এল আর বাদল : সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের দিন থেকেই বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক সংকটের শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন আইন বিশ্লেষকেরা৷ জামায়াত ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নিলেও বিএনপির সংসদ সদস্যরা তা করেননি৷
এরইমধ্যে জামায়াত ও এনসিপি এর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে৷ তারা কোনো ধরনের শপথ নেয়া থেকে বিরত থাকতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত নিয়েছে৷ তবে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে যায়নি৷ বিএনপি বলছে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেয়ার কোনো বিধান সংবিধানে নেই৷ তাই তারা শপথ নেননি৷ এনসিপির আহ্বায়ক ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়া এই সংসদের কোনো মূল্য নেই৷ --------- ডয়েচেভেলে
শেখ হাসিনার পতনের পর ৮ আগস্ট প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বতী সরকার দায়িত্ব নেয়৷ তারা সংবিধান সংস্কার কমিশনসহ কয়েকটি কমিশন করে৷ তাদের কাজ শেষ হওয়ার পর করা হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন৷ এর প্রধান করা হয় ড. ইউনূস এবং সহ-সভাপতি করা হয় অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজকে৷ তারা ৩৩টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করে৷ ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জুলাই সনদ আদেশ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে সরকার৷ আর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জুলাই সনদ নিয়ে ৪টি প্রশ্নের মাধ্যমে গণভোটও হয়৷ গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হয়৷
এরইমধ্যে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে গণভোটের বিরুদ্ধে রিট হয়েছে৷ জুলাই সনদের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়েও আরেকটি রিট হয়েছে৷
শুরু থেকেই এই সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক ছিলো৷ গণভোটে যে চারটি প্রশ্ন করা হয়েছে, তা নিয়ে অস্পষ্টতারও অভিযোগ আছে৷ আবার বিএনপি জুলাই সনদে সই করলেও বেশ কিছু বিষয়ে তাদের নোট অব ডিসেন্ট আছে৷ ফলে দেশে জুলাই সনদ ও তার বাস্তবায়ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে আছে৷ সংসদের অধিবেশন ডাকা হলে এই বিতর্ক আরো বাড়বে৷
যা বলছেন আইন বিশ্লেষকেরা
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, ‘‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ না নেয়ার মধ্য দিয়ে তারা (বিএনপির সংসদ সদস্য) জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ধারা ৮ এবং তফসিল লঙ্ঘন করেছেন৷ এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছিলো সেই অঙ্গীকারের প্রতি তারা অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন৷ এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতিও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল৷
তিনি বলেন, বিএনপি যে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে তাহলে প্রশ্ন গণভোট কি সংবিধানে ছিলো, জুলাই অভ্যুত্থান কি সংবিধানে ছিলো, অন্তর্বর্তী সরকার কি সংবিধানে ছিলো, ২০২৬ সালের ১২ জুলাইর সংসদ নির্বাচন কি সংবিধানে ছিলো? মূল প্রশ্ন সংবিধানের নয়, তারা মেজরিটির জোরে জোর দেখাচ্ছেন৷''
অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, ‘‘জুলাই সনদে স্পষ্ট করে বলা আছে যারা নির্বাচিত হবেন তারা দুইটা শপথ নেবেন৷ একটা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ৷ আরেকটা সংসদ সংসদ সদস্য হিসাবে শপথ৷ এটাও বলা আছে সংসদ সদস্যের শপথ যিনি পড়াবেন, তিনিই সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদের শপথ পড়াবেন, আইনেই আছে৷ কিন্তু তারা গায়ের জোরে আইন মানছেন না৷
‘‘তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী হ্যাঁ ভোটের প্রচার করেছেন৷ তাহলে তারা আইনের একাংশ মানছেন, আরেক অংশ মানছেন না৷ যে আইন তাদের পছন্দ হবে সেটা তারা মানবেন, যেটা পছন্দ হবে না সেটা তারা মানবে না- এইটাই হলো তাদের অবস্থান৷ একটি সংসদ আরেকটি সংসদকে বাধ্য করতে পারে না৷ কিন্তু অভ্যুত্থানের পর তো কোনো সংসদ ছিলো না৷ তাহলে বাধ্য করার প্রশ্ন আসে কেন? আর এটা তো জনগণের অভিপ্রায়৷ গণভোটে তারা রায় দিয়েছে, বলেন তিনি৷
'বিএনপি সঠিক অবস্থানেই আছে'
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ না নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান পরিপন্থি কোনো কাজ করেননি৷ কারণ, সংবিধানে বলা আছে কে শপথ নেবে, কীভাবে শপথ নেবে, কার কাছে শপথ নেবে৷ কিন্তু সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলে কিছু নেই৷ যদি ওটা সংবিধানে যোগ করা হয় তখন শপথ নেয়ার প্রশ্ন আসবে৷ যেহেতু সংবিধানে ওটা এখন নেই তাই শপথ নেয়ার প্রশ্ন আসে না৷ আমার মনে হয় বিএনপির অবস্থান ঠিক আছে৷''
‘‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের ধারণাটা মূল্যহীন৷ কারণ সংসদই সংবিধান সংস্কার করতে পারে৷ এই সংসদই পারবে৷ সেজন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলে আলাদা একটা বিষয়ের কেন দরকার পড়লো সেটা আমার কাছে বোধগম্য হচ্ছে না,'' বলেন তিনি৷
গণভোট প্রসঙ্গে ড. মালিক বলেন, এটা যারা করেছে তারা আইনের আগামাথা কী বোঝে আমি জানি না৷ এটা কীভাবে, কোন আইনে করা হলো? তারপরও যারা বলছে গণভোটে হ্যাঁ জিতে যাওয়ায় সংস্কার করতে হবে, তাহলেতো বলতে হবে সংস্কার গণভোটের মধ্য দিয়েই হয়ে গেছে৷ আবার সংবিধান সংস্কার পরিষদ লাগবে কেন? গণভোটের মাধ্যমেই তো সব হয়ে গেছে৷ এটা কেমন গণভোট যে অর্ধেক হলো, অর্ধেক হলো না৷ এরকম তো গণভোট হয় না৷
সামনে কোনো জটিলতা বা রাজনৈতিক সংকট হতো পারে কীনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘সব কিছুর মধ্যে সংকট খোঁজা ঠিক না৷ সাংবাদিকরা আশা করে এটা নিয়ে আন্দোলন হবে৷ রাজপথ গরম হবে, হরতাল হবে৷ এই সংকট খোঁজার সাংবাদিকতা বাদ দিতে হবে৷''
এক প্রশ্নে জবাবে ড. মালিক বলেন, ‘‘যারা বলছেন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ না নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্যরা জুলাইয়ের চেতনার পরিপন্থি কাজ করেছেন, তারা বলতে পারেন৷ কিন্তু চেতনা পরিপন্থি হলে তো আর সংবিধান পরিপন্থি হয় না৷ আর চেতনা তো একটা আপেক্ষিক বিষয়৷
'বিএনপি ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে’
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ‘‘আমার মনে হয় ওনারা (বিএনপি) ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন৷ তারা বলছেন এটা সংবিধানে নেই৷ কিন্তু সংবিধান তো দেশের জনগণের উপরে না৷ জনগণ সব কিছুর উপরে৷ জনগণ সংবিধানেরও উপরে৷ জনগণ চাইলে সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান করতে পারে৷ এটা তো কোনো আসমানি কিতাব না যে পরিবর্তন করা যাবে না৷ পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ দেশে নতুন সংবিধান করা হয়েছে৷
তিনি বলেন, জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে৷ জুলাই সনদে সংবিধান সংস্কারের কথা আছে৷ সংবিধান সংস্কার পরিষদের কথা আছে, শপথের কথা আছে৷ শপথের ফরম আছে৷ কে পড়াবে তা বলা আছে৷ জুলাই সনদ আদেশ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছে অন্তর্ববর্তী সরকার৷ রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে৷ এখন যদি সংবিধানের দোহাই দেয়া হয় তাহলে তো তারা জন-আকাঙ্খার বিরুদ্ধে গেলেন৷
এখন বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে৷ তারা চাইলে তাদের মতো করে সংস্কার করতে পারবে৷ সংবিধানে সেটা আছে৷ কিন্তু তাতে তো জন-আকাঙ্খা পূরণ হবে না৷ কারণ সংসদ সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন করতে পারবে না৷ সেটা করলে উচ্চ আদালতে বাতিল হয়ে যাবে৷ এবার তো সংবিধানে আমূল পরিবর্তন চাওয়া হয়েছে৷ সেটা কিন্তু আর সম্ভব হবে না, বলেন ড. শরীফ ভূঁইয়া৷ তিনি বলেন, ‘‘এই অবস্থায় সাংবিধানিক সংকট তৈরি না হলেও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে৷
এই নিয়ে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সভাপতি ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ ডয়চে ভেলের কাছে আপাতত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি৷
তবে কমিশনের আরো কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট হয়েছে যে তারা আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন৷ তারা মনে করছেন শেষ পর্যন্ত আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংস্কারের পক্ষে একটি অবস্থান তৈরি হবে৷