সহযোগীদের খবর: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদ নিচ্ছে না জামায়াত। সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের ভাবনা গণভোটে অনুমোদিত জুলাই জাতীয় সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের পরিষ্কার রূপরেখা ছাড়া তারা আপাতত এই পদ গ্রহণ করবে না। সূত্র: মানবজমিন প্রতিবেদন
আপাতত জামায়াত ডেপুটি স্পিকার পদ নিচ্ছে না মন্তব্য করে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, বিষয়টি জুলাই জাতীয় সনদের সঙ্গে জড়িত। ক্ষমতাসীন দল বিএনপি জুলাই সনদ কার্যকরে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কেবল একজন ডেপুটি স্পিকার দিলেই সংস্কার প্রস্তাব অথবা জুলাই সনদের অঙ্গীকার পরিপূর্ণ হবে না। তিনি বলেন, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার মনোনয়ন দেয়া সংস্কার প্রস্তাবের খণ্ডিত অংশ। সংস্কারের অনেকগুলো প্রস্তাব আছে।
সেসব বিষয়ে পরিষ্কার করতে হবে। নচেৎ প্রশ্ন থেকে যাবে। তিনি বলেন, তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছেন। গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এখন গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে ছলচাতুরি হচ্ছে। আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে গণভোটের রায় বানচাল করার চেষ্টা করছেন। গণ-আকাঙ্ক্ষা পূরণ না করে জামায়াতের পক্ষে ডেপুটি স্পিকার পদ গ্রহণ সম্ভব নয়।
বিরোধী দল থেকে একজন ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের বিষয়টি ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরপরই আলোচনায় আসে। কারণ জুলাই সনদের অঙ্গীকারের মধ্যে বিষয়টি উল্লেখ ছিল। কয়েক সপ্তাহ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা না থাকলেও গত সোমবার বিষয়টি সামনে আনেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।
ওইদিন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি জানান, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ঠিক করার জন্য প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে। রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসাবে জুলাই জাতীয় সনদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমরা এখন থেকে তা বাস্তবায়ন শুরু করতে চাই।
সেজন্য আমরা আমাদের দলের পক্ষ থেকে প্রধান বিরোধী দলকে মৌখিক ও সাক্ষাতে অফার করেছি যে, তারা যেন ডেপুটি স্পিকার ঠিক করেন এবং স্পিকার নির্বাচনের দিনই যেন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হতে পারে। তাহলে কি এবারই উচ্চকক্ষ গঠিত হচ্ছে? এমন প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এটা আলাপ-আলোচনার বিষয়। তবে আমরা ডেপুটি স্পিকার দেয়ার বিষয়টি এখন অফার করতেই পারি। যদিও চাইলে সরকারি দল স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুটোই নিতে পারে। তবে জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী ডেপুটি স্পিকার একজন বিরোধী দল থেকে হবেন। সেটা আমরা এখনই ‘গুড উইল’ হিসেবে অফার করেছি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড.এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান ছিল গণ-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। বৈষম্যহীন ইনসাফ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ছিল এর মূল ভিত্তি।
কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় এসে সংবিধানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সংস্কারকে পাশ কাটানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। সংবিধান জনগণের কল্যাণে প্রণীত; জনগণের অভিপ্রায়কে উপেক্ষা করার জন্য নয়। তিনি বলেন জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট একটি মীমাংসিত বিষয়। এটা নিয়ে কোনোরূপ প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। ১২ই ফেব্রুয়ারি জনগণ গণভোটে পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সরকার সংবিধানের দোহাই দিয়ে জনগণের প্রতিষ্ঠিত গণভোটের রায় উপেক্ষা করে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী ১২ই মার্চ প্রথম অধিবেশনে স্পিকার নির্বাচনের পরপরই ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রস্তুতি রয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার চাইছে বিরোধী দল যাকে মনোনীত করবে, তাকেই সমর্থন দিতে। কিন্তু বিরোধী দল বলছে, এটি কেবল একটি পদ নয়; গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদকে ‘প্যাকেজ’ আকারে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার আগে নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্র মতে, গণভোটের ফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই জামায়াত ডেপুটি স্পিকার পদ নিতে চায়। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ইফতার মাহফিলের পর চা-চক্রে বিএনপি’র চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই মনোভাব জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমীর ডা: শফিকুর রহমান।
জুলাই সনদ অনুযায়ী দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদব্যবস্থায় উভয় কক্ষের ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হওয়ার বিধান সংবিধানে যুক্ত করার কথা রয়েছে। জামায়াতের দাবি, এটি সরকারি দলের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল কোনো প্রস্তাব নয়; বরং গণভোটে অনুমোদিত রাজনৈতিক সমঝোতার বাধ্যবাধকতা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর প্রাক্কালে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটকে ঘিরে নতুন করে সাংবিধানিক বিতর্কের সূচনা হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫; গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
গত সোমবার বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের বেঞ্চ পৃথক দু’টি রিটের শুনানি শেষে এই রুল দেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে- জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি সংসদ সচিবালয় থেকে এমপিদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার চিঠি কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না। একইসঙ্গে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ৩ নম্বর তফসিল- যার আওতায় ৩০টি বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের কথা বলা হয়েছে-তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
রিটকারীদের দাবি, সংবিধানে গণভোট বা জুলাই সনদের কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই। এই রুলের ফলে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনসহ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে চলমান রাজনৈতিক সমঝোতায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে জামায়াতের বক্তব্য, গণভোট এবং জুলাই সনদ অবৈধ হলে অন্তর্বর্তী সরকার সেইসঙ্গে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনও অবৈধ হয়ে যায়। সুতরাং গণভোট এবং জুলাই সনদকে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই।