প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যেভাবে গাজা ছেড়েছিল ইসরায়েলী সৈন্যরা

রাশিদ রিয়াজ : ৪০ বছর ধরে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের গাজা ভূখ- দখল করে রাখার পর ২০০৫ সালে দেশটি সেখান থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। বিবিসির সাংবাদিক মাইক ল্যানচিনের প্রতিবেদন থেকে উঠে এসেছে সেই ইতিবৃত্ত। ‘ইতিহাসের অন্তরালে’ এ প্রতিবেদনটি পরিবেশন করেন মিজানুর রহমান খান।

সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছিল, সিনাগগ থেকে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের জোর করে সরিয়ে নিচ্ছে। সরকার আদেশ দিয়েছিল গাজ ভূখ- থেকে তাদের চলে আসার জন্যে। কিন্তু সরকারের নির্দেশ উপেক্ষা করেই তারা সেখানে অবস্থান করছিল। গাজা থেকে ইসরায়েলের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। সিনাগগ থেকে ইহুদিদের সরিয়ে নিতে পারলেই এই কাজটি শেষ হয়ে যাবে। কয়েক দশক ধরে গাজায় ইহুদিদের এসব বসতি গড়ে তোলা হয়। এসব ঘটনা নিজের চোখে দেখেছেন গাজার এই নারী মাইসুন বাসির। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর।

মাইসুন বাসির বলেন, ইহুদি বসতিতে আশ্রয় নেয়া লোকেরা ভেঙ্গে পড়েছিলেন। তারা খুব রেগেও গিয়েছিলেন। কারণ তারা চাইছিলেন না গাজা ছেড়ে চলে যেতে। তারা যখন চিৎকার করে বলছিল, না আমরা যেতে চাই না, সেসব আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম। ইসরায়েলি পুলিশ ও সৈন্যদের সাথে বসতি স্থাপনকারী ইহুদিদের কয়েক সপ্তাহ ধরে সংঘর্ষ হল। অনেক ইসরায়েলির কাছেই এটা ছিল লজ্জা ও ক্ষোভের কারণ। তবে এর মধ্যে দিয়েই শেষ হল গাজায় ৩৮ বছর ধরে চলা ইসরায়েলি শাসনের। আর মাইসুন বাসিরের জন্যে ওই মুহূর্তটি ছিল শুধুই উদযাপনের।

মাইসুন বলেন, আমি খুব খুশী, কারণটা খুব সাধারণ, এটা আমার দেশ এবং আপনাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে। এবং তারা সেটাই করেছে।

১৯৬৭ সালের অক্টোবর মাসে মিসর, জর্ডান ও সিরিয়ার সাথে ৬ দিনের যুদ্ধ শেষে ইসরায়েল এই গাজা ভূখ-টি দখল করে নেয়। এর আকার ছিল দৈর্ঘ্যে ৪০ আর প্রস্থে ১০ কিলোমিটার। তারপর তারা সেখানে নিজেদের লোকজনকে নিয়ে যেতে থাকেন। গাজায় এবং নতুন করে দখল করে নেওয়া জর্ডান নদীর পশ্চীম তীরেও। তার ইসরায়েল তিন দশক ধরে বহু জনঅধ্যুষিত এই গাজায় হাজার হাজার ইহুদি বাড়ি ঘর গড়ে তুলতে শুরু করে। এরকমই একটি ইহুদি বসতি কাফার দারু। মাইসুন বাসিররা যে ভবনে থাকতেন তার সামনেই এ বসতি তৈরি করা হয়।

মাইসুন জানান, আমার মনে আছে আমি আমার রুমের জানালা খুলে একদিন ওই বসতিতে কিছু সৈন্যকে দেখতে পেলাম। তখন বাবার কাছে জানতে চাইলাম, এখানে কারা থাকতে এসেছে। বাবা বললেন এরা ইহুদি লোকজন।

মাইসুনদের বাড়ির সামনে রাস্তার ওপারেই ছিল এই বসতি। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে সে বড় হয়েছে।ওই বসতিতে যে সব ইহুদি ছিল, তাদের কারো কারো বয়স কম ছিল, তাদের কেউ কেউ খুবই সুপরিকল্পিত একটি এলাকায় বসবাস করত। সেখানে স্কুল ছিল, সিনাগগ ছিল, ছিল দোকানপাট। আর ইসরায়েলি সৈন্যরা তাদের পাহারা দিত। মাইসুনের পরিবার গাজার এই এলাকায় কয়েক দশক ধরে বসবাস করে আসছে। তারা টমেটো আর খেজুর চাষ করত। তার বাবা ছিল ইংরেজির শিক্ষক এবং স্থানীয় একটি স্কুলের হেডমাস্টার।

মাইসুন বলেন, আমার মনে আছে ছুটির সময় বাবাকে নিয়ে আমরা সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে যেতাম। দাদাকে নিয়ে যেতাম আমাদের বাগানে। সেখানে গ্রিন হাউজের ভেতরে টমোটোর চাষ হত। আমার খালা, ফুফু আর বন্ধুরা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। সবকিছু খুবই স্বাভাবিক, আর নিজেকে সাধারণ এক মানুষ বলেই মনে হত। তবে মাইসুন ও তার পরিবারের জন্যে পরিস্থিতি আর স্বাভাবিক থাকেনি। কারণ এইসব বসতির ওপর জঙ্গি হামলার তখন ক্রমশঃই বাড়তে লাগল। ২০০০ সালে গাজায় এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রচুর সহিংসতার ঘটনা ঘটে।

ইসরায়েলের বিরোধী নেতা আরিয়াল শ্যারন জেরুজালেম সফরে গেলে দ্বিতীয় ইনতিফাদা বা গণঅভ্যুত্থানের শুরু হয়। মিঃ শ্যারন গিয়েছিলেন পবিত্র হারাম শরিফ বা টেম্পল মাউন্টে। এই সহিংসতা ছিল ফিলিস্তিনিদের হতাশারই প্রকাশ। মাইসুন যখন খুব কাছে গুলির শব্দ শুনলেন তখন তিনি তার বাড়িতেই ছিলেন।

মাইসুন বলেন, তখন মনে হয়েছিল তারা আমাদের মেরে ফেলবে। আমি এঘরটাতে ছিলাম। বাবা স্কুলে ছিল। মা তখন আমার ভাইবোন সকলকে এ ঘরে চলে আসতে বললেন। কারণ এটাই ছিল সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।

পরের দিন আরো ইসরায়েলি সৈন্য এসে পৌঁছাল। তারা বলল, এসব বাড়ি ঘর দখল করে নিতে তাদের আদেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ এই এলাকায় এটিই ছিল সবচেয়ে উঁচু ভবন। তাই কৌশলগত কারণে তারা এই বাড়িটি দখল নিতে চায়।

মাইসুন জানান, আমাদের সবাইকে তারা একটি ঘরে ঢুকিয়ে দিল, বাকি সব কয়টি ঘরে সৈন্যরা অবস্থান নিল। তখন তারা বাবাকে বলল, এটি এখন সামরিক এলাকা। আপনাকে এটা বুঝতে হবে কাউকে আপনার বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হবে না, এবং আপনি বাড়ির বাকি ঘরগুলো ব্যবহার করতে পারবেন না। তারপর থেকে সৈন্যরা এখানে সেখানে ঘুমাতে লাগল। মনে হচ্ছিল এটা আর আমাদের বাড়ি নয়।

মাইসুনের পরিবারের বন্ধু বান্ধব ও আত্মীয় স্বজনরা সেখান থেকে চলে যাবার অনুরোধ করেছিল। মাইসুন জানান, আমার বাবা বললেন এটা তার বাড়ি, দাদার বাড়ি, মরতে হলে তিনি এখানেই মরবেন। তার পরের ৫ বছর ইসরায়েলি সৈন্যরা ওই ভবনের উপরের কয়েকটি তলা দখল করে রাখে। এটিকে তারা ব্যবহার করছিল আশে পাশে কি ঘটছে সেটি দেখার একটি পোস্ট হিসেবে। এসময় মাইসুন ও তার মা, বাবা, ভাইবোনদের নীচতলার কয়েকটি ঘরে একরকম বন্দী করে রাখা হয়। বাড়ির লোকজনদের দিনের বেলা বাইরে যেতে দেওয়া হলেও, রাতে ভবনের বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। এছাড়াও বাড়িতে কারা আসা যাওয়া করতে পারবে তার ওপর ইসরায়েলি সৈন্যদের কড়া নিয়ন্ত্রণ ছিল।

মাইসুন বলেন, প্রায়ই সবরাতেই আমি স্বপ্ন দেখতাম যে সৈন্যরা আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তারপর আমি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারব,স্কুলে যেতে পারব। পারব যেখানে ইচ্ছা সেখানে যেতে।

তবে ইসরায়েলের জন্যে গাজা দখল করে রাখা খুব কঠিন হয়ে উঠল। ফিলিস্তিনি জঙ্গিরা তখন ইসরায়েলের ভিতরে ঢুকে হামলা চালাতে শুরু করল। অনেক হামলার পরিকল্পনা হত গাজায়। জবাবে ইসরায়েল যে সামরিক অভিযান চালাত তাতে অধিগ্রহণকারী ইসরায়েলের প্রতি গাজাবাসিদের ঘৃণা বাড়তেই লাগল। এসময় প্রধানমন্ত্রী আরিয়াল শ্যারন গাজা থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা করলেন। ঘোষণা করলেন ফিলিস্তিন থেকে ইসরায়েলকে আলাদা করতে প্রাচীর তৈরি করতেও। তার উদ্দেশ্য ছিল জঙ্গি হামলা ঠেকানো।

২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে অবশিষ্ট ৩ হাজার ইসরায়েলি সৈন্য ও ৮ হাজারের মত ইসরায়েলি ইহুদিকেও ফিরিয়ে নেওয়া হল। চলে যাওয়ার সময় তারা ধংস করে দিয়ে গেল তাদের বাড়ি ঘর, স্কুল এবং সিনাগগ। বহু বছর পর ওই এলাকাটি দেখতে গিয়েছিলেন মাইসুন বাসির। তিনি জানান, সবকিছু আমূল বদলে গেছে। ইহুদি বসতির কোনো চিহ্নই সেখানে নেই। এক দশকের বেশিসময় পর মাইসুনকে নিয়ে যাওয়া হয় ওই ভবনটির ছাদে, ইসরায়েলি সৈন্যরা যেটিকে চৌকি হিসেবে ব্যবহার করত।
এতবছর পর এটা আসলেই বোঝা কঠিন যে মাইসুন ও তার পরিবারের মত গাজাবাসিরা কি ধরনের উত্তেজন্,া আশঙ্কা, ভীতি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করতেন। চারপাশে শুধু ধ্বংসযজ্ঞ। ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে সবকিছুই মাটিতে মিশে গেছে। গাজা এখন বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় আলাদা। এর সীমান্ত, আকাশ ও জলসীমা ইসরায়েল ও মিসর নিয়ন্ত্রণ করে। ইসরায়েলের ওপর হামাসের হামলার হুমকি এখনো রয়েছে।

মাইসুন বলেন, আমি সবকিছু ইতিবাচক চোখেই দেখতাম, বাবা আমাকে তাই বলেছিলেন। কিন্তু আপনাকে বাস্তবতাও তো দেখতে হবে। এখন বাস্তবতা খুবই কঠিন। আমি আশা করি ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনি ও ইহুদিরা একসাথে বসবাস করবে। সব ঠিক আছে কিন্তু তার আগে আমাকে আমার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।

মাইসুন বাসিরের বয়স এখন ২৫। তিনি চান বিদেশে গিয়ে লেখাপড়া করতে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ