সহযোগীদের খবর: স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আসন্ন ঈদের পর দলেও মনোযোগ বাড়াতে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে রংপুর ও খুলনা বিভাগের ফলাফল বিপর্যয় ভাবিয়ে তুলেছে ক্ষমতাসীন বিএনপিকে। কী কারণে এই দুই অঞ্চলে ভোটে ভরাডুবি- মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে নামবে দলটি। ইউনিয়ন থেকে বিভাগের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সূত্র: সময়ের আলো প্রতিবেদন
ভোটে কেন এত বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল; মাঠ থেকে তার প্রকৃত কারণও খুঁজবে দলটি। সরকারের মন্ত্রী পরিষদে ঠাঁই না পাওয়া ও মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের সাংগঠনিক বড় দায়িত্বে দেখা যেতে পারে। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সরকার ও দল উভয়ের মধ্যেই ভারসাম্য আনতে চাচ্ছে বিএনপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও বলছেন, সরকার পরিচালনায় সফল হতে হলে দল ও সরকারের মধ্যে সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য থাকা অপরিহার্য।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচন সামনে রেখে সংগঠনের দিকেও মনোযোগী হচ্ছে বিএনপি। দলটি মনে করছে, এখনই সংগঠনের অভ্যন্তরে সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯ আসনে জয়লাভে সরকার গঠন করেছে। তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। তা বিএনপিকে বিস্মিত করেছে। বিশেষ করে উত্তরের জেলা রংপুরের ছয়টি আসনেই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা জয়ী হন। যেখানে জামায়াত ৫টি এবং একটি আসনে জিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি।
এ ছাড়া রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম জেলায় একটি আসনেও বিএনপির প্রার্থীরা জিতেননি। চারটি সংসদীয় আসনের তিনটিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং একটিতে জামায়াত সমর্থিত এনসিপি প্রার্থী বিজয়ী হন। এ ছাড়া নীলফামারীর চারটি সংসদীয় আসনেই জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। উত্তরের আরেক জেলা গাইবান্ধার পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে বিপুল ভোট ব্যবধানে জয়ী হন জামায়াত প্রার্থীরা।
একমাত্র গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে মাত্র তিন হাজার ভোট ব্যবধানে জয়ী হন বিএনপির প্রার্থী। দক্ষিণ পশ্চিমের অঞ্চল খুলনায়ও প্রায় একই চিত্র। সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর জেলায় কোনো আসনই পায়নি বিএনপি। বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও যশোর এই তিন জেলায় মাত্র একটি করে আসনে জয়ী হয় বিএনপি। বাকি সবখানে জিতে যায় জামায়াতে ইসলামী। অর্থাৎ, অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এবার খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতে বিজয়ী হয়েছে জামায়াত। বিভাগীয় রাজনীতিতে এটি দলটির সর্বোচ্চ সাফল্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির ঘরোয়া বিবাদের ফসল ঘরে তুলেছে বিরোধী পক্ষ জামায়াত। বিএনপি যেসব জায়গায় হেরেছে সেগুলোর বেশিরভাগ আসনেই ছিল বিদ্রোহী প্রার্থী। বিএনপি-বিএনপির মধ্যে লড়াইয়ের সুবিধা নেয় জামায়াতের প্রার্থীরা। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ডেকে মতবিনিময় করেন।
ভোটে বিদ্রোহী না হওয়ার বার্তা দিয়ে অনুরোধ জানান ধানের শীষের প্রার্থীর জন্য কাজ করতে কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। নির্বাচনে প্রায় ১০০-এর মতো বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। যদিও তাদের মধ্যে বেশিরভাগই নিজেরা পরাজিত হয়েছেন। অনেক জায়গায় ধানের শীষকেও ডুবিয়েছেন। এর পেছনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়হীনতা বড় প্রভাব ফেলেছে। কোথাও কোথাও প্রার্থী বাছাই নিয়ে অসন্তোষ, আবার কোথাও জোট সমীকরণের জটিলতা ভোটে বিভাজন তৈরি করেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
সূত্র জানায়, বিএনপির হাইকমান্ড সময়-সুযোগ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তৃণমূলের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। কী কারণে এমন ফলাফল তা খোঁজার চেষ্টা করবেন। যেসব জায়গায় সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে দায়িত্বশীল নেতাদের দায়িত্ব দেবেন। যেখানে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব রয়েছে, মাঠপর্যায়ে নিষ্ক্রিয়তা এবং তৃণমূল কর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে সেসব জায়গার কমিটিগুলো ঢেলে সাজানো হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট পৌরসভার মেয়র, জেলা ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের অপসারণ করে। পরদিন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানদেরও অপসারণ করা হয়। এরপর ২৬ সেপ্টেম্বর দেশের ৩২৩টি পৌরসভার কাউন্সিলর এবং ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর একযোগে অপসারণ করা হয়। এই ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ছিল- ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, গাজীপুর এবং ময়মনসিংহ। বিএনপি সরকার গঠনের পর স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার যেমন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের প্রার্থীরা যাতে ভালো ফল করতে পারে সে জন্য আগেভাগে মাঠে নামছে বিএনপি। তৃণমূল গুছিয়ে শক্তিশালী সংগঠন নিয়েই স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায় দলটি। সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে ভালো করতে চায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি।
এদিকে সরকার পরিচালনায় সফল হতে দল ও সরকারের মধ্যে ভারসাম্য আনতে চাচ্ছে বিএনপি। সে জন্য যারা মন্ত্রীপরিষদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন, তাদের দলের সাংগঠনিক বড় দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হবে। যারা মন্ত্রিত্ব পাননি এমনকি নির্বাচনও করেননি তাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তাদের মধ্যে অন্যতম বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে শামসুজ্জামান দুদু, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, বরকত উল্লাহ বুলু। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম, ফরহাদ হালিম ডোনার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হাসেন আলাল, নাজিম উদ্দিন আলম, ঢাকা-২ আসনের এমপি আমান উল্লাহ আমান, যুগ্ম মহাসচিবের মধ্যে ভোট থেকে বিরত থাকা হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, নরসিংদী-১ আসনের এমপি খায়রুল কবির খোকন, পরাজিত প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স প্রমুখ। তারা আসতে পারেন সাংগঠনিক বড় দায়িত্বে।
এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিকাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক সময়ের আলোকে বলেন, সরকার পরিচালনায় সফল হতে হলে দল ও সরকারের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য থাকা অপরিহার্য। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ক্ষমতায় গেলে অনেক সময় দল ও সরকার কার্যত একীভূত হয়ে পড়ে; ফলে নীতিনির্ধারণ ও দলীয় কাঠামোর সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। এতে জবাবদিহি কমে এবং উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যারা সরকারে থাকেন, তাদের বড় অংশই দলে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকেন; আবার দলীয় নেতারাও সরাসরি সরকারে যুক্ত থাকেন- ফলে পার্থক্য নির্ধারণ কঠিন হয়ে ওঠে।