ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করলেই এখন চোখে পড়ছে পুলিশের পোশাকে এক বন্ধু অন্য বন্ধুকে ধরে আছেন, আবার কোথাও পুলিশ সেজে চোরকে জড়িয়ে ধরে ছবি তুলছেন ব্যবহারকারীরা। প্রথম দর্শনে ছবিগুলোকে বাস্তব মনে হলেও, এগুলো আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি ফেস-সোয়াপ বা মুখমণ্ডল পরিবর্তনের ছবি। গত কয়েকদিনে বাংলাদেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই ‘চোর-পুলিশ’ ট্রেন্ডটি জনপ্রিয় হয়েছে।
ফেসবুক মাতানো এই ছবিগুলো মূলত ‘ম্যাজিক সোয়াপ পাজল’ (Magic Swap Puzzle) নামক একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনে ও ‘ফেসবুক গেমের’ মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ঝুঁকি হলো, প্লেস্টোর থেকে ডাউনলোড করা অ্যাপে একবার ডেটা আপলোড করলে আর ডিলিটের সুযোগ নেই। তবে ফেসবুকের গেম ফিড থেকে ব্যবহার করলে তথ্য ডিলিট করা যায়।
এআই-চালিত এই অ্যাপটি সাধারণ যেকোনো ছবির অবয়ব ঠিক রেখে খুব নিখুঁতভাবে ব্যবহারকারীর মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপন করতে পারে। অ্যাপটির ভেতরে থাকা চোর-পুলিশের রেডিমেড টেমপ্লেটটি নেটিজেনদের মাঝে তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়ায় এটি এখন ফেসবুকের ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে।
যেভাবে তৈরি করা হচ্ছে এই ছবি
স্মার্টফোনে এই ছবি তৈরি করা অত্যন্ত সহজ হওয়ায় সব বয়সী ব্যবহারকারী এতে মেতে উঠেছেন। প্রক্রিয়াটি মূলত এমন:
অ্যাপের এআই প্রসেসিং অপশনে ক্লিক করার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মূল টেমপ্লেটের মুখের জায়গায় ব্যবহারকারীদের মুখ নিখুঁতভাবে বসে যায় এবং ডাউনলোড করার উপযোগী এআই ছবি তৈরি হয়। পাশাপাশি সরাসরি ফেসবুক ফিডে অন্যের শেয়ার করা ছবি থেকেও তৈরি করা যায়।
‘ম্যাজিক সোয়াপ পাজল’ অ্যাপটি মূলত চীনভিত্তিক ডেভেলপারদের তৈরি। এটি গ্লোবাল মার্কেটে প্রথম রিলিজ পায় ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে। তবে চলতি বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে অ্যাপটিতে নতুন এআই রিলেশনশিপ ইন্টারঅ্যাকশন (যেমন: এআই হাগ, ফানি মেম টেমপ্লেট) এবং এই চোর-পুলিশের কার্টুনিশ বাস্তবসম্মত ফিল্টার যুক্ত করার পর বিশ্বব্যাপী এটি নতুন করে ভাইরাল হয়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ ও ভারতে এই আগস্ট মাসে অ্যাপটির ডাউনলোডের সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়েছে।
চোর-পুলিশের এই ট্রেন্ড আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ ও বিনোদনমূলক মনে হলেও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা একে দেখছেন ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে। সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই অ্যাপ ব্যবহারের পেছনে রয়েছে ডেটা প্রাইভেসির ঝুঁকি, বিশেষ করে অ্যাপ্লিকেশনটি স্টোর থেকে ডাউনলোড করা হলে।
বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ: অ্যাপটিতে ছবি নিখুঁত করার জন্য ব্যবহারকারীর ফেসিয়াল জ্যামিতি বা মুখের অবয়বের বায়োমেট্রিক ডেটা স্ক্যান করা হয়।
সার্ভারে ছবির স্থায়ী সংরক্ষণ: ব্যবহারকারী যখন নিজের ব্যক্তিগত ছবি এই থার্ড-পার্টি অ্যাপের সার্ভারে আপলোড করেন, তখন তা তাদের ক্লাউড সার্ভারে জমা হয়ে যায়। ফলে ভবিষ্যতে এই ডেটাবেস হ্যাক হলে বা ডার্ক ওয়েবে বিক্রি হলে ব্যবহারকারীর ছবি অপব্যবহার বা ডিপফেক পর্নোগ্রাফি তৈরিতে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়।
অ্যাপটি ইনস্টল করার সময় গ্যালারি, স্টোরেজ এবং লোকেশনের পারমিশন বা অনুমতি নিয়ে নেয়, যা ব্যবহারকারীর ফোনের অন্যান্য ব্যক্তিগত ফাইলের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
স্টোর থেকে এভাবে অ্যাপটি ডাউনলোড করা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ফেসবুক ফিড থেকে ব্যবহার করা তুলনামূলক নিরাপদ। কারণ ফেসবুকের বাধ্যবাধকতার কারণে খুব বেশি তথ্য নিতে পারে না অ্যাপটি। প্রোফাইলের নাম, ছবি এবং পছন্দের ভাষা কোনটি সেই তথ্য চাওয়া হয়।
যেভাবে তথ্য ডিলিট করবেন
ফেসবুকের প্রাইভেসি পলিসিতে বলা হয়েছে, ‘ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কাছে থাকা আপনার ব্যক্তিগত তথ্য যেন কোনোভাবে দুর্ঘটনাবশত বা বেআইনিভাবে নষ্ট, হারিয়ে, পরিবর্তন, কিংবা অননুমোদিতভাবে প্রকাশ, ব্যবহার বা অন্য কোনো অবৈধ প্রক্রিয়াকরণের শিকার না হয়, সেজন্য আমরা উপযুক্ত প্রযুক্তিগত ও শারীরিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি। অন্যান্য সমমানের গেম ডেভেলপারদের মতোই আমরা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে আপনার ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা দিয়ে থাকি।’
আপনার তথ্য মুছে ফেলতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
পর্দায় একটি পপ-আপ বার্তা আসবে। আপনার গেমের পুরোনো সব ইতিহাস (Game History) মুছে ফেলার জন্য সংশ্লিষ্ট বক্সে টিক দিন এবং চূড়ান্তভাবে 'রিমুভ' (Remove) অপশনে ক্লিক করুন।
সূত্র: কালবেলা