প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তিন কারণে ঝুঁকিতে বাঘ

ডেস্ক রিপোর্ট : তিন কারণে সুন্দরবনের অহংকার রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা বাঘের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। এজন্য দায়ী করা হচ্ছে চোরা শিকারি-জলবায়ু ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবকে।

বাঘের চামড়া পাচার ও উচ্চমূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে চোরা শিকারিরা নির্বিচারে একের পর এক সুন্দরবনের বাঘ মেরে ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের বৈরী পরিবেশ বাঘের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। সর্বোপরি সরকারের উদাসীনতায় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে না। বন্যসম্পদ রক্ষা করার অঙ্গীকার মেনে নিশ্চিত করা হচ্ছে না বাঘের নিরাপদ ও উপযুক্ত আবাসস্থল। এসব কারণে গত ১৫ বছরে সুন্দরবনে ৮০ শতাংশ বাঘ কমেছে। বাঘ কমে যাওয়া এতটাই উদ্বেগজনক যে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশে বাঘ বিলুপ্ত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। পরিবেশবিদ, প্রাণিবিজ্ঞানী, বন বিভাগ ও বাঘ গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বর্তমান সরকার বন বিভাগের মাধ্যমে টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান (২০০৯-২০১৭) অনুসরণ করে বাঘ রক্ষায় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এ ছাড়া ২০১৫ সাল থেকে ১২ মিলিয়ন ডলারের চার বছর মেয়াদি ‘বাঘ প্রজেক্টের’ কাজ শুরু করেছে। এ প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে বাঘ রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণে ২০০০ সালে ‘টাইগার প্রজেক্ট সুন্দরবন’ প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘বাঘ সংরক্ষণে সরকারের পাশাপাশি আমাদেরও ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে। ইতিমধ্যে এ লক্ষ্যে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া সবচেয়ে জরুরি হিসেবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ বিশেষজ্ঞ মনিরুল এইচ খান বলেন, ‘বাঘ সুরক্ষায় চাই নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশ। পাশাপাশি জনগণের সম্পৃক্ততা জরুরি। ’ দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক জাহেদুল কবির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বাঘ আমাদের জাতীয় প্রাণী ও বীরত্বের প্রতীক। বাঘ সুরক্ষায় ২০১৮ সাল থেকে ১০ বছরের জন্য “বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান” নামে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
বাঘের হুমকি ও চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি বাঘ রক্ষার নানা পদক্ষেপ এই কর্মপরিকল্পনায় থাকবে। আশা করছি তখন পরিস্থিতির বদল হবে। ’ বন বিভাগ জানায়, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বনভূমি রয়েছে। কিন্তু বাঘ রয়েছে মাত্র ১৩টি দেশে। বাঘসমৃদ্ধ দেশকে টাইগার রেঞ্জ কান্ট্রি (টিআরসি) বলা হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। অথচ আমাদের দেশে বাঘ বসবাস করছে সবচেয়ে অবহেলা আর অনিশ্চয়তায়। বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের অন্য যেসব দেশে বাঘ রয়েছে সেগুলো হচ্ছে : ভারত, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম ও রাশিয়া। সুন্দরবন একাডেমির উপদেষ্টা রফিকুল ইসলাম খোকন দাবি করেছেন, ২০০১ সালে সুন্দরবনে বাঘের অস্তিত্ব ছিল ৪৪০টি, ২০১৬ সালে সে সংখ্যা নেমে দাঁড়ায় ১০৬-এ। এ সংখ্যা বর্তমানে ‘ডাবল ডিজিটে’ রূপ নিয়েছে। অর্থাৎ ১০০-এর নিচে নেমে গেছে। যদিও সর্বশেষ জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে ২০১৫ সালে বন বিভাগ থেকে জানানো হয়, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা মাত্র ১০৬। ২০০৪ সালে বন বিভাগের জরিপে পায়ের ‘ছাপ’ গণনা করে বলা হয়, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৪৪০। এর মধ্যে পুরুষ ১২১, বাঘিনী ২৯৮ ও বাচ্চা ২১টি। বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে প্রাণী ও বাঘ বিশেষজ্ঞরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে একদিকে বন ধ্বংস হচ্ছে। অন্যদিকে ধ্বংস হওয়া এলাকায় নতুন বসতি গড়ে উঠছে। এতে বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। আর এ কারণে বাঘের স্বাভাবিক চলাচলের স্থান ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। আবার বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সাইক্লোন, লবণাক্ত পানির প্রবেশ প্রভৃতি কারণে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব ঘটনার পেছনেও দায়ী হিসেবে বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন জলবায়ু পরিবর্তনকেই। সুন্দরবনের বাঘ কমে যাওয়ার আরেকটি অন্যতম কারণ শিকারিদের দৌরাত্ম্য। আন্তর্জাতিক বাজারে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চামড়ার চড়া মূল্য থাকায় এখন বাঘ শিকারি ও পাচারকারীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে সুন্দরবনের বাঘ। শিকারিরা জেলে সেজে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে বনে যায়। এরপর খাদ্যে বিষ মিশিয়ে, ফাঁদ পেতে এমনকি বন্দুক দিয়ে গুলি করে বাঘ হত্যা করছে। হত্যার পর স্থানীয় পদ্ধতিতে বাঘের চামড়া সংরক্ষণ করে। পরে তা পাচারকারী চক্রের সাহায্যে বিদেশে পাচার করে। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বশির আল মামুন জানান, বন বিভাগের তথ্যমতে এ অঞ্চলে ছয়টি শিকারি দল বাঘ হত্যায় তৎপর রয়েছে। ১৯৮০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চোরা শিকারি ও বনদস্যুদের হামলা, গ্রামবাসীর পিটুনি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে সুন্দরবনের ৭০টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। বাঘ বিলুপ্তির ‘তৃতীয়’ কারণ হিসেবে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবকে সবচেয়ে বেশি দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বাঘ রক্ষায় সরকার ইতিমধ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন সংশোধন করেছে। এতে বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি ১২ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। বন্যপ্রাণীর আক্রমণে মানুষ নিহত হলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে জনপ্রতি এক লাখ টাকা এবং আহত হলে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু এ আইন বাস্তবায়নে যথেষ্ট অনিয়ম রয়েছে বলে ব্যাপক অভিযোগ আছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবুর্গ শহরে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব বাঘ সম্মেলনে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

সূত্র : আমাদের সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত