পৃথিবীর সব স্থানে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সমান নয়। শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও এটিই ধ্রুব সত্য। পৃথিবীর ঘূর্ণন ও ভূ-অভ্যন্তরীণ গঠনের কারণে বিভিন্ন স্থানে মাধ্যাকর্ষণের সামান্য তারতম্য ঘটে থাকে। আর তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন, আমাদের গ্রহের সবচেয়ে দুর্বল মাধ্যাকর্ষণ অঞ্চলটি কোথায় অবস্থিত? বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্বল মাধ্যাকর্ষণ অঞ্চলটি অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের নিচে রয়েছে, যা গ্র্যাভিটি হোল নামে পরিচিত। এর অর্থ এই নয় যে সেখানে মাধ্যাকর্ষণ নেই। সেখানে এর মাত্রা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ আলেসান্দ্রো ফোর্টি এবং প্যারিস ইনস্টিটিউট অব আর্থ ফিজিকসের প্যাটার গ্লিশোভিচের নেতৃত্বে পরিচালিত নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, মাধ্যাকর্ষণ শক্তির এই পার্থক্য এতটাই সামান্য যে সাধারণ চলাফেরায় এটি অনুভব করা অসম্ভব। কিন্তু সমুদ্রের পানির ওপর এর প্রভাব বেশ গভীর। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সমুদ্রের পানিকে নির্দিষ্ট আকৃতিতে ধরে রাখতে সাহায্য করে। যেখানে মাধ্যাকর্ষণ দুর্বল সেখান থেকে পানি সরে গিয়ে শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ অঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়। এর ফলে অ্যান্টার্কটিকার আশপাশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কিছুটা কম। যদিও এটি সরাসরি বিশাল বরফস্তরকে নিয়ন্ত্রণ করে না তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এবং উপকূলীয় জ্যামিতিক কাঠামো নির্ধারণে এই গ্র্যাভিটি হোল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অ্যান্টার্কটিকার এই দুর্বল মাধ্যাকর্ষণ মূলত ভূ-অভ্যন্তরের শিলাস্তরের ঘনত্বের পার্থক্যের সঙ্গে যুক্ত। পৃথিবীর ভেতরে সব শিলার ঘনত্ব সমান নয়। কোনো অঞ্চল ঘন আবার কোনোটি তুলনামূলক হালকা। এই ঘনত্বের পার্থক্যই ভূপৃষ্ঠের মাধ্যাকর্ষণ টানকে প্রভাবিত করে। আর তাই ভূমিকম্পের তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর অভ্যন্তরের একটি ত্রিমাত্রিক মানচিত্রও তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা।
নতুন গবেষণার বিষয়ে আলেসান্দ্রো ফোর্টি বলেন, ভূমিকম্পের তরঙ্গ যখন পৃথিবীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন শিলার বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে সেগুলোর গতি বাড়ে বা কমে। এই তথ্য ব্যবহার করে আমরা ভূ-অভ্যন্তরের ঘনত্বের একটি চিত্র তৈরি করতে পারি, যা থেকে মাধ্যাকর্ষণের ধরন বোঝা সম্ভব হয়। কম্পিউটারের মাধ্যমে গত ৭ কোটি বছরের শিলাস্তরের প্রবাহ পেছন দিকে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। দেখা গেছে, প্রায় ৩ থেকে ৫ কোটি বছর আগে থেকে গ্র্যাভিটি হোলটি শক্তিশালী হতে শুরু করেছে।
মজার বিষয় হলো, ঠিক এই সময়কালেই অ্যান্টার্কটিকার জলবায়ুতে আমূল পরিবর্তন হয়েছিল ও মহাদেশটি বরফে ঢাকতে শুরু করেছিল। নতুন এই গবেষণা ফলাফল সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
সূত্র: আর্থ ডটকম