প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অমর একুশে ও চেতনার বীজ

মিঠুন মোস্তাফিজ : ‘একুশের চেতনা’ ও ‘বাংলার স্বাধীনতা’ শব্দ দু’টি একটির সাথে আরেকটি গভীর ভাবে সম্পর্কিত। একটি বাদ দিয়ে আরেকটি ভাবা যায় না। এমন ভাবনা সম্ভবও নয় । বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের ঊষালগ্নে পাক-ভারত উপমহাদেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চিয়তার ঝড় ওঠে তার প্রথম প্রতিফলন কৃষ্ণচূড়ায় ফুটে ওঠে ৫২’র ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। আর বাঙালির সেই প্রথম স্বাধিকার আন্দোলনের চেতনা পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার পাথেয় হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাঙালি জাতির একুশ, একুশের চেতনা আর ৭১’র মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য ও স্বাধীনতা সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের একটু অতীতের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। সালটা ১৯৪৭ ।

ব্রিটিশ-ভারত তার স্বাধীনতা লগ্নে তিনটি ভাগে বিভক্ত হলো। ১৯৪০ সালে গৃহীত লাহোর প্রস্তাবে সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছিলো। ‘কার্যত হলো তার উল্টো । নবাব, ওমরাহ্ ও ভূস্বামীদের নিয়ে গঠিত মুসলিম লীগের নেতারা ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের নামে পূর্ববাংলার প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা করলো। বিশ্বাসঘাতকতা করলো বাংলার মীরজাফর, খাজা নাজিমুদ্দিন, খাজা শাহাবুদ্দিন, নুরুল আমীন, হামিদুল হক চৌধুরী প্রমুখ মুসলিম লীগ নেতারা।

দুটি দেশ মাঝখানে স্থলপথে দু’হাজার মাইল ও জলপথে তিন হাজার মাইলের ব্যবধান। দুটি দেশ- তার ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, আচার-আচারণ, ঐতিহ্য আলাদা। ধ্যন-ধারণা, অর্থনীতি আলাদা। দুটি ভিন্নমুখী দেশ আর জাতিকে ধর্মের দোহাই দিয়ে একটি রাষ্ট্রে রাখা হলো। শুরু হলো পূর্ব বাংলার উপরে পশ্চিম পাকিস্তানের ধনকুবেরের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নির্যাতনের এক করুণ ইতিহাস। প্রথম হামলাটি হলো ভাষার উপর। সংখ্যাগুরু বাঙালির মুখের ভাষা বাংলাকে বিলুপ্ত করে মুষ্টিমেয় সংখ্যালঘুদের ভাষা উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রষা করার চক্রান্ত হলো। কিন্তু বাংলার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা, তরুণ-ছাত্র-শ্রমিকরা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো।

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানি শোষকদের কায়েমি ষড়যন্ত্রের ফলে বাঙালিদের দানা বাঁধা বহুদিনের ক্ষোভ। গোটা পাকিস্তানিবাসীর মধ্যে শতকরা ৫৬ জন অধিবাসীর মাতৃভাষা ছিল বাংলা। সুতরাং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি ছিলো তৎকালীন সাতকোটি বাঙালির প্রাণের দাবি, ন্যায দাবি। কিন্তু পশ্চিমী শাসক গোষ্ঠী বাঙালির এ প্রাণের দাবিকে উপেক্ষা করে। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা রূপে স্বীকৃতি দিয়ে তারা বাংলার প্রতি বৈষম্যমূলক আচারণ শুরু করে।

১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জনসভায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা বলে ঘোষণা করেন। এর তিনদিন পরে ২৪ মার্চ কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানেও তিনি এই কথার পুনরুল্লেখ করেন। তখন, সেই মুহূর্তে বাংলার জাগ্রত ছাত্র সমাজ এর প্রতিবাদ জানায়। বাংলার প্রাণে আঘাত, আগুন জ্বলে উঠে। সেই আগুন আর নেভেনি ।

১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় এক জনসভায় উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেন। আর সেটা হয় আগুনের শিখায় কেরোসিন ঢালার মতো। বাংলার অপমার জনসাধারণ নতুন করে জেগে ওঠে। প্রাণের ভাষাকে, মায়ের ভাষাকে রক্ষায় এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার দাবিতে পূর্ব বাংলার সচেতন ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী-জনতা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আন্দোলন, সংগ্রাম অব্যাহত রাখে। অবশেষে এলো উনিশ শো বাহান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি।

বাঙালির জাতীয় উন্মেষের প্রথম দিন। স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ। সেদিন পাকিস্তানি শোষক গোষ্ঠীর ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বাংলার ছাত্রসমাজ এগিয়ে যায় এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় এলে নিষ্ঠুর শাসক গোষ্ঠীর নির্দেশে পুলিশ মিছিলের উপর গুলি চালায়। ঝরে পড়ে কতগুলো তাজাপ্রাণ। বাংলার তরুণের বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার পিচ ঢালা কালো রাজপথ। নির্বাক হয়ে যায় প্রকৃতি। নিস্তব্ধতায় ছেয়ে যায় ঢাকাসহ সারা পূর্ববাংলা।

বাংলার দামাল ছেলেদের- প্রতিবাদী শ্লোগান মিলেমিশে একাকার সবুজ প্ল্যাকার্ডে রক্তিম অক্ষর জ্বলজ্বল। মাতৃভাষা বাংলা চাই। পোস্টার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড ও মানুষের ঢল আর শে¬াগান বইছে সমান তালে। নাড়ীর টানে, ভাষার টানে, মায়ের টানে। ফাল্গুণের হাওয়া হঠাৎ থমকে গেল ওকি! ও কিসের শব্দ চারদিকে কোলাহল, অন্ধকার বারুদের গন্ধ। বুলেট ছুঁড়ছে পাষাণেরা। থেমে থেমে আসছে আর্তচিৎকার আর তা ছাপিয়ে ‘আমার মায়ের ভাষা বাংলা চাই’। পশ্চিম কোণে হেলে পড়েছে সূয, আর তারি আভায় লালে লাল কৃষ্ণচূড়া। লালে লাল বাংলার রাজপথ। সেই রক্ত বৃথা যায়নি। বাংলার অকুতোভয় ছাত্ররা রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনলো বাংলাকে, বাংলার ভাষাকে, মায়ের ভাষাকে।

১৯৫২ থেকে ১৯৫৮ এই ছয়টি বছর ধরে পাকিস্তানের ইতিহাস হচ্ছে গুটিকয়েক ক্ষমতালিপ্সু, কায়েমি, স্বার্থবাদী, আমলা মুৎসুদ্ধি, সামন্তপ্রভু, ধনপতি, মদ্যপ বদ্ধোন্মাদ রাজনৈতিক স্বার্থশিকারির প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ইতিহাস। আর এই ইতিহাসের গুপ্ত পথ বেয়ে মঞ্চে অবতীর্ণ হলেন জেনারেল আইয়ুব খান। বাঙালির আশা- আকাঙ্খার বুকে পদাঘাত করে সারা দেশে সামরিক শাসন জারি করলেন তিনি। বাঙালির বাক-স্বাধীনতা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা, সভা-সমিতি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সমস্ত হরণ করে নিয়ে বাংলার মানুষকে অবাধ শোষণের পথ উন্মুক্ত করলেন জেনারেল আইয়ুব খান ও তার সামরিক জান্তা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সম্পাদনা : মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত