প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় বিলুপ্ত ডোডো পাখিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। তবে জিনগত পরিবর্তন, প্রজনন ও ভ্রূণের বিকাশ নিয়ে রয়েছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।
প্রায় ৩৫০ বছর আগে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া উড়তে অক্ষম ডোডো পাখিকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কোলোসো বায়োসায়েন্সেস। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০৩০ সালের শুরুর দিকে এ প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যেতে পারে। তবে ডোডোকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি এখনো গবেষণা ও পরীক্ষানিরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে।
টাইম সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোডো পাখির প্রাচীন ডিএনএর নমুনা সীমিত এবং দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত নমুনার জিনগত উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে ডোডোর জিনোম বিশ্লেষণ এবং তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের চেষ্টা করছেন গবেষকেরা।
কোলোসো বায়োসায়েন্সেসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহপ্রতিষ্ঠাতা বেন লাম বলেন, বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে শুধু জীববিজ্ঞান নয়, বিপুল পরিমাণ জিনগত তথ্য বিশ্লেষণও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এআইয়ের সাহায্যে জীবিত পাখির জিনের কার্যক্রম ও নিয়ন্ত্রক ডিএনএ বিশ্লেষণ করে ডোডোর স্বতন্ত্র শারীরিক বৈশিষ্ট্য তৈরিতে ভূমিকা রাখা জিনগত উপাদান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
ডোডোর জিনোম বিশ্লেষণে এআই
ডোডো পাখির জিনগত বৈশিষ্ট্য বুঝতে গবেষকেরা সংরক্ষিত নমুনা থেকে প্রায় সম্পূর্ণ একটি জিনোম তৈরি করেছেন। এ কাজে আগে বিলুপ্ত ডায়ার উলফের জিনোম বিশ্লেষণে ব্যবহৃত প্রযুক্তির কিছু অংশ কাজে লাগানো হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা ‘জিনোমর্ফ’ নামে একটি এআই প্ল্যাটফর্মও তৈরি করেছেন। এর মাধ্যমে মুরগি, কোয়েল, হাঁস ও পায়রার ভ্রূণে মুখমণ্ডলের বিকাশ নিয়ন্ত্রণকারী জিনগত উপাদান বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ৭০টিরও বেশি প্রজাতির পাখির জিনোম ও খুলির আকৃতি তুলনা করা হয়েছে।
গবেষকদের বিশ্লেষণে প্রায় ২ হাজার ৩৫০টি সম্ভাব্য জিনগত নিয়ন্ত্রক উপাদান শনাক্ত হয়েছে, যেগুলো ডোডোর বিশেষ আকৃতির ঠোঁটের গঠন বুঝতে সহায়তা করতে পারে। এসব উপাদানের কার্যক্রম পরীক্ষা করে ডোডোর বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠনের সম্ভাবনা যাচাই করছেন তাঁরা।
তবে কাজটি সহজ নয়। শুধু ঠোঁটের আকার, পুরুত্ব ও প্রস্থের সঙ্গেই হাজার হাজার নিয়ন্ত্রক উপাদানের সম্পর্ক থাকতে পারে। এসব উপাদান কোন জিনকে কখন সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করবে, তা নির্ধারণ করা প্রকল্পটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
কীভাবে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে ডোডোকে?
ডোডো পাখির নিকটতম জীবিত আত্মীয় হিসেবে পরিচিত নিকোবর পায়রাকে এ গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিজ্ঞানীরা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিকোবর পায়রার আদিম জননকোষ বা প্রাইমোর্ডিয়াল জার্ম সেলস (পিজিসিএস) সংগ্রহ করে সেগুলোর জিনগত বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হবে।
এই কোষগুলো থেকেই পরবর্তী সময়ে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু তৈরি হয়। গবেষকেরা ডোডোর বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে সেগুলোকে পাখির ভ্রূণের বিকাশে কাজে লাগাতে চান। তবে এ পদ্ধতিতে ডোডোর মতো পাখি তৈরি করা সম্ভব হবে কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়।
প্রকল্পটির পাখি প্রজাতি বিভাগের পরিচালক আনা কিটে জানিয়েছেন, নিকোবর পায়রা নির্দিষ্ট প্রজনন মৌসুমে ডিম পাড়ে এবং একবারে সাধারণত দুটি ডিম দেয়। অন্যদিকে, মুরগি সহজলভ্য হওয়ায় গবেষণার জন্য তুলনামূলক বেশি ডিম পাওয়া সম্ভব। এ কারণে মুরগিকে বিকল্প প্রজনন-সহায়ক প্রজাতি হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে পাখির ক্ষেত্রে এ ধরনের গবেষণা স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় জটিল। পাখির ভ্রূণ মায়ের জরায়ুতে নয়, ডিমের মধ্যে বিকশিত হয়। তাই পরিবর্তিত জননকোষকে সঠিকভাবে ভ্রূণের জননকোষে পৌঁছানো, সেগুলোর কার্যকারিতা বজায় রাখা এবং পরবর্তী প্রজন্মে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করা বড় বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ।
ডায়ার উলফ নিয়ে আগের কাজ
এর আগে কোলোসো বায়োসায়েন্সেস বিলুপ্ত ডায়ার উলফের জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী, ধূসর নেকড়ের জিনোমে নির্দিষ্ট কিছু পরিবর্তন এনে ডায়ার উলফের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে জীবিত ধূসর নেকড়ের কোষে জিনগত পরিবর্তন আনা হয়। পরে পরিবর্তিত কোষের নিউক্লিয়াস নিউক্লিয়াসবিহীন ডিম্বাণুতে প্রবেশ করিয়ে ভ্রূণ তৈরি এবং বিকাশের জন্য একটি বিকল্প মাতৃপ্রজাতি ব্যবহার করা হয়।
তবে এ ধরনের উদ্যোগকে বিলুপ্ত প্রজাতির হুবহু পুনরুজ্জীবন হিসেবে দেখা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো জীবিত প্রজাতির মধ্যে বিলুপ্ত প্রাণীর নির্বাচিত বৈশিষ্ট্য তৈরি করা আর সেই বিলুপ্ত প্রজাতির সম্পূর্ণ জিনগত ও জীববৈজ্ঞানিক পরিচয় ফিরিয়ে আনা এক বিষয় নয়।
ডোডোকে ফিরিয়ে আনতে কত দিন লাগবে?
গবেষকদের ধারণা, ডোডোর জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা এবং সফল প্রজনন নিশ্চিত করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। এ কারণে ২০৩০ সালের শুরুর দিককে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডোডো পাখির জন্ম হবে এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই।
ডোডো পাখি একসময় ভারত মহাসাগরের মরিশাস দ্বীপে বাস করত। মানুষের আগমন, শিকার এবং মানুষের সঙ্গে আসা প্রাণীর কারণে এর আবাসস্থল ও প্রজননব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে পাখিটি বিলুপ্ত হয়ে যায় বলে সাধারণভাবে মনে করা হয়।
একসময় মানুষের কাছে বোকা ও সহজে শিকারযোগ্য প্রাণী হিসেবে পরিচিত ডোডো এখন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রতীক। বিজ্ঞানীরা যদি এর জিনগত বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠনে সফল হন, তাহলে সেই গবেষণা ভবিষ্যতে বিলুপ্ত বা বিপন্ন প্রজাতির জিনোম বিশ্লেষণ ও সংরক্ষণবিষয়ক গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তবে ডোডোকে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি তার জন্য উপযুক্ত আবাসস্থল তৈরি, প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনা করতে হবে। তাই বিজ্ঞানীদের এই উদ্যোগের সাফল্য শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও জীববৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ওপরও নির্ভর করবে।
সূত্র : আরটিভি