কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের তথ্য পাওয়ার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠছে। কিন্তু এআই যে তথ্য দিচ্ছে তা কতটা নির্ভুল ও নিরপেক্ষ? এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মেটার সাবেক নিউজ প্রধান ক্যাম্পবেল ব্রাউন বলছেন, এআই শিল্প এখনো সত্য ও নির্ভুল তথ্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না।
একসময় টেলিভিশন সাংবাদিক ছিলেন ক্যাম্পবেল ব্রাউন। পরে ফেসবুকের প্রথম নিউজ প্রধান হিসেবেও কাজ করেছেন। এখন তিনি কাজ করছেন এআই মডেলের তথ্য যাচাই নিয়ে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘ফোরাম এআই’।
সম্প্রতি সান ফ্রান্সিসকোতে টেকক্রাঞ্চের এক অনুষ্ঠানে ব্রাউন বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত মানুষের তথ্য গ্রহণের পদ্ধতি বদলে দিচ্ছে। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো এআই কী বলবে, কোন তথ্যকে গুরুত্ব দেবে, আর কোন তথ্যকে বাদ দেবে সেটি ঠিক করছে কে?
ব্রাউনের প্রতিষ্ঠান ফোরাম এআই মূলত বড় এআই মডেলগুলোকে মূল্যায়ন করে। বিশেষ করে এমন বিষয় নিয়ে, যেগুলোকে তিনি “হাই-স্টেক” বা সংবেদনশীল ক্ষেত্র বলছেন। এর মধ্যে রয়েছে ভূরাজনীতি, মানসিক স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও চাকরি নিয়োগের মতো বিষয়। তার ভাষায়, এসব ক্ষেত্রে সাদা-কালো ধরনের সহজ উত্তর নেই। এখানে জটিলতা, ব্যাখ্যা ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকে।
এই কাজের জন্য তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্লেষক নিয়াল ফার্গুসন, সাংবাদিক ফরিদ জাকারিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী টনি ব্লিঙ্কেন এবং সাবেক হাউস স্পিকার কেভিন ম্যাকার্থি। এসব বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে এআই মডেল কতটা সঠিক উত্তর দিচ্ছে তা যাচাই করা হয়।
ব্রাউন বলেন, চ্যাটজিপিটি প্রথম প্রকাশের পরই তিনি বুঝতে পারেন ভবিষ্যতে এআই তথ্য প্রবাহের প্রধান দরজা হয়ে উঠবে। কিন্তু তখনকার এআই উত্তর তাকে হতাশ করেছিল। তার ভাষায়, “এই প্রযুক্তি ঠিকভাবে কাজ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভুল তথ্যের মধ্যে বড় হবে।”
তার অভিযোগ, বড় এআই কোম্পানিগুলো মূলত কোডিং ও গণিতভিত্তিক দক্ষতায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। কিন্তু সংবাদ, তথ্য ও বাস্তবতা যাচাইয়ের মতো কঠিন বিষয়গুলোকে তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ফোরাম এআইয়ের মূল্যায়নে বিভিন্ন সমস্যাও উঠে এসেছে। ব্রাউন দাবি করেন, গুগলের জেমিনি অনেক সময় অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ওয়েবসাইটকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। প্রায় সব এআই মডেলেই রাজনৈতিক পক্ষপাতের প্রবণতা দেখা গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে সমস্যা শুধু রাজনৈতিক পক্ষপাত নয়। অনেক সময় এআই গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট বাদ দেয়, বিপরীত মতামত তুলে ধরে না। কিংবা কোনো যুক্তিকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করে। ব্রাউনের মতে, “এখনও অনেক পথ বাকি। তবে কিছু সহজ পরিবর্তন আনলেই পরিস্থিতির বড় উন্নতি সম্ভব।”
ফেসবুকে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। সেখানে তিনি দেখেছেন, কোনো প্ল্যাটফর্ম যদি শুধু ব্যবহারকারীর মনোযোগ বাড়ানোর দিকে নজর দেয় তাহলে তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘এনগেজমেন্ট’ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করেছে।
এখন তার আশা, এআই সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে না। তবে সেটি নির্ভর করবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কোন লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে তার ওপর। তারা কি শুধু ব্যবহারকারীর পছন্দমতো উত্তর দেবে, নাকি বাস্তব ও নির্ভুল তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দেবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ব্রাউন মনে করেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ ব্যাংক, বীমা বা নিয়োগের মতো ক্ষেত্রে ভুল তথ্যের ঝুঁকি অনেক বেশি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান এমন এআই চাইবে। যা সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে এআই মূল্যায়ন বা অডিট ব্যবস্থার অনেকটাই দুর্বল। শুধু সাধারণ পরীক্ষা দিয়ে এআইয়ের প্রকৃত ঝুঁকি বোঝা সম্ভব নয়। বাস্তব পরিস্থিতি ও জটিল উদাহরণ দিয়ে পরীক্ষা করতে হলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন।