প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নেতাদের শেল্টারেই বালু দস্যুতা

ডেস্ক রিপোর্ট : উত্তরের গেটওয়ে বগুড়ায় এখন চলছে বালু হরিলুট। আর এই বালু হরিলুটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন রাজনৈতিক নেতারাও। আর এতে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে খোদ বগুড়া জেলা শহর। জেলা, উপজেলা, থানা পুলিশের নাকের ডগায় দিনদুপুরে অবৈধ এই বালু উত্তোলন হলেও দেখে না দেখার ভান করে সবাই। অবৈধ বালু উত্তোলনে স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ স্মৃতিচিহ্ন একটি বধ্যভূমি হারিয়ে গেছে। বগুড়া জেলা শহরের পাশের এই বধ্যভূমিটি এখন শুধুই জলাধার। শুধু তাই নয়, বালুদস্যুতায় মানচিত্র থেকে বিলীন হয়েছে রাজাপুর, নগর, ফুলবাড়ী, ডাকুরচকসহ কয়েকটি গ্রামও। আর এই অবৈধ বালু উত্তোলনে নেপথ্যে শেল্টার দিচ্ছেন রাজনৈতিক নেতারা।

এখানে আওয়ামী লীগ বিএনপি মিলেমিশে বালুদস্যুতায় লিপ্ত রয়েছে। তবে দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিকভাবে একটি মোটা অঙ্ক যাচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতাদের পকেটে। যাচ্ছে পুলিশ, উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের পকেটেও। এখানেই শেষ নয়, এই বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ঘটছে হত্যাসহ নানা অপরাধের ঘটনা। আর অবৈধ এই বালু উত্তোলন করে অনেকেই এখন লাখো কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। অল্প টাকা পুঁজি ও দলীয় শেল্টার নিয়ে খুব সহজেই বালুর ব্যবসা করা যায়। আর এসব কারণে দিন দিন অবৈধ এই বালু উত্তোলনের সিন্ডিকেটের দল বড় হচ্ছে। বালু উত্তোলনকারী সিন্ডিকেট রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ প্রশাসনের শেল্টার পেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আর এই বালু ব্যবসায়ীদের লক্কড়-ঝক্কড় ট্রাক-পিকআপ গাড়ি যত্রতত্র চলাচলে নিয়মিতই ঘটাচ্ছে মারাত্মক সব দুর্ঘটনা। এর মধ্যে গত কয়েক বছরে বালুর ট্রাকের চাপায় অন্তত ১৩-১৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসী জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, থানা পুলিশসহ বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ দিয়ে কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। অবৈধ এই বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহসও এখন হারিয়ে ফেলেছে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ। এ ঘটনায় রাজাপুর গ্রামের রুবেল ইসলাম হাই কোর্টে একটি রিট করেছেন।

তবে বগুড়া সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এমদাদ হোসেন বলেন, বালু উত্তোলন থেকে টাকা পুলিশ নেয় এমন ঘটনা আমার জানা নেই। আমরা গত মাসেও মোবাইল কোর্ট করে কয়েকটি মেশিন পুড়িয়ে দিয়েছি। আমাদের কাছে ভুক্তভোগীরা ফোন দিলেই অভিযানে যাই। বালু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমাদের কোনো সখ্যতা নেই। এ পর্যন্ত বগুড়া সদর থানায় অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের নামে ২টি মামলাও রুজু হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বগুড়া জেলা শহরের আশপাশে সরকারি বালু মহাল না থাকলেও জেলাতে মাত্র ৬টি বালু মহালের অনুমোদন রয়েছে। শহরের মানিকচক বাজার, রাজাপুর, কাচারির মোড়, শাখারিয়া, শাখারিয়া জঙ্গলপাড়া, নামাবালা, ফুলবাড়ি, বটতলা, রায়পুর, বাঘোপাড়া, বালাপাড়া, মোকামতলা, কৈগাড়ি, নওদাপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় নদী থেকে চলছে এসব অবৈধ বালু উত্তোলন। নদী তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন এবং চাষের জমিতে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও আবার জমি ধসে গেছে। ধসেপড়া জমির সঙ্গে অন্যান্য চাষাবাদকৃত জমিও ধসেপড়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। বালুদস্যুরা প্রথমে নদীতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন শ্যালো ইঞ্জিনচালিত মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করে। পরে ধীরে ধীরে মেশিনগুলো পানির নিচ দিয়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির দিকে দেয়।

এভাবে ভূমির নিচ থেকে বালু তোলে। এতে একসময় ওই জমির উপরিভাগের মাটি ধসে পড়ে। আর এভাবে একে একে গ্রামের পর গ্রাম বালুদস্যুতায় বিলীন হচ্ছে। এমনকি ক্ষতিগ্রস্তরা জমি বিক্রির প্রস্তাব দিলে বালুদস্যুরা হেসে হেসে বলে কিনে কী লাভ, এমনিতেই পাচ্ছি। আর এসব এলাকায় আলাদা আলাদা বালু সিন্ডিকেট রয়েছে। এদের মধ্যে ফুলবাড়ী এলাকায় হাসান ও আবুল হোসেন দুই ভাই, মোর্শেদ ও মাইদুল দুই ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন সিন্ডিকেট। রাজাপুর এলাকায় ১৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন নিয়ন্ত্রণ করছেন পুরো রাজাপুর গ্রাম। থানা পুলিশের তালিকাভুক্ত কয়েকটি হত্যা মামলার আসামি যুবলীগ নেতা উজ্জল হোসেন পাখির নিয়ন্ত্রণে ডাকুরচক এলাকা।

এ ছাড়া আইনুল, আবু হাসান, আবু হোসেন, রবিউল, জেলহক, মুরাদ, তারিক, শহীদ, রাশেদ, রাইজুল, হেলাল, জাকির, কামাল, মিলি, জিতু, মজিদসহ অর্ধশতাধিক বালু ব্যবসায়ী রয়েছেন। এদের একেকটি দলের সঙ্গে রয়েছে অন্তত দুই শতাধিক সদস্যের বাহিনী। এদের মধ্যে হাসান ও আবুল হোসেন ৯-১০ বছর আগে রাজাপুর এলাকায় শ্যালো মেশিন দিয়ে অন্যের জমিতে রাত জেগে সেচের পানি দিয়ে যা আয় হতো তা দিয়ে সংসার চালাতেন। আর এখন এদের রয়েছে ৫-৬টি ট্রাক ও ২০-২৫টি বালু উত্তোলনের শ্যালো মেশিন। এমনকি ওই এলাকায় দৃষ্টিনন্দন দুটি পাকা বাড়িও বানিয়েছেন তারা। এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের এক প্রবীণ নেতা বলেন, এদের কিছুই বলতে পারছি না। কারণ এদের কাছ থেকে আমাদের দলের বহু নেতা মাসোয়ারা নেয়।

তবে শুধু যে আওয়ামী লীগ তা নয়, বালুর সঙ্গে বিএনপির অনেক নেতারাও জড়িত রয়েছেন। বালু ব্যবসায়ী উজ্জল হোসেন পাখি বালু উত্তোলনের কথা স্বীকার করে বলেন, সরকারি অনুমোদন আছে কিনা সেটা দেখার সময় নেই। বালু তুলছি, বিক্রি করছি। এটাই জানি আমি। ক্ষতিগ্রস্ত অ্যাডভোকেট মো. রুবেল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বালু উত্তোলনে বাধা দিতে গিয়ে আমার জ্যাঠাতো ভাই দিপু খুন হয়। দিপুর খুনের বিচার আজও পাইনি। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত আমারই অন্তত ১৫ বিঘা জমি বালুদস্যুতায় বিলীন হয়েছে।

শুধু তাই নয়, অবৈধ এই বালু উত্তোলনে স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি ফুলবাড়ী বধ্যভূমি এখন নিশ্চিহ্ন। অবৈধ এই বালু উত্তোলনে ভূমি ধসে গিয়ে শহীদদের বধ্যভূমিটি এখন জলাধারে পরিণত হয়েছে। শহীদ পরিবারের সদস্যরা বলছেন জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের চোখের সামনেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে শহীদদের শেষ স্মৃতিটুকু নিশ্চিহ্ন করলেও কাজের কাজ করছে না কেউই। বগুড়ার যুদ্ধকালীন কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন মোফা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জীবনবাজি রেখে ৯ মাস যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। কিন্তু আজ স্বাধীন দেশে শহীদদের একটু চিহ্ন প্রভাবশালী বালুদস্যুরা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে। বহুবার প্রশাসনকে বলেও কোনো কাজ হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামান বলেন, বালুদস্যুরা এতটাই প্রভাবশালী তাদের এহেন অবৈধ কাজের কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মানিকচক বাজারের দক্ষিণে করতোয়া নদীর পাড় এলাকায় চলছে বালু উত্তোলনের মহোৎসব। শুধু এক মানিকচক এলাকায়ই অন্তত ৬০টিরও বেশি শ্যালো মেশিন রয়েছে। এ সময় এক ট্রাকচালক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানান, আনোয়ার, সোহেল, পাখি, আল আমিন, রাসেল, রাজু, হাসান মেম্বার, আছলামসহ অন্তত ২০-২৫ জনের একটি সিন্ডিকেট এই অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত। আর এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী পাখি মিয়া। বগুড়া পুলিশের সদর থানা সার্কেল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, মাঝে-মধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু শ্যালো ইঞ্জিন জব্দ করে পুড়িয়ে দেই। তারপরও আবার নতুন মেশিন নিয়ে বালু উত্তোলন শুরু করে। বগুড়া জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিতই ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলছে। বাংলাদেশ প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত