প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নির্বাচনী বছরে ‘সতর্ক’ মুদ্রানীতি

ডেস্ক রিপোর্ট : নির্বাচনী বছর হিসেবে সুদহার, মূল্যস্ফীতি ও আমদানির চাপ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসবসহ আরো নানা কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘সতর্ক’ মুদ্রানীতি ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সূত্র জানায়, আগামী সপ্তাহে নতুন এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। ওইদিন ২০১৭-১৮ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য সংকোচনমূলক বা সতর্কতামূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণের লাগাম টানার উদ্যোগ নেয়ায় ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, নির্বাচনী বছরে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হলে তাতে সুদহার ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এমন মতামত তুলে ধরেছে এবিবি। চিঠিতে এবিবি বলেছে, ঋণের হার কমানো হলে চলতি মূলধন, সাধারণ ঋণ বিতরণ, আমদানি বিল ও বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন অব্যাহত রাখা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের পাশাপাশি করপোরেট উদ্যোক্তারা তহবিল সংকটে পড়বে। তাই নির্বাচনী বছরে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা ব্যাংকগুলোর জন্য কঠিন হবে বলে মনে করছে এবিবি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে অব্যাহতভাবে বাড়ছে ঋণ বিতরণ। বর্তমানে এই খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৯ শতাংশেরও বেশি। আবার চাল, পিয়াজসহ জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির হারও বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেয়া লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, আগামী জুন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি থাকার কথা ৫.৮ শতাংশের নিচে। কিন্তু এরইমধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার অসহনীয় মাত্রায় রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ডিসেম্বর মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫.৮৩ শতাংশ; যা নভেম্বরে ছিল ৫.৮৩ ভাগ। এ মাসে খাদ্যে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৭.১৩ শতাংশ; যা নভেম্বরেও ছিল ৭.০৯ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কারণে সীমিত আয়ের মানুষদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। বিশেষ করে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ায় ব্যবসায়ীরা তাদের দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। তাই নতুন মুদ্রানীতিতে মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। এছাড়া চলতি বছরেই জাতীয় নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে এমনিতেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকবে। এ?র ফলে সাধারণ মানুষের কষ্ট আরো বাড়তে পারে। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের কথা বিশেষভাবে বিবেচনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রসঙ্গত, আগের মুদ্রানীতিতে চলতি ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৬.২ শতাংশ। আর আগামী জুন পর্যন্ত এই খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৬.৩ শতাংশ। কিন্তু নভেম্বরেই বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ১৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নির্বাচনী বছরে দেশে টাকার প্রবাহ আরো বাড়তে পারে। আবার শেষ ছয় মাসে সরকারের খরচও বাড়বে। এতে ব্যাংক থেকে সরকারও বেশি ঋণ নেবে। এ কারণে আসন্ন মুদ্রানীতির ধরন ‘সংযত’ হওয়া জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯.০৬ শতাংশ। অক্টোবরে ১৮.৬৩, সেপ্টেম্বরে ১৯.৪০, আগস্টে ১৯.৮৪ এবং জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৬.৯৪ শতাংশ। জুনে ঋণ বৃদ্ধির হার ছিল ১৫.৬৬ শতাংশ। গত ৫ মাস ধরে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ৭ শতাংশের উপরে রয়েছে। আবার রেমিট্যান্স প্রবাহে কাঙ্ক্ষিত গতি না আসা এবং আমদানি ব্যয়ের অনুপাতে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি না পাওয়ায় বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

এদিকে, যে সব ব্যাংক আগ্রাসীভাবে ঋণ বিতরণ করছে, তাদের ঋণ বিতরণে সতর্ক হওয়ার জন্য ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একক গ্রাহকসীমা অতিক্রম করা ১৬ ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর কাছে চিঠিও পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠিতে তাদের আগামী ৩০শে জুনের মধ্যে স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসতে বলা হয়েছে। এর আগে গত ৩রা জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায়ও আগ্রাসীভাবে ঋণ বিতরণ না করার জন্য ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। গত ৩রা জানুয়ারি ব্যাংকার্স সভা শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেছিলেন, ঋণ বিতরণ প্রবৃদ্ধি ১৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এতে তারল্য সংকট হতে পারে। এ জন্য ঋণসীমা কমানো হতে পারে। নতুন মুদ্রানীতিতে এ বিষয়ে নির্দেশনা থাকবে।

এদিকে রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে রাজধানীর বিআইবিএম অডিটরিয়ামে একক বক্তব্যে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) সাবেক গভর্নর ড. চক্রবর্তী রঙ্গরাজন বলেন, মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি একমুখী হওয়া উচিত। যদি একমুখী না হয় তখন তা অর্থনীতির জন্য একটা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, অর্থনীতিকে সূচারুরূপে কার্যকর রাখার জন্য সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে গভীর সংলাপ ও সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছর ২ বার মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও প্রকাশ করে থাকে। একটি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই মাসে এবং অন্যটি জানুয়ারি মাসে। সাধারণত মুদ্রার গতিবিধি প্রক্ষেপণ করে এই মুদ্রানীতি। মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত