প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘আমার আবেগ শানিয়ে রাখি শহীদ হবো বলে’

মঞ্জুরুল আলম পান্না : শহীদের রক্তমাখা রাজপথ মনে করে বিন¤্র শ্রদ্ধায় খালি পায়ে, ফুল হাতে অন্ধকার মাখা প্রভাত ফেরি। কন্ঠে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রয়ারি…’ শিহরণ জাগানিয়া সুর। কী এক তুমুল আবেগ জাগানিয়া ভালোবাসা, শ্রদ্ধা…! এই তুমুল ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা নিংড়ানো সংস্কৃতি কী উঠে যাচ্ছে দিন দিন? জুতা পায়ে প্রভাত ফেরি! একসময় কল্পনার বাইরে ছিল। এখন একুশের প্রথম প্রহরে কিংবা প্রভাত ফেরীতে জনে জনে চলেন জুতা পায়ে। কোথায় ভালবাসা, কোথায় শ্রদ্ধা, কোথায় আবেগ! জীবনের একটা মূল্যবান সময় কেটেছে আমার রাজপথে একজন সক্রিয় সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে।
খুলনায় যখন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের একটা দায়িত্বশীল পদে তখন সাংস্কৃতিক যোদ্ধাদেরও কেউ কেউ জুতা পায়ে অবলীলায় চলে আসতেন একুশের প্রথম প্রহরে কিংবা প্রভাত ফেরিতে। প্রতিবাদ করলে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলতেনÑ ‘জুতা পায়ে এলে কী হয়েছে? কী বলব? তাই তো, প্রভাত ফেরীতে না এলেও বা কী হয়েছে? শহীদ মিনারে ফুল না দিলেও বা কী হয়েছে?! কী দরকার লোক  দেখানো এসব সৌজন্যতার? জুতা পায়ে প্রভাত ফেরীতে কাউকে দেখলেই মনে হয় যেন শহীদের পবিত্র রক্তকে অপমান করছি, ঠিক যেমনটা জুতা পায়ে শহীদ বেদীতে ওঠার বিষয়টি।
রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে কে কার আগে বেদীতে ফুল দিতে পারবে এমন নোংরা প্রতিযোগিতায়ও আমরা বেশ কয়েক বছর দেখেছি জুতা পায়ে অবলীলায় নেতা-কর্মীদের শহিদ বেদীতে উঠে যাওয়ার চরম জঘন্য দৃশ্য।

বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন যে স্বাধীনতা, সেই মুক্তিসংগ্রামের বিস্ফোরণের শুরুটা ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমার প্রতিটি সংগ্রাম প্রতিটি আন্দোলন, অশুভ আর অসত্যের বিরুদ্ধে যে প্রতিটি প্রতিবাদ, তার সবখানেতে সাহস জোগায় আমার একুশ। সেই শহীদ দিবস আজ মায়ের মুখের ভাষার প্রতি পরম ভালোবাসায় আর সগৌরবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার মন্ত্রণা হয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে সারাবিশ্বে। এর মূল শক্তি তো শোকের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে।

অথচ সেই আমরা একুশের গুরুত্ব, ভাব গাম্ভীর্য ভুলে গিয়ে পুরো বিষয়টাকে উৎসব বানিয়ে ফেলছি। শুধুই কি জুতা পায়ে প্রভাত ফেরী? একুশ এখন পুঁজিওয়ালাদের ব্যবসার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো একুশের চেতনাকে পুঁজি করে বড় বড় বিজ্ঞাপন চিত্র নির্মাণ করে লুটে নেয় গরিবের টাকা। নামিদামি থেকে শুরু করে আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকাগুলোতে ‘একুশের সাজ’ শিরোনামে প্রকাশ হয় বিশেষ বিশেষ আয়োজন। সেখানে একুশের গয়না, একুশের শাড়ি, একুশের পাঞ্জাবি আরও কত কি বাহারি আয়োজনের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করা হয়!

কোনো কোনো পত্রিকায় একুশ উপলক্ষে বিশেষ খাবার দাবারের বর্ণনাও তুলে ধরা হয় নির্লজ্জভাবে। ছাপা হয় ‘একুশের কেক’এর ছবি। এখন ২১ ফেব্রুয়ারির দিনে সপরিবারে অনেককে দেখি বর্ণিল সাজে পার্কে, রেস্তোরায় ধুমধাম আয়োজনে। এ যেন আনন্দ-হাসি-ঠাট্টায় মেতে ওঠার একটা বিশেষ দিন। সেই মুহূর্তে শহীদ মিনারে ফুল হাতে আসা মানুষের উপচেপড়া ভিড়কে সত্যিই মনে হয় যেন কেবলই লৌকিকতা, হাত থেকে হাতে সেলফি তুলবার প্রতিযোগিতা।

পুঁজিবাদের ঢেউয়ে হারিয়ে যাচ্ছে আমার আবেগ, পুঁজিবাদের আছড়ে পড়া ¯্রােতে ক্ষত-বিক্ষত আমার চেতনা, পুঁজির জোয়ারে পথ ভুলে যায় আমার অস্তিত্ব। তবে শহীদের রক্তে ভেজা চেতনার মানুষের সংখ্যাও নিশ্চয় কম নয় এখনো। শেষ করব ২১ ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে শিল্পী অরিজিত দে’র গাওয়া একটা গানের শেষাংশের কয়েকটা লাইন দিয়ে।

‘আজ দুনিয়ায় সঠিক বেঠিক হাজার দাবির ভীড়ে/একুশ অতীত একুশ ধূসর একুশ হারায় ধীরে/বন্ধু এখন সময় এবার, শপথ নেবার পালা/একুশ ক্ষত টাটকা রেখো, জুড়িয়ে না যায় জ্বালা/একুশ যদি আবার আসে আবার তুফন তোলে/আমার আবেগ শানিয়ে রাখি শহীদ হবো বলে।’

লেখক : সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত