প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভোলার ব্র্যান্ড ভোলার মহিষের দধি

মতিনুজ্জামান মিটু : সাগর মোহনায় দিগন্ত জোড়া বিস্তীর্ন শতাধিক সবুজ চর আর মহিষের শত শত বাথান বাংলাদেশের সর্বদক্ষিনের একমাত্র দ্বীপজেলা ভোলার অনন্য বৈশিষ্ট। সম্প্রতি এই জেলার ব্র্যান্ড হিসাবে স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে মহিষের দধি। মহিষের কাঁচা দুধের দধি যা স্থানীয়ভাষায় মইষ্যা দই নামে পরিচিত। যা ভোলাকে পরিচিত করেছে ঐতিহ্যে আর সোনালী সম্ভাবনার নতুন দিগন্তে। এর সঙ্গে মিশে আছে হাজার মানুষের জীবন ও জীবিকা।

ভোলার চরফ্যাশান উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. হিরনময় বিশ্বাস বলেন, ভোলার ব্র্যান্ড হিসাবে স্বীকৃত পাওয়ায় মহিষ খামারীরা নতুন আশায় বুক বাধতে শুরু করেছে। গরুর দুধের চেয়ে পুষ্টিগুনে অনেক বেশী সমৃদ্ধ এই দুধ। গরুর দুধের ভিটামিন-‘এ’ ক্যারোটিন মানব দেহে ভিটামিন-এ তৈরী করে। আর মহিষের দুধে সরাসরি ভিটামিন ‘এ’ অবস্থায় থাকে। গরুর দুধে যেখানে ফ্যাটের পরিমান ৩.৫ ভাগ সেখানে মহিষের দুধে ফ্যাট থাকে ৭.৫ শতাংশ। ফ্যাট বেশী থাকলেও ক্ষতিকারক ফ্যাট (এল.ডি.এল) কম থাকে মহিষের দুধে। এই দুধ ওমেগা-৩ ও ওমেগা -৬ ফ্যাটি এসিড যা হৃদ রোগের ঝুঁকি কমায়। মহিষের দুধে বিদ্যমান চর্বিকনাসমূহ সহজে হজম হয় বিধায় সব বয়সের মানুষের জন্য খাবার উপযোগী। যারা গরুর দুধ হজম করতে পারেনা তাদের মহিষের দুধ সহজেই হজম হয়। এছাড়া মহিষের মাংসে চর্বিকনা কম থাকায় মোটা হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বিশ্বে মহিষের সংখ্যা ১৩ কোটির বেশী। যার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩ তম। বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে চৌদ্দ লক্ষ মহিষের মধ্যে ভোলা জেলায় রয়েছে- ৮০,২৩০ টি। ভোলা জেলায় মোট বাথানের সংখ্যা-৪৪৫টি, পেশাদার দুধ সংগ্রাহক রযেছে- ৩২৪ জন, মহিষ রাখালের সংখ্যা-৯৫১ জন, আর মহিষ পালনকারী পরিবারের সংখ্যা আছে -৬০৯২ টি এবং প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ১২,২৫০ জনের। এই জেলায় বর্তমানে মহিষের দৈনিক দুধ উৎপাদন হয় ২৭.৮৩ মেট্রিক টন এবং দৈনিক মহিষের মাংস উৎপাদন হয়১৭.৮২ মে.টন। উৎপাদিত দুধের প্রায় ২/৩ অংশ ব্যবহৃত হয় দধি উৎপাদনে এবং বাকী অংশ মিষ্টি তৈরী ও সরাসরি খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে ভোক্তারা।

বাঁশের তৈরী বিশেষ ধরনের চোঙ্গায় মহিষের দুধ দোহন করা হয়। তারপর সেই দুধ এনে ভর্তি করা হয় বড় বড় ভাড়ায়। বিভিন্ন বাথানে এই ভাবে সংগৃহীত দুধ বিচ্ছিন্ন চর থেকে ট্রলারে করে বিভিন্ন ঘাটে আনা হয়। যেখানে অপেক্ষা করে থাকে দুধ সংগ্রাহকরা, এখানেও চালু আছে দাদন ব্যবস্থা। মহিষের কাঁচা দুধের দধি প্রস্তুতে বিশেষত্ব হচ্ছে সরাসরি দুধ ছেঁকে বিশেষ ধরনের মাটির টালিতে ঢেলে ১৮-২৪ ঘন্টা রেখে দিলেই তৈরী হয়ে যায় এই দধি। কোন বীজ লাগেনা এই দধি তৈরী করতে। কিছু পারিবারিক মহিষ খামারীরা সড়াসড়ি খোলা বাজারেও মহিষের দুধ সাধারন ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করে থাকেন।

এখানে অনেক সমস্যার মধ্যে অন্যতম চারণভূমি হ্রাস পাওয়া, মৌসুম ভিত্তিক সুপেয় পানির সংকট, দূর্যোগের নিরাপদ আশ্রয় তথা মাটির কিল্লার অভাব। চারণভুমির পরিমান দিন দিন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ ১৯২৭ সালের বন আইন যা ১৯৯০ সালে সংশোধিত এবং ২০০০ সালে জারীকরা ইস্তেহারে ৬ নং ধারা অনুসারে জেগে ওঠা চরে, কিংবা খাস জমিতে বনবিভাগের একচেটিয়া রিজার্ভ ফরেষ্ট সৃষ্টি। যেখানে একসময় ছিল গরু মহিষের নিবিড় বিচরণক্ষেত্র। উপকুলবাসীকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস থেকে রক্ষা করতে যেমন বনভুমির প্রয়োজন রযেছে তেমনি জীব বৈচিত্র রক্ষা ও প্রাণিজ আমিষের ব্যাপক ঘাটতি মিটাতে গো-সম্পদ রক্ষার দরকারও কোন অংশে কম নয়। তাই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারনী মহলের সদয় বিবেচনার দাবীরাখে। এছাড়া মহিষের জাত অবোনমন তথা ইনব্রিডিং সমস্যা নিরসনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে ভর্তূকী মূল্যে উন্নত জাতের ষাড় মহিষ বিতরণ, কৃত্রিম প্রজনন, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত