প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তিতে আদালতে ধীরগতি

ডেস্ক রিপোর্ট: বহুল আলোচিত রমনা বটমূলে বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতে রায় হয় ২০১৪ সালের ২৩ জুন। রায়ে শীর্ষ জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল আদালত। এরপর প্রায় চার বছর কেটে গেলেও হাই কোর্টে এই মামলার ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণ) শুনানি শুরু হয়নি। শুধু এ মামলায়ই নয়, এমন অনেক চাঞ্চল্যকর মামলার ডেথ রেফারেন্সই শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে হাই কোর্টে।

আইনজ্ঞরা বলেন, উচ্চ আদালতে অন্যান্য মামলার তুলনায় মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণ মামলা নিষ্পত্তিতে ধীরগতি রয়েছে। এ ধরনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য এখতিয়ারসম্পন্ন বেঞ্চের সংখ্যা বাড়ানোর তাগিদও দিয়েছেন তারা। অনেক আইনজীবী হাই কোর্টে এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তিতে ধীরগতির পেছনে শুনানির জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক বেঞ্চ না থাকা, দ্রুত পেপারবুক (মামলার নথি সম্বলিত বই) প্রস্তুত না হওয়া, অপরাধের ধরন পাল্টে যাওয়ায় বিচারিক আদালতে আগের চেয়েও বেশিসংখ্যক আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হওয়াকে কারণ বলে মনে করছেন। আর এসব বিষয়ে প্রধান বিচারপতিকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

জানা গেছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩১ ধারার (২) উপধারা অনুযায়ী জেলা ও দায়রা জজ এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারকরা আইন অনুযায়ী মামলা নিষ্পত্তি করে যে কোনো ধরনের দণ্ড দিতে পারেন। তবে শুধু মৃত্যুদণ্ড দিলে তা হাই কোর্টের অনুমোদন সাপেক্ষে কার্যকর করতে হয়। সে অনুযায়ী কোনো মামলায় বিচারিক আদালত থেকে আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলেই মামলার নথিপত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয় হাই কোর্টে। এটিই মূলত ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণ) মামলা হিসেবে পরিচিত। একটি মামলায় ৫০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিলে তাও একটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবেই হাই কোর্টে এন্ট্রি হয়।

সুপ্রিম কোর্টের ডেথ রেফারেন্স মামলার পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০১৫ সাল থেকে বিচারাধীন ডেথ রেফারেন্স মামলার সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০১৭ সালে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। অন্যদিকে কমতে থাকে নিষ্পত্তির হার। এর পেছনে দীর্ঘদিন হাই কোর্টে একটি বেঞ্চে বিডিআর হত্যা মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি করা, বেঞ্চের সংখ্যা কমে যাওয়াকে দায়ী করছেন আইনজীবীরা। জানা গেছে, এর আগে চারটি বেঞ্চ থেকে এ ধরনের মামলার শুনানি করা হলেও বর্তমানে তিনটি বেঞ্চে এ মামলার শুনানি হচ্ছে। এর ফলে ডেথ রেফারেন্স মামলার নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে। বর্তমানে ২০১১ সালে এন্ট্রি হওয়া ডেথরেফারেন্স মামলার শুনানি চলছে।

সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে এ ধরনের ডেথ রেফারেন্স মামলা হাই কোর্টে আসে ৭৬টি, ২০১১ সালে ৬৭, ২০১২ সালে ৬০, ২০১৩ সালে ৬৩, ২০১৪ সালে ৯২, ২০১৫ সালে ১১৪, ২০১৬ সালে ১৬১ এবং ২০১৭ সালে ১৭১টি। এভাবে ডেথ রেফারেন্স মামলার সংখ্যা হাই কোর্টে বাড়লেও নিষ্পত্তির পরিসংখ্যানের চিত্র ঠিক তার উল্টো। নিষ্পত্তি প্রায় অর্ধেক হারে কমে গেছে। ২০১০ সালে হাই কোর্টে মোট ডেথ রেফারেন্স মামলা দাঁড়ায় ৫৮৫টি। এর মধ্যে ওই বছর নিষ্পত্তি হয় মাত্র ৪৩টি। বছর শেষে বিচারাধীন থাকে ৫৪২টি। ২০১১ সালে এ মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০৯টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ৭৪টি। বছর শেষে বিচারাধীন থাকে ৫৩৫টি। ২০১২ সালে এ মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৯৫। ওই বছর নিষ্পত্তি হয় ১৪৫টি। বছর শেষে বিচারাধীন থাকে ৪৫০টি। ২০১৩ সালে এ মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৫১৩টি। নিষ্পত্তি হয় ১১১টি। বছর শেষে বিচারাধীন থাকে ৪৬টি। ২০১৪ সালে এ মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯৮টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ১৩৫টি। বছর শেষে বিচারাধীন থাকে ৩৬৩টি। ২০১৫ সালে এ মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭৭টি। নিষ্পত্তি হয় ৫৮টি। বছর শেষে বিচারাধীন থাকে ৪১৯টি। ২০১৬ সালে এ মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮০টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ৪৫টি। বিচারাধীন থাকে ৫৩৫টি। ২০১৭ সালে এ মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৭০৬টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ৬৫টি। বছর শেষে বিচারাধীন থাকে ৬৪১টি।

সুপ্রিম কোর্ট সূত্র আরও জানায়, বর্তমানে ২০১১ সালে রেকর্ড হওয়া ডেথ রেফারেন্স শুনানি হলেও আলোচিত অনেক মামলার ডেথ রেফারেন্সই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, বিডিআর বিদ্রোহ মামলা, সিলেটের সবজি বিক্রেতা শিশু শেখ সামিউল আলম রাজন হত্যা মামলা, খুলনার শিশু রাকিব হাওলাদার হত্যা মামলা। এ ছাড়া পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান দম্পতি হত্যা মামলায় ডেথ রেফারেন্সও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারিক আদালত থেকে ফাঁসির আদেশ হওয়ার পর শত শত আসামিকে বছরের পর বছর কারা প্রকোষ্ঠের কনডেমড সেলে বন্দী থাকতে হচ্ছে। মামলাজটের কারণে কনডেমড সেলে আসামির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দেড় হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন কনডেমড সেলে থাকায় অনেক আসামি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন বলেও জানা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে মামলার সংখ্যাও। সেই তুলনায় উচ্চ আদালতে বিচারক ও আদালতের সংখ্যা খুব একটা বাড়েনি।

তিনি বলেন, বর্তমানে বিচারিক আদালতে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হওয়ায় উচ্চ আদালতে চাপ বাড়ছে। উচ্চ আদালতেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক বেঞ্চ বাড়াতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, প্রধান বিচারপতি তো মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে আন্তরিক। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়কেই উদ্যোগ নিতে হবে। পেপারবুক তৈরি হওয়ার পর তা কোর্টে মেনশন করতে হবে তাদেরই। শুনানির জন্য লিস্টে আনাও তাদের দায়িত্ব।

এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, সামাজিক অপরাধ বেড়েছে। এখন চাঞ্চল্যকর মামলাগুলো দ্রুত বিচারে আসছে। আগেও এ রকম অপরাধ হতো, তবে বিচার হতো না। এখন তাড়াতাড়ি বিচার হচ্ছে। তিনি বলেন, সবাই তো দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি চায়। বিচারপতির সংখ্যা বৃদ্ধি সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তির জন্যও বেঞ্চ বাড়াবেন বলে আশা রাষ্ট্রের প্রধান এই আইন কর্মকর্তার। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত