প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জেসিপিওএ  থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান ও সম্ভাব্য পরিণতি

মুহাম্মাদ মুনীর হুসাইন খান: ছয় জাতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির সাথে ইরানের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তি দীর্ঘ আলোচনার পর তিন বছর আগে স্বাক্ষরিত হয় যা ইংরেজিতে জেসিপিওএ (JCPOA) এবং ফারসিতে বারজম নামে পরিচিতি লাভ করেছে। ইরান এ চুক্তিতে উল্লিখিত যাবতীয় শর্ত পুরোপুরি পূরণ এবং পালন করেছে যা আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা (IAEA) কর্তৃক সমর্থিত হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে যাবতীয় অঙ্গীকার ও শর্ত পুরোপুরি পালন করা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ চুক্তি মোতাবেক তার অঙ্গীকার পূরণ করে নি; বরং নানা বাহানা ও খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে এ আন্তর্জাতিক চুক্তির বাস্তবায়নে বাধা দিয়েছে এবং কার্যত এ চুক্তি থেকে ইরানের যে ন্যায্য অধিকার ও সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল প্রধানত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাধাদান ও প্রতিবন্ধকতার কারণে তা থেকে ইরান আজ পর্যন্ত বঞ্চিত রয়ে গেছে। তারপরেও ইরান এ চুক্তি থেকে সড়ে দাঁড়ায় নি বা বের হয়ে যায় নি। এ আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি ইরান সবসময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ (committed) থেকেছে এবং রয়েছে। অথচ এ চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ চুক্তির প্রতি স্বীয় কমিটমেন্ট বজায় রাখে নি।

স্মর্তব্য যে, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি যদিও এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে এবং নিজেদের স্বতন্ত্র নীতি অবস্থানের অধিকারী বলে প্রকাশ করে থাকে তবুও তারা আন্তর্জাতিক এমনকি আঞ্চলিক বিষয়াদির ক্ষেত্র কার্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিরই অনুসরণ ও পশ্চাদ্ধাবন করে থাকে অর্থাত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের ভিতরে থাকার কারণে তাদের স্বাধীন নীতি অবস্থান নেই। আর এদের মধ্যে ব্রিটেন তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূলত অতি নিকট মিত্র। তাই ঐতিহাসিকভাবে বিশেষত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর কাল থেকে ব্রিটেন সবসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় রয়েছে এবং মার্কিন ও ব্রিটেনের মাঝে নীতিগত তেমন কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না । বরং এ দুই পরাশক্তির মধ্যে আদর্শিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক স্বার্থকেন্দ্রিক মিথস্ক্রিয়া সংগঠিত হয়ে এ পরাশক্তিদ্বয়কে আসলে একীভূত এক পরাশক্তি হিসেবে দেখাই শ্রেয় যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে বাহ্যত মতপার্থক্য বা ভিন্নতা দৃষ্টিগোচর হয়। আর যেমন আগে উল্লেখ করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও প্রতিরক্ষা বলয়ের মধ্যে থাকার কারণে ফ্রান্স ও জার্মানি তথা ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বাধীন স্বতন্ত্র নীতি অবস্থান ও পলিসি নেই। কেবল থাকে রাশিয়া ও চীন যারা এই জেসিপিওএ বা বারজমের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও উক্ত ইউরোপীয় দেশত্রয়ের মোকাবেলায় স্বাধীন স্বতন্ত্র নীতি অবস্থানের অধিকারী। ইরান যে এই আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি সবসময় কমিটেড আছে এবং চুক্তিতে উল্লিখিত যাবতীয় শর্ত পালন করেছে এবং চুক্তিটির সব ধারা মেনে চলছে সে ব্যাপারে আইএইএ (IAEA) ছাড়াও চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো পর্যন্ত বলেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রই হচ্ছে একমাত্র দেশ বিশেষ করে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে বলে বেড়াচ্ছে যে এ চুক্তিটি নাকি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খারাপ চুক্তি। কারণ, এ চুক্তির বদৌলতে ইরান নাকি (যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায়) পারমাণবিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আরোপিত অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়ার সুযোগ নিয়ে বিশ্বে সন্ত্রাসবাদের মদদ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্প্রসারণ ও অন্যান্য দেশে হস্তক্ষেপ করা সহ সকল অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ দাবি সর্বৈব মিথ্যা যা বলাই বাহুল্য। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি মোতাবেক কাজ করে নি এবং স্বীয় প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করে নি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আরোপিত কোনো নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ তো তুলে নেয়া হয় নি বরং এ চুক্তি সম্পাদিত ও স্বাক্ষরিত হওয়ার পরেও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন বাহানায় বিভিন্ন সময় ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নও এই চুক্তি স্বাক্ষরের পরেও কিছু কিছু ক্ষেত্র ইরানের উপর নতুন সীমিত অবরোধ আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাধাদান ও প্রতিবন্ধকতা আরোপের কারণে ইরান আজও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেন সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দিতে পারছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোপানলে পড়ার ভয়ে গুটিকতক ব্যাংক ছাড়া অধিকাংশ বৈদেশিক ব্যাংকই ইরানের কেন্দ্রীয় ও অন্যান্য ব্যাংকের সাথে লেনদেন করতে ভয় পায়। আর ঐ একই কথা আন্তর্জাতিক ও বৈদেশিক শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অথচ জেসিপিওএ মোতাবেক এ সব অবরোধ ও প্রতিবন্ধকতা তুলে নেয়ার কথা। আসল কথা হচ্ছে এই যে যুক্তরাষ্ট্রের কানভাঙানি ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণে আন্তর্জাতিক এ চুক্তিটি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর দৃষ্টিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক রূপগত ও প্রাণগতভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। বিগত এ তিন বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকলাপ থেকে প্রমাণিত হয় যে এদেশটি আসলে এই চুক্তির বাস্তবায়ন চায় না। বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে এই চুক্তি থেকে বা এ ধরনের চুক্তি করে ইরানের কাছ থেকে বর্ধিত ফায়দা ও সুযোগ সুবিধা নিতে এবং ইরানকে বিভিন্ন ধরনের চুক্তির মাধ্যমে বেঁধে ফেলতে ও নিয়ন্ত্রণ করে ধরাশায়ী করতে যেখানে ইরানের বিন্দুমাত্র লাভ ও ফায়দা অর্জিত হবে না। আর যদি অর্জিতও হয় তাহলে তা হবে অতি নগণ্য। জেসিপিওএ প্রসঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সম্ভাব্য তিনটি পথ ছিল।

১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্য সকল স্বাক্ষরকারী পক্ষের মত এ চুক্তি মেনে নেবে এবং এর দিকে ফিরে আসবে এবং এ চুক্তির সকল ধারা ইরানের সাথে একমত হয়ে বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু এ ধরনের সম্ভাবনা খুবই কম ছিল। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় না যে এই পারমাণবিক চুক্তির কারণে ইরান তার পারমাণবিক কার্যক্রম দীর্ঘদিনের জন্য সীমিত করার বিনিময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে যে যতকিঞ্চিত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েছে সেটুকুও পাক। তাই মার্কিন স্ট্রাটেজিক প্রেক্ষিতে এ ধরনের সম্ভাবনা বাস্তবতার সাথে মেলে না।

২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর এ চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়া। যদি বের হয়ে যায় এবং ট্রাম্পের ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাস্তবে যা ঘটেছে, এ অবস্থায় দেখার বিষয় হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন তথা ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি কী করে। তারা কি চুক্তি মেনে চলবে…. তাদের পক্ষে কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করে এ চুক্তি মেনে চলা, এর ধারা ও শর্তাবলি বাস্তবায়ন করা আদৌ সম্ভব হবে…. যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ চুক্তিটাকে অনেকটা অকার্যকর করে ঝুলিয়ে (সাসপেন্ডেড করে) রেখেছিল তখনও ঐ ইউরোপীয় দেশগুলোর পক্ষে এ চুক্তির অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছিল না। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় এই ইউরোপীয় দেশগুলোর পক্ষে চুক্তি বাস্তবায়ন ও মেনে চলা কিভাবে সম্ভব হবে…. ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশেষ করে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি চুক্তি থেকে বের হবে না বলে যে বক্তব্য দিচ্ছে তাতে তাদের (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং এই তিন ইউরোপীয় দেশ) চালাকি ও গভীর ষড়যন্ত্র আছে কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার।

৩. চুক্তি থেকে বের না হয়ে বরং পূর্বের মতো তা অসার ও অকার্যকর করে ঝুলিয়ে (সাসপেন্ডেড) রাখা। কারো কারো মতে এতেই হয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফায়দা ও দুরভিসন্ধি সবচেয়ে বেশি অর্জিত হবে। কারণ, একদিকে যেমন ইরান নিজের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করেও এ চুক্তি থেকে উপকৃত হতে পারবে না ঠিক তেমনি প্রতিদিন নিত্য নতুন বাহানা ও অজুহাত এনে এ চুক্তিকে আরো অসার ও অকার্যকর করতে পারবে এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা কর্মসূচি সীমিতকরণ, (ইরানের) মানবাধিকার, নারী অধিকার, বাক স্বাধীনতার অবস্থা, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে ইন্ধন যোগান এবং প্রতিবেশী দেশগুলোয় অযাচিত হস্তক্ষেপ ইত্যাদির মতো বহু বিষয়ের ধুয়া তুলে ইরানকে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সাথে আলোচনায় বসতে এবং পারমাণবিক চুক্তির মতো আরো কিছু জেসিপিওএ স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা যাবে। আর যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে যদি এ চুক্তিটি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা যায় তাহলে ভবিষ্যতে এক পর্যায়ে যেমন চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী পাঁচ দেশ বিশেষ করে তিন পশ্চিম ইউরোপীয় দেশ (ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি) ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থাপিত বিষয়গুলোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রসহ উক্ত পাঁচ দেশের সাথে আলোচনা করার চাপ দেবে এবং দীর্ঘদিন এ ধরনের অচলাবস্থা বজায় রাখলে প্রস্তাবিত বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করার প্রসঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরে মতভেদেরও উদ্ভব করা যেতে পারে।

অনেকেই তৃতীয় সম্ভাবনার উপর জোর দিয়ে বলেছিল যে ট্রাম্প জেসিপিওএ থেকে বের না হয়ে বরং এটাকে অকার্যকর করে ঝুলিয়ে রাখবে যার ফলে একাধারে জেসিপিওএ লোকদেখানোর অর্থে বহাল থাকবে, কিন্তু বাস্তবে তা হয়ে যাবে অন্তঃসারশূন্য একটা চুক্তি এবং ইরান এ থেকে মোটেও উপকৃত ও লাভবান হতে পারবে না।তবে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে হয়তো তিনি ঠিক এ কাজটাই করতেন। ট্রাম্পের বদলে অন্য কোনো রিপাবলিক্যান প্রেসিডেন্ট কি এ কাজ করতেন কিনা তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও ট্রাম্পের ব্যাপারে বলতে হয় যে তিনি বেশ অস্থিরমনা, একগুঁয়ে ও স্বার্থপর এবং স্বার্থসিদ্ধির জন্য এধরনের ব্যক্তি চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করতেও দ্বিধাবোধ করে না। আর ইতিমধ্যে তিনি আরও দুটি আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকেও বের হয়ে এসেছেন। তাই অনেকে হয়তো সেই আলোকে বলতে পারেন যে, জেসিপিওএ থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়ার এ পদক্ষেপ কিছুটা হলেও প্রেডিক্টেবল ছিল। মার্কিন তথা পাশ্চাত্যের নেতৃবৃন্দ সবাই ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। তাই স্বার্থের জন্য তারা চুক্তি করে এবং স্বার্থ সিদ্ধির জন্য আবার অনায়াসে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করে।

ট্রাম্প ৮ মে ২০১৮ জেসিপিওএ থেকে বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থাত দ্বিতীয় সম্ভাবনাটাই বাস্তবায়িত হল। যদিও আমরা এ সম্ভাবনাটাকে ক্ষীণ বলে উল্লেখ করেছিলাম। আর এই ক্ষীণ সম্ভাবনাটাই শেষ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও নিশ্চিত হয়ে গেল। এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশেষ করে তিন শক্তি ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি তাতক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছে যে, যে পর্যন্ত ইরান এই জেসিপিওএ মেনে চলব সে পর্যন্ত তাদের কাছেও এ চুক্তি বলবত ও কার্যকর থাকবে। অর্থাত এই তিন পরাশক্তির দৃষ্টিতে এই জেসিপিওএ কার্যকর থাকা বা না থাকাটা নির্ভর করছে কেবল ইরানের উপর, এমনকি চুক্তির যে কোনো পক্ষ এ চুক্তি থেকে বের হয়ে গেলেও, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তাই কেউ এখন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার জন্য কেবল মৌখিক দুঃখ ও উদ্বেগ-উতকণ্ঠা প্রকাশ করা ছাড়া আন্তর্জাতিক চুক্তি ভঙ্গের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ বা শাস্তির কথা বলছে না। এখন ধরুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র না হয়ে ইরান যদি এই চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে বেরিয়ে আসত তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থা ও সংগঠন ইরানকে এই চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য দোষী সাব্যস্ত এবং এজন্য দেশটির বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করত।

লক্ষণীয় যে, জেসিপিওএ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া বেআইনি বলা হচ্ছে না, অথচ ইরান যদি এ কাজটা করত তাহলে নিঃসন্দেহে ইরানের এ পদক্ষেপকে বেআইনি বলে নিন্দা করা হত। ব্যাপারটা যেন এমন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দৃষ্টিতে ইরান পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার করার জন্য মহা অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছে এবং একমাত্র ইরানকেই এ অপরাধের দুর্নাম ঘোচানোর জন্য সব কিছু করতে হবে, এমনকি ইরান ও ছয় জাতিজোটের মধ্য যে পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে সেই পারমাণবিক চুক্তিটি বলবত ও লঙ্ঘনের সম্পূর্ণ দায়ভারও যেন ইরানের উপর ন্যস্ত। তাই যাবতীয় শর্ত ও ধারা মেনে চলা সত্ত্বেও ইরান চুক্তিটা ঠিকমতো মেনে চলছে না বরং পারমাণবিক বোমা বানানোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে নিছক এ ধরনের কিছু অযৌক্তিক সন্দেহ ও বাহানার উপর ভিত্তি করে এ চুক্তি থেকে বের হয়ে যেতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা যে কোনো দেশ।

অন্ততঃপক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো ঠিক এটাই মনে করে। আসলে সভ্য জগতে এ এক অসভ্য জংলীপনার দৌরাত্ম ছাড়া আর কিছু কি…. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো যে কোনো প্রভাবশালী দেশ ও শক্তি আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘনের মতো যে কোনো ধরনের অন্যায় ও গর্হিত কাজ করুক না কেন তা সাত খুন মাফ। আর এটাই হচ্ছে জোর যার মুল্লুক তার নীতি এবং বর্তমান বিশ্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো কতিপয় মাস্তান, চাঁদাবাজ ও শার্লাতান শক্তি ও রাষ্ট্রের খপ্পর ও পাল্লায় পরে মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছে। যুক্তিবুদ্ধির পরিবর্তে শক্তি ও ক্ষমতার দৌরাত্ম ও দাপটই হচ্ছে সবকিছুর নির্ধারক।

যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও ক্ষমতা আছে সেহেতু সে যা করবে যা বলবে সেটাকেই মধ্যযুগীয় স্টাইলে জোঁ জাহাঁপনা বলে মেনে নিতে হবে। মধ্যযুগীয় টোটালিটারিয়ানিজম ও একনায়কত্বের ভূত সমগ্র পাশ্চাত্য বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘাড়ে চেপে বসে আছে। আর সেজন্যই বিশ্বজুড়ে সেই ভূতের তাণ্ডব লীলা চলছে এবং বিশেষ করে ইরান ও ছয় জাতিজোটের মধ্যকার এ চুক্তির উপরও তার অশুভ ছায়া বিস্তার করে রেখেছে। ইরান যে পর্যন্ত এই জেসিপিওএ মেনে চলবে সে পর্যন্ত এ চুক্তি তিনদেশের কাছেও বলবত ও বহাল থাকবে অর্থাত তারাও এ চুক্তির প্রতি নিবেদিত ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে- তিন ইউরোপীয় দেশের এ কথার অর্থ ও তাতপর্য সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে। আমরা যেমন আগেও উল্লেখ করেছি তদনুযায়ী ইরান ও ছয় জাতিজোটের মধ্যকার স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি বা জেসিপিওএ-এর টিকে থাকাটা নির্ভর করছে ইরানের উপর অর্থাত এ চুক্তির টিকে থাকাটা তারা চাপিয়ে দিয়েছে এক তরফা ভাবে ইরানের উপর এবং এভাবে তারা নিজেদেরকে এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। তাই ভবিষ্যতে যদি যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য ইরান এ চুক্তি থেকে উপকৃত হতে না পারে অর্থাত এ চুক্তি কার্যত অসার হয়ে যায় এবং ইরানের জতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ সম্ভব না হওয়ার কারণে ইরান এ চুক্তি থেকে বের হয়ে আসে তাহলেও এ চুক্তি ভঙ্গ ও ব্যর্থ হওয়ার দায় ইরানকেই বহন করতে হবে।

চুক্তির ব্যাপারে যে চালাকিটা ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন করতে পারে সেটা হয়তো এমন হতে পারে যে তারা উক্ত চুক্তির ব্যাপারে কেবল রাজনৈতিক মৌখিক সমর্থন দিয়ে যাবে, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মোকাবেলায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকবে এবং যেসব ইউরোপীয় কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক ইরানের সাথে লেন-দেন করতে গেলেই মার্কিন অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা কবলিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে অর্থাত বিশাল পরিমাণ অর্থ দণ্ডে দণ্ডিত হবে তাদেরকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং উক্ত দেশত্রয় আইনি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে না। তাই এ অবস্থা সৃষ্টি হলে কোনো ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক এই রিস্ক নিয়ে ইরানের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে আগ্রহী হবে না এবং ইরান এ অবস্থার প্রতিবাদ করলেই তারা বলবে যে তারা তো জেসিপিওএ মেনে চলছে এবং যেহেতু তাদের দেশে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা রয়েছে সেজন্য তারা তাদের দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংককে স্বায়ত্বশাসিত হওয়ার জন্য ইরানের সাথে ব্যবসায় করতে যেমন নিষেধ করছে না ঠিক তেমনি তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও ইরানের সাথে ব্যবসায় করতে যায় তাতেও বাধা দেবে না এবং ইরানের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করবে কি করবে না এটা হচ্ছে তাদের (ঐ সব প্রতিষ্ঠান) সম্পূর্ণ ইচ্ছাধীন। ব্যাস এই ভাবে গণতন্ত্র ও মুক্তবাণিজ্যের দোহাই দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উক্ত তিন পরাশক্তি জেসিপিওএ’র বরাবরে নিজেদের নীতি অবস্থান বুঝিয়ে দেবে। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তারা (ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং উক্ত পরাশক্তিত্রয়) মিসাইল কর্মসূচি এবং আরো অন্যান্য বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয় জাতিজোটের সাথে নতুন করে ইরানের আলোচনা করারও চাপ দিতে পারে যা হবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জেসিপিওএ-এর সম্প্রসারণ অথবা নতুন নতুন জেসিপিওএ চুক্তি স্বাক্ষর।

আর দেখা গেছে যে সুযোগ পেলেই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সহ বেশ কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ে ইরানের সাথে আলোচনার জিগির তোলে ব্রিটেন, ফ্রান্স তথা ইউরোপীয় ইউনয়নও। তাই জেসিপিওএ থেকে ট্রাম্পের সরাসরি ও স্পষ্টভাবে বের হয়ে যাওয়া চুক্তিটি অসার ও ব্যর্থ করার এক পদক্ষেপ এবং চুক্তি থেকে বের না হয়ে বরং চুক্তি বলবত থাকা বা না থাকার দায় দায়িত্ব ইরানের উপর চাপিয়ে দিয়ে উক্ত ইউরোপীয় পরাশক্তিত্রয়ের চুক্তিটির সুষ্ঠু বাস্তবায়নের ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় থাকা হচ্ছে জেসিপিওএ ব্যর্থ করার আরেক ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ হতে পারে যা ভবিষ্যত ঘটনাবলি থেকে স্পষ্ট হতে পারে। তাই চুক্তিটি যদি নিষ্ক্রিয় ও ব্যর্থ হয় অর্থাত ইরানের জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষিত না হয় এবং এ কারণে যদি ইরান চুক্তি থেকে বের হয়ে যায় তাহলে বের হওয়া মাত্রই ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উক্ত দেশত্রয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগ দিয়ে জেসিপিওএ এর ব্যর্থতা ও লঙ্ঘনের জন্য ইরানকেই একযোগে দায়ী করে আরো কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ অর্থাত কঠোর অবরোধ আরোপের উদ্যোগ নিতে দ্বিধাবোধ করবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বের হওয়া ও ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির বের না হওয়া এবং পরবর্তী সিনারিওসমূহের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হতে পারে ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্যে ফাটল এবং ইরানিদের মাঝে মতবিরোধ সৃষ্টি করে তা থেকে সাম্রাজ্যবাদী ফায়দা উঠানোর চেষ্টা। আমরা ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি তথা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো সামরিক জোট মূলত মার্কিন প্রভাব বলয়ের মধ্যে থাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবেলায় তাদের স্বাতন্ত্য ও স্বাধীনতা নেই এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন করে বিরোধ এবং কোল্ড ওয়ারের পদধ্বনি থেকে প্রমাণিত হয় যে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ গোটা ইউরোপীয় ইউনিয়নই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী এবং এ কারণে জেসিপিওএর মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে যে তাদের স্বাধীন-স্বতন্ত্র নীতি অবস্থান থাকতে পারে তা বিশ্বাসই করা যায় না। উপরন্তু ব্রিটেন হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র, জ্ঞাতি ও আত্মীয়। তাই কিভাবে বিশ্বাস করা যায় যে অতি গুরুত্বপূর্ণ জেসিপিওএ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের মাঝে ফাটল ও বিরোধ দেখা দেয়েছে…. আর তাই এ তিন ইউরোপীয় দেশ তথা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে মোটেও বিশ্বাস করা যায় না। ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বলেছেন: ‘আমি এই তিন ইউরোপীয় দেশকে একটুও বিশ্বাস করি না। (ইরান) সরকার একটা চুক্তি করতে চাইলে তাদের উচিত হবে এতদসংক্রান্ত জামানতের (গ্যারান্টি) প্রতিশ্রুতি নেয়া। আর তা না হলে যুক্তরাষ্ট্র যা করেছে তারাও ঠিক তাই করবে। আর যদি সুনির্দিষ্ট জামানত বা নিশ্চয়তা না থাকে তাহলে জেসিপিওএ আর টিকে থাকবে না।’ আর ভবিষ্যত ঘটনাপ্রবাহ প্রকৃত অবস্থাকে আরো স্পষ্ট করে দেবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত