতভাবে। যেখানে নারী বা পুরুষ নয়, আমরা সবাই মানুষ হিসেবেই অংশ নেব। জয় হোক সব নারীর।

লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ