প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কেন একটা নতুন সামাজিক চুক্তি ছাড়া আমরা এক পা এগুতে পারবো না

ফিরোজ আহমেদ : বহু রকম দ্বন্দ্ব আছে যা সমাজকে অগ্রসর করে। নাগরিকদের মর্যাদা দেয়, রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। সংস্কৃতিকে বিকশিত করে। অর্থনীতিকে চনমনে রাখে, ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায়। নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা হতে থাকে। গণনজরদারি সর্বত্র জবাবদিহিতা আর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। দুর্নীতি হ্রাস পায়। বাংলাদেশ কোন পরিস্থিতিতে আছে, তা আপনারা সকলেই জানেন। এই রকম একটা পরিস্থিতিতেই গণসংহতি আন্দোলন বিদ্যমান সংকট-সংঘাত উত্তরণে নতুন জাতীয় সনদ এর কথা তুলেছে। আমরা একটা প্রস্তাবনা দিয়েছি। আপনারা তা পড়ে দেখতে পারেন। জনগণের মতামত, গ্রহণ বা বর্জনের ভিত্তিতেই তা ক্রমাগত সুনির্দিষ্টতর রূপ পেতে থাকবে, কিন্তু তার মূল ভিত্তিটাকে ধরে সংগ্রামকেও জারি রাখতে হবে। আপাতত কয়েকটি পুরনো কথা নতুন করে বলছি আবারও।

জাতীয় সনদের মূল ভিত্তি কী? আপনারা কি শ্রমিক, কৃষকের দাবি ছেড়ে দিয়েছেন? শ্রেণি সমঝোতা করছেন? মন্ত্রী হবেন? অন্য বামদের সাথে আপনাদের সম্পর্ক কী? নতুন জাতীয় সনদে আওয়ামী লীগকেও গণতান্ত্রিক অধিকার দেবেন মানে কী, তাদের নির্যাতন ভুলে গেছেন? বিএনপির সাথে মিত্রতা করছেন, কী সর্বনাশ!

এই প্রশ্নগুলোই আলাপ করা দরকার। আমাদের আলাপ-আলোচনা এবং একই সাথে মাঠে হাজির থাকার মধ্য দিয়েই আগামী দিনের বাংলাদেশ রূপ পাবে।

১. নতুন জাতীয় সনদ হবে বাংলাদেশের জন্য নতুন একটা সামাজিক চুক্তি। নতুন জাতীয় সনদ আমাদেরকে প্রজাতন্ত্র থেকে নাগরিকতন্ত্রে উন্নীত করবে।

প্রতিটা রাষ্ট্র পরিচালিত হয় তার সংবিধান দিয়ে। এটা নাগরিকদের অধিকার, কর্তব্য, সীমা নির্ধারণ করে, সত্যি। কিন্তু সংবিধানের আরও বেশি করার কথা সরকারের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশের সংবিধানই ওদিকে ৭২ সাল থেকেই এককেন্দ্রিক ক্ষমতার উৎস। এমনকি ৭২ এর সংবিধান প্রণয়নের আগেই রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করে সংবিধান প্রণেতাদের কথা বলার এখতিয়ার খর্ব করা হয়েছিল, পৃথিবীর ইতিহাসে যার দ্বিতীয় নজির খুঁজলে পাওয়া যাবে না। ফলে, নামকাওয়াস্তে গণতন্ত্র ধর্ম নিরপেক্ষতা সমাজতন্ত্র এই সব থাকলেও কার্যত ৭২ এর সংবিধান প্রধানমন্ত্রীর হাতে সকল ক্ষমতা অর্পণ করেছিল। এই ক্ষমতা এমনই সর্বব্যাপী যে, পরবর্তীকালের সামরিক সরকারগুলোও সংবিধানের এই মৌলিক ক্ষমতাকাঠামো বদলের দরকার দেখেনি। বরং তাকে সানন্দে ব্যবহার করেছিল।

বাংলাদেশে আজ যে পরিবারতন্ত্রের জন্ম হয়েছে, তারও উৎস সংবিধানের এই অগণতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামো।

২. নতুন জাতীয় সনদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করবে।

জবাবদিহিতাহীন এককেন্দ্রিক স্বৈরকাঠামোর সংবিধানের দীর্ঘ মেয়াদে ফলাফল হলো এই দেশে ক্রমাগতভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে, তারপর ভঙ্গুর হয়েছে। তারপর একসময় অকার্যকর হয়েছে। এমন কিন্তু না যে, সমাজ থেকে যোগ্য ও সক্ষম ব্যক্তিরা অদৃশ্য হয়েছেন। বরং এমন যে, মোসাহেব ও অযোগ্য কিন্তু হুকুম পালনে দক্ষ ব্যক্তিরাই সকল প্রতিষ্ঠানের প্রধান জায়গাগুলোতে সমাসীন হয়েছেন নিয়ন্ত্রণহীন এককেন্দ্রিক শাসনের বদৌলতে। দায়িত্বপালন না, ক্ষমতাকে খুশি করাই একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৩. নতুন জাতীয় সনদের মূল ভিত্তি হবে অধিকার।

আপনারা সকলেই নিত্য দিনের অভিজ্ঞতায় জানেন, ক্ষমতায় নেই মানেই আপনি নাগরিক অধিকার হারিয়েছেন, এই হলো বাংলাদেশের পরিস্থিতি। ফলে কোন নিয়মতান্ত্রিক পথে অর্থনীতি চলে না, রাজনীতিও না। ক্ষমতা দখল মানে হলো ফুটপাথে হকার বসানো থেকে শুরু করে উপাচার্য নিয়োগ পর্যন্ত একচেটিয়া ক্ষমতা। ক্ষমতা দখল মানে সরকারের বিরাগভাজন এমন সকলের জীবন সম্পদ মর্যাদা ক্ষমতাসীনদের মর্জির আওতায় চলে আসা। এই কারণেই আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি, শহিদুল আলম মাসের পর মাস কারাগারে, অজস্র গুম-খুন, অথচ অতিবড় সব সন্ত্রাসী এবং লুটেরারা দেশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।এই কারণেই ছাত্রাবাসে ছাত্রাবাসে নির্যাতন শিবির।

সরকারি কর্মীরা কতটুকু ভালো আছে? এইভাবে চিরকাল কি ক্ষমতা দখল করে রাখা যাবে? সরকার তার নিজের কর্মীদের সাবধান করে দিচ্ছে যে, ক্ষমতা না থাকলে লক্ষ লক্ষ জীবন হানি ঘটবে!

৪. নতুন জাতীয় সনদ পরিস্কার ঘোষণা করবে যে, নারীর বিরুদ্ধে, কোন ধর্ম-সম্প্রদায় ও অংশের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক কোন আইন রাষ্ট্রে থাকবে না। নতুন সনদ সকল নিয়োগের বেলায় যেমন বৈষম্য ও অগণতান্ত্রিক সুবিধা বাতিল করবে, তেমনি ভাবে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্যই আদিবাসী-পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী-নারীর জন্য সংরক্ষণ সহ সকল প্রকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সকলের নাগরিক মর্যাদা ও বিকাশের শর্তগুলোকে নিশ্চিত করেই নতুন সনদ তার যাত্রা শুরু করবে।

পরিচিতি : সদস্য, রাজনৈতিক পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ