প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুপ্রিমকোর্টে সক্রিয় জালিয়াত চক্র

ডেস্ক রিপোর্ট: সুপ্রিমকোর্টে সক্রিয় বিভিন্ন জালিয়াত চক্র। এই চক্র জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে আসামিদের জামিন নেওয়ার ক্ষেত্রে ভুয়া এফআইআর, চার্জশিট, জব্দ তালিকা দাখিল করছে। অভিযোগের গুরুত্ব কমিয়ে তৈরি করা কাগজপত্র দেখিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করে পক্ষে নেওয়া হচ্ছে আদেশ। ফৌজদারি বিবিধ শাখায় এসব ঘটনা বেশি ঘটছে। এখন পর্যন্ত ধরাও পড়েছে একের পর এক ঘটনা।

গত ১২ এপ্রিল উচ্চ আদালতে অবকাশ শুরুর আগের এক সপ্তাহেই হাইকোর্টে জামিন নেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের চারটি ঘটনা ধরা পড়ে।গত ১৫ এপ্রিল ৫৫০ গ্রাম হেরোইন ৪৮ গ্রাম দেখিয়ে জামিন নেওয়া এক আসামির জামিন বাতিল করে মামলা করার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি শেখ আবদুল আওয়াল ও বিচারপতি মো. খসরুজ্জামানের বেঞ্চ। এ ছাড়া এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের বেঞ্চ হত্যাসহ দুটি মামলায় জালিয়াতির কারণে জামিন বাতিল করে আসামিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ওই বেঞ্চের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. বশির উল্লাহ।

এভাবে বিভিন্ন সময়ে আদালতের নির্দেশে সুপ্রিমকোর্টের বিভিন্ন সেকশনথেকে দায়ের করা জাল-জালিয়াতির প্রায় অর্ধশত মামলা বর্তমানে বিচারাধীন ও তদন্তাধীন। এর মধ্যে ফৌজদারি বিবিধ শাখা থেকে দায়ের করা বিচারাধীন ও তদন্তাধীন মামলা ২৪টি। এ ছাড়া রিট শাখা থেকে দায়ের করা বর্তমানে বিচারাধীন ও তদন্তাধীন এ ধরনের মামলার সংখ্যা ৯। ফৌজদারি আপিল শাখায় এ ধরনের মামলা আছে ২টি। অনেক সময় হাইকোর্ট এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়লে নিম্ন আদালতকেও ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিষয়টি দৃশ্যমান না হওয়ায় বারবারই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, কিছু কিছু আইনজীবী আছেন, তারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে তথ্য গোপন করে জামিন করান। তাদের ব্যাপারে আদালত যদি সিরিয়াস পদক্ষেপ না নেন, সনদ বাতিল বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেন, তা হলে ঘটনা কমবে না। তিনি আরও বলেন, অনেক সময় আদালত বার কাউন্সিলে পাঠায় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। কিন্তু বার কাউন্সিলের ট্রাইব্যুনাল যেহেতু বার কাউন্সিলের সদস্যদের দিয়ে গঠিত, তাই বিচারপ্রার্থীরা আইনজীবীদের যেমন বিচার চান, সে রকম বিচার হয় না। এ অবস্থায় হাইকোর্ট যদি মনে করেন কোনো উকিল অসৎ বা প্রতারণামূলক কাজ করেছেন, তা হলে কোর্টকেই তার সনদ বাতিলের বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে এটা আমার নিজস্ব অভিমত

সম্প্রতি এ ধরনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল ড. মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘জাল-জালিয়াতির ঘটনায় সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

এক সিন্ডিকেটের মূলহোতা মাদকসম্রাট আল-আমিন ওরফে নাইট কিলার আল আমিন গত বছর ১৮ নভেম্বরে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। আল আমিনসহ ৬ জন ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর ৫০ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিল। দেড় ডজন মামলার এই আসামিকে জালিয়াতির মাধ্যমে হাইকোর্ট থেকে জামিন করান তদবিরকারক জাহাঙ্গীর আলম। আসামি আল আমিনের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন আশুতোষ কুমার সানা। পরে বিচারিক আদালত থেকে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে।বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনা হলে ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর তার জামিন বাতিল করা হয়। পরে তদবিরকারক জাহাঙ্গীরের একাধিক জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে।

জানা যায়, জাহাঙ্গীর তিন আসামিকে আইনজীবী আশুতোষ কুমারের মাধ্যমে জামিন করিয়েছেন এবং তিনটিতেই তিনি জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা কাগজ সরবরাহ করেছেন। এ ঘটনা ধরা পড়ার পর হাইকোর্টের নথি পর্যালোচনায় ঢাকা বার সমিতির সদস্য বাগেরহাটের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট জেসমিন নাহার মনির সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে।পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট এ ঘটনায় তিন আসামির তদবিরকারক জাহাঙ্গীর আলম এবং ওকালতনামায় স্বাক্ষরকারী নারায়ণগঞ্জ সদরের উত্তর নাসিংপুরের নাজমাকে আসামি করে মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন। এ ছাড়া ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী প্রায় অর্ধডজন অভিযোগে অভিযুক্ত জেসমিন নাহার মনির ওই জালিয়াতিতে জড়িত থাকার তদন্ত করতে বলেন।

এরপর পুলিশ বাদি হয়ে মামলা করে গত ১৭ জানুয়ারি নাজমাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়। রিমান্ডে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২৩ জানুয়ারি জেসমিন নাহার মনিকে গ্রেপ্তার করে। এরই মধ্যে নাজমা এ ঘটনায় আইনজীবী জেসমিন জড়িত বলে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দেয়।

অন্যদিকে জাল-জালিয়াতির যেসব মামলা সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন থেকে দায়ের করা হচ্ছে, সেগুলোর তদারকি সঠিকভাবে না থাকায় মামলাগুলো এক ধরনের গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক মামলার তদন্ত শেষ করতেই বছরের পর বছর কেটে যায়। এ ছাড়া বিচার শুরু হলে সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করাসহ নানা সমস্যায় বিচার বিলম্বিত হয়। সেকশনের যেসব কর্মকর্তা বাদী হয়ে মামলা করেন, অনেক সময় আসামিপক্ষ তাদের ম্যানেজ করে কালক্ষেপণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। উচ্চ আদালতের কাছে জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ার পরও তার বিচার করতে এক যুগ পর্যন্তও অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে তথ্য রয়েছে। এ কারণে এসব মামলার সঠিক তদারকি দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র: আমাদের সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত