প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রিয় মানুষ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

কাকন রেজা : আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জন্মদিন পালিত হয়েছে। যাকে সম্ভাষিত করা হয় ‘আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর’ বলে। ইন্টারনেটের যুগে ভার্চুয়ালি জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতো যাবো এমন সময় চোখ গেলো সেলফোনের মনিটরে। দেখলাম, একজন প্রশ্ন রেখে বলেছেন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের তৈরি আলোকিত মানুষের নাম বলার জন্য, অন্তত একজন হলেও। বাঁকা হলেও প্রশ্নটা আলোচনার দাবী রাখে। একজন মানুষ সারাজীবন মানুষকে বইমুখি করার চেষ্টা করলেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়লেন, গাড়িকে লাইব্রেরি বানিয়ে তা সারাদেশের মানুষের কাছে পৌছানোর চেষ্টা করলেন। যেখানে ডাকা হলো ছুটে গেলেন, মানুষকে বললেন বই পড়তে।

‘পড়া’ ছাড়া আলোকিত মানুষ হবার আর কোনো রাস্তা আছে কী-না আমার জানা নেই। স্বয়ং আল্লাহতায়ালা’র রাসুলের প্রতি প্রথম আহ্বান ছিল, ‘পড়’। পড়ার গুরুত্ব স্বয়ং আল্লাহতায়ালাই জানিয়েছেন। জ্ঞান অর্জনে পড়ার বিকল্প নেই। আর সেই পড়ানোর কাজটাই করতে চেয়েছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি পড়ার জন্য আহ্বান করেছেন মানুষকে। মানুষ সেই আহ্বানে কতটুকু বা কিভাবে সারা দেবে সেটা মানুষের ব্যাপার। মসজিদের সুউচ্চ মিনার আহ্বান ভেসে আসে। আজানে ডাকা হয় মানুষকে প্রার্থনার জন্যে। সবাই কী আসে? না আসার দায় কী মুয়াজ্জিনের না মিনারের!

‘আলোকিত মানুষ’ হওয়া কী খুবই সোজা! আলোকিত মানুষ হতে যোগ্যতা লাগে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সফল ও স্বার্থকের মধ্যে যে পার্থক্য করেছেন সে অনুযায়ী চোর ডাকাতও সফল যায়, কিন্তু স্বার্থক হয় কয়জন। স্বার্থক হতে গেলে যে ত্যাগের প্রয়োজন হয়, যে ভয়হীন চিত্তের প্রয়োজন হয় তা কয়জনের আছে। চরম এ দুঃসময়ে সমর্থ শরীরে যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপদ ‘স্ট্যাটাসে’ দায়িত্ব সারেন, তারা মূলত সফল মানুষ, স্বার্থক নন। বিপদটাকে মাথায় রেখে যারা দুঃসময়কে পাড়ি দিতে চান তারা স্বার্থক। তারা আলোকিত। আর সেই স্বার্থকতা তথা আলোর পথটা চেনাতেই প্রয়োজন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদদের।  এমন বলছি না যে, স্বার্থকতা অর্জনের জন্য, স্বার্থক হওয়ার জন্য আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে অনুসরণ বা অনুকরণ করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজন শুধু তার ‘বই পড়া’র আহ্বানটাকে আত্মস্থ করার।

দুই.

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সাথে আত্মীয়তার একটা সম্পর্ক রয়েছে আমার। উনার পিতা আমার খালুজি, প্রিন্সিপাল আযীমউদ্দিন আহমদ। এক সময় ইংরেজি শিখতে হলে খালুজি’র লিখা গ্রামারের কোনো বিকল্প ছিল না। বাংলা সাহিত্যেও ছিলেন তিনি সাবলীল। নিজের লেখা বইয়ের নামে তিনি উত্তর শাহজাহানপুরের বাড়িটির নাম রেখেছিলেন। সেই ‘মহুয়া’তেই কেটেছে আমার শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের অনেকটা সময়। অনেক স্মৃতি রয়েছে সেই বাড়িটিকে ঘিরে। এখনও যাই সেখানে।

তবে আত্মীয়তার কারণেই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কথা বলছি না। শুধু বলছি, অনেকের চেয়ে মানুষটাকে কিছু বেশি চিনি বলে। সবার বড় বলে ভাইয়েরা সবাই ডাকেন উনাকে বড় ভাই, সে সুবাদে আমারও বড় ভাই। এর আগেও লেখায় উল্লেখ করেছিলাম, সম্পর্কে বড় ভাই হলেও উনার অনেক চিন্তার সাথেই আমার নিজের চিন্তা মেলে না। উনার অনেক বিশ্বাসের সাথেও রয়েছে আমার দ্বিমত। অনেকক্ষেত্রে তাঁর সমাজ চিন্তা, সাহিত্য, রাজনীতি ইত্যাদিসব ভাবনার কিছু জায়গা আমার অনেকটাই বিপরীত। কিন্তু তারপরেও মানুষ হিসাবে, মানুষের মঙ্গল কামনায় এই মানুষটি একদম খাঁটি। একফোঁটা খাদ নেই।

উনার সবচেয়ে বড় গুন হলো, তিনি বাহিরে যেমন অন্দরেও তাই। তিনি যা বলেন, তা বিশ্বাস করেন। তাঁর জীবনাচরণেও সেই বিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট। তিনি ইচ্ছা করলেই মন্ত্রীমিনিস্টার হতে পারতেন, পোষা বুদ্ধিজীবী নিদেনপক্ষে বাগাতে পারতেন টিভি চ্যানেল বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইসেন্স। ভূষিত হতে পারতেন নানা ভূষণে। না, তিনি ভূষিত হতে চেয়েছেন মানুষ হিসাবে, বাহিরে-অন্দরের চেনা ভূষণে। এমন নিখাদ মানুষকে যারা ভুল বোঝেন বা ভুলভাবে মূল্যায়ন করতে চান, তারা দুর্ভাগা। মতের অনেক অমিল থাকলেও আনন্দিত এই ভেবে যে, আমি অন্তত দুর্ভাগা নই।

শুভ জন্মদিন বড় ভাই, প্রিয় মানুষ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট/ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ