ছাগলকে সাধারণত দেখা যায় মাঠে ঘাস খেতে, ঝোপঝাড়ে ঘুরতে কিংবা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে পাতা চিবোতে। কিন্তু মরক্কোর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গেলেই দেখা মিলবে একেবারে অন্য দৃশ্যের। সেখানে ছাগল শুধু গাছের নিচে দাঁড়িয়ে খাবারের অপেক্ষা করে না, বরং নিজেরাই উঠে পড়ে গাছের ডালে! কখনও মাঝারি উচ্চতার ডালে, কখনও আবার একেবারে মগডালে দাঁড়িয়ে দিব্যি চলে তাদের ভোজ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, গাছে ফল নয়, যেন ছাগলই ফলের মতো ঝুলে রয়েছে!
এই অদ্ভুত দৃশ্যের নেপথ্যে রয়েছে মরক্কোর বিখ্যাত আরগান গাছ। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক এলাকায় এই গাছ প্রচুর জন্মায়। বিশেষ করে আগাদির ও এসাওইরা অঞ্চলের আশপাশে আরগান গাছের বিস্তীর্ণ বনভূমি রয়েছে। এটি এমন এক ধরনের গাছ, যা শুষ্ক আবহাওয়াতেও টিকে থাকতে পারে।
আরগান গাছে ছোট ছোট পাতা এবং জলপাইয়ের মতো দেখতে ফল ধরে। ফলের বাইরের অংশে থাকে রসালো শাঁস, যা ছাগলের বেশ পছন্দের খাবার। সাধারণত মাটিতে পর্যাপ্ত ঘাস ও অন্যান্য খাবার পাওয়া গেলে ছাগলকে গাছে উঠতে দেখা যায় না। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে যখন মাঠে ঘাসের অভাব দেখা দেয়, তখন খাবারের সন্ধানে তারা আরগান গাছের দিকে ছুটে যায়। আর মাটিতে দাঁড়িয়ে নাগাল না পেলে শুরু হয় গাছে ওঠার কসরত।
আরগান গাছের ডালপালা বেশ ঘন এবং অনেক জায়গায় কাঁটাযুক্ত। তা সত্ত্বেও ছাগলরা তাদের শক্ত পা ও বিভক্ত খুরের সাহায্যে গাছের গুঁড়ি এবং ডাল আঁকড়ে ধরে উপরে উঠে যায়। ছাগলের খুরের গঠন তাদের পাথুরে ও অসমান জায়গায় চলাফেরা করতে সাহায্য করে। সেই দক্ষতাই কাজে লাগে গাছে ওঠার সময়।
কখনও একটি গাছে একসঙ্গে কয়েকটি ছাগলকে দেখা যায়। কেউ গুঁড়ির কাছাকাছি ডালে, কেউ আবার অনেকটা উপরে সরু ডালে দাঁড়িয়ে পাতা ও ফল খাচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে তারা ডাল থেকে ডালে চলাফেরাও করতে পারে। গাছের ডাল খুব সরু হলে অবশ্য বিপদের আশঙ্কাও থাকে। তাই এই দৃশ্য যেমন মজার, তেমনই ছাগলদের শারীরিক দক্ষতারও পরিচয় দেয়।
স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে, ছোটবেলা থেকেই ছাগলরা অন্য ছাগলকে গাছে উঠতে দেখে এই কৌশল রপ্ত করে। কিছু এলাকায় রাখালেরাও তাদের গাছে ওঠার অভ্যাসে উৎসাহ দেন। তবে ছাগলরা ঠিক কীভাবে এই আচরণ শিখেছে, তা নিয়ে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। খাবারের অভাব, গাছের ফলের প্রতি আকর্ষণ এবং অন্য ছাগলকে অনুসরণ করার প্রবণতা সব মিলিয়েই এই অভ্যাস গড়ে উঠেছে বলে মনে করা হয়।
ছাগলদের গাছে ওঠার ঘটনা শুধু পর্যটকদের আনন্দ দেওয়ার জন্য নয়, পরিবেশের ক্ষেত্রেও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আরগান ফলের ভিতরে থাকে শক্ত খোলসযুক্ত বীজ। ছাগল ফলের শাঁস খেয়ে ফেলে, কিন্তু শক্ত বীজ সাধারণত হজম করতে পারে না। অনেক সময় জাবর কাটার সময় মুখ থেকে বীজ ফেলে দেয়। আবার কিছু বীজ মলের সঙ্গেও মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে।
এভাবে মূল গাছ থেকে দূরে বীজ পৌঁছে যাওয়ার ফলে নতুন জায়গায় আরগান গাছ জন্মানোর সুযোগ তৈরি হয়। তবে সব বীজ থেকেই নতুন গাছ জন্মায় না। মাটির গুণমান, আর্দ্রতা এবং আবহাওয়ার মতো বিষয়ও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, ছাগলরা নিজেরা হয়তো জানেই না, খাবার খুঁজতে গিয়ে তারা একদিকে পেট ভরাচ্ছে, অন্যদিকে গাছের বংশবিস্তারের কাজেও সাহায্য করছে!
আরগান গাছ শুধু ছাগলের খাবারের উৎস নয়, মরক্কোর অর্থনীতি ও স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। এই গাছের ফলের শক্ত বীজ সংগ্রহ করে তার ভিতরের শাঁস থেকে তৈরি করা হয় আরগান তেল। প্রসাধনী শিল্পে এই তেলের বিশেষ চাহিদা রয়েছে। ত্বক ও চুলের যত্নে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রসাধনীতে আরগান তেল ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি খাবার হিসেবেও বিশেষ ধরনের আরগান তেলের ব্যবহার রয়েছে।
বিশেষ করে স্থানীয় মহিলাদের অনেক সমবায় সংস্থা আরগান ফল সংগ্রহ, বীজ ভাঙা এবং তেল তৈরির কাজের সঙ্গে যুক্ত। এই শিল্প বহু পরিবারের জীবিকার উৎস।
মরক্কোয় বেড়াতে যাওয়া পর্যটকদের কাছে গাছে চড়া ছাগল এখন বেশ আকর্ষণীয় দৃশ্য। রাস্তার পাশের আরগান গাছে একাধিক ছাগলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অনেকেই গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
মরক্কোর এই ছাগলদের কাণ্ড দেখলে মনে হবে, খাবারের জন্য তাদের কাছে কোনও বাধাই বাধা নয়। মাঠে ঘাস না থাকলে গাছের ডালই হয়ে ওঠে খাবার টেবিল। আর সেই টেবিলে বসতে চার পায়ে চড়তে হয় কয়েক মিটার উঁচুতে! ছাগলদের এই অদ্ভুত অভ্যাস তাই একই সঙ্গে বিস্ময়কর, মজার এবং প্রকৃতির এক অভিনব কৌশলের উদাহরণ।
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন