শিরোনাম
◈ প্রকাশিত হলো রাষ্ট্রপতির ‘এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ’ বইয়ের ইংরেজি সংস্করণ   ◈ বিএনপি নেতাদের জামিন বিষয়ে আমাদের কিছু করার নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ ‘কিছু ভালো লাগে না’ গ্রুপ দেশের নামে দুর্নাম রটায়: প্রধানমন্ত্রী ◈ বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে কিছুটা চাপে আছে দেশের অর্থনীতি: অর্থমন্ত্রী ◈ সমালোচনা হবেই, এটা দেখাটা জরুরি না: নান্নু ◈ প্রতিবেশীদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে ‘সামুদ্রিক সম্পদ’ আহরণ করুন: প্রধানমন্ত্রী ◈ ২০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহার করলে বিদ্যুতের দাম ৫ শতাংশ বাড়বে, ১ মার্চ থেকে কার্যকর ◈ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাশিয়ার ‘৬০ সেনা নিহত’ ◈ দোষী প্রমাণিত হলে অবহেলাকারী ও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা: স্বাস্থ্যমন্ত্রী  ◈ খুলনাকে ৬৫ রানে হারিয়ে প্লে-অফে চট্টগ্রাম

প্রকাশিত : ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ০২:১৬ রাত
আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ০২:১৬ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মেলায় কে থাকবে কে থাকবে না, এই সিদ্ধান্ত  জনগণ নিলে আইন থাকে কোথায়? 

মেহরাব মুন

মেহরাব মুন: আমাদের পাশের গ্রামের জাগের নানা । বয়স ছিলো তার একশোর কাছাকাছি। দুটো বউই মারা গিয়েছিলো, একজন অসুস্থ হয়ে আরেকজন বয়সের ভারে। ছেলে মেয়েরা বড়ো হয়ে বিয়েশাদি করে আলাদা হয়ে গেছে। জাগের নানা তাই বড়ো একা। এক বিয়ের দাওয়াতে গিয়ে শতবর্ষী জাগের নানাকে দেখতে গেলাম। মেঝ মামাকে জাগের নানা তার মনের খায়েশ জানালেন। তিনি বিয়ে করবেন। একা একা তার ভালো লাগে না। কেউ নেই তার সেবাযত্ন করার। মামা বললেন, এই বয়সে বিয়া করবেন খালু? জাগের নানা অটল। বিয়ে তিনি করবেনই। এবং অবশ্যই কম বয়স্ক কোন মেয়েকে। ওরা স্বামীকে মান্য করে। ভয় পায়। বয়স বেশি হলে তারা স্বামীর কথা শোনে না! ঘটনার গভীরতা টের পেয়ে মামা আমাদের বাড়ির কেয়াটেকার শরীফকে ধাক্কা দিয়ে আমাকে সরিয়ে নিয়ে যেতে বললেন। 

সেই জাগের নানা বিয়ের পর পাঁচ ছয় বছর বেঁচে ছিলেন। প্রচুর জমিজমার মালিক জাগের নানার বিধবা বউয়ের এরপর কী হয়েছিলো আমাদের আর জানা হয়নি। এরকম ঘটনা আমি আরো দেখেছি। এই দেশে বাল্যবিবাহ যেমন স্বাভাবিক ঘটনা তেমনি বুড়ো ঘাটের মরাদের কচি মেয়ে বিয়ে করাটাও পান্তাভাতই। 

বাঙ্গালী কোনকালেই এতো সভ্য এতো সচেতন এতো সুবিচারক হয়ে যায়নি যে এইসব সামাজিক বিষয়ে নিজস্ব অবস্থান শক্তভাবে প্রতিস্থাপিত করে দেখাবে। আসলে বাঙ্গালী এইসব দিকে নিজের শক্তি কখনো খরচ করতেই চায়নি। 

তাহলে আজকে কেনো মুশতাক-তিশাকে বই মেলা থেকে বের হয়ে যেতে হলো ? বাঙ্গালীর কি তবে টনক নড়েছে ? বাঙ্গালী কি নারীর জীবনের সমস্যা আর অধিকার নিয়ে সচেতন হয়ে গেছে ? এবারে তবে বিস্তারিত প্রসঙ্গে আসি। 

সকলেই বলছে যে, মুশতাক-তিশাকে বই মেলা থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে বিষয়টিকে সেরকম মনে হলেও, আমার কাছে মনে হয়েছে কেউ তাদেরকে সটকে যেতে বলে থাকতে পারেন বলেই তারা সেইফ জোনে নিজেদেরকে সরিয়ে নিয়েছেন। তাদেরকে কেউ বের করে দেয়নি। 

বইমেলা আয়োজক কমিটির দায়িত্ব কী? মেলার নিরাপত্তা দেখছে কারা? একটা বইমেলায় পুলিশ বা সিকিউরিটি ইস্যুগুলো দেখবার দায়িত্ব কার ? মেলার সিসিটিভি ক্যামেরা কোথায় ? এই প্রশ্নগুলো কাকে করবো আমি ? 

বইমেলায় লেখকের ওপর হামলা, বোমা বিস্ফোরণ কিংবা নারী লাঞ্ছনা কি এই দেশের জন্যে কোন রূপকথার গল্প? তাহলে এতো গা ছাড়া আয়োজন কেনো এই বই মেলার? 
প্রথমেই প্রকাশকদের কথায় আসি। বাংলা একাডেমির সদস্য হোক বা না হোক, বইমেলায় স্টল দিতে হলে তো কিছু প্রটোকল মেইনটেইন করতে হয়! একটা প্রকাশনী বই বের করবার জন্যে লেখা নির্বাচন করে কিসের ওপর ভিত্তি করে? সেরা প্রচ্ছদ, সেরা বিক্রিত বই, সেরা লেখা- এসবের জন্যে যেমন পুরস্কার দেয়া হয় তেমনি বিভ্রান্তি ছড়ানো, ব্যবসা চিন্তা আর মানহীন লেখা প্রকাশের জন্যেও তেমনি একটি প্রকাশনীকে জরিমানা কিংবা মেলায় স্টল দেয়াটা এক দু তিন বছরের জন্যে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে তাদেরকে শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা কি থাকা উচিত নয় ? 

মোশতাক আর তিশার বই বের হতেই পারে! কিন্তু প্রকাশক করলোটা কী? তারা কেনো কেবলমাত্র টাকার বিনিময়ে বই ছেপে দিলো? শর্ত ভঙ্গ করে মেলায় বই বের করার জন্য, মার্কেটিং করার জন্যে শাস্তি তো তাদের হওয়া উচিত! 

যারা মোশতাক-তিশাকে তিরস্কার করছিলো, তারা আসলে কারা? পাঠক? নাকি কারো প্রেরিত অরাজকতা সৃষ্টিকারী? এইসব গণ্ডগোল মেলার মধ্যে হয় কী করে ? পুলিশ প্রশাসন তখন কোথায় ছিলো? পাঠক নয় এমন লোকজন দিয়ে মেলা ভরে যায়। এটা আমরা সবাই জানি। নইলে মেলায় মেয়েদের ওড়না ধরে টান দিতো না কেউ। গায়ে হাত দিতো না। কিংবা গাঁজা নিয়ে বসতো না কোন কোণায়। কথা সেটা নয়, কথা হচ্ছে এইসব দেখার দায়িত্বে যারা, তারা কী ছিঁড়ছেন? 

এবারে আসল কথায় আসি। মোশতাক তিশা বিয়ে করেছেন। খুব ভালো কাজ। প্রেম শাশ^ত। বিয়ে পবিত্র। এই দেশের জাগের নানারা সেটা বহু আগে থেকেই প্রমাণ করে এসেছেন। বয়স তাদেরকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। কিন্তু তাতে বাঙালির কিঞ্চিৎ আপত্তি থাকলেও কোনকালে বাঙ্গালী তো আঙ্গুল তুলে তাদেরকে কিছু বলেনি! 

কিন্তু মোশতাক-তিশাকে কেনো বললো? আমাদের রেলমন্ত্রীও তো কমবয়স্ক একজনকে বিয়ে করেছিলেন। তাদের সন্তানও আছে। অনেকে  মজা করে কটূক্তি করলেও কই তাদের সম্মান নষ্ট হয় এরকম কোন কাজ তো বাঙ্গালী করেনি! 
বাঙ্গালীকে বাঙ্গালীর মতামতকে আমি খুব ভালোবাসি। কারণ, আমি জানি, ওদেরকে খোঁচা না দিলে ওরা কখনো খেঁকিয়ে ওঠে না। 

আজকে বিয়ের পরে মোশতাক তিশাও সংসার করতে পারতো। বলতে পারতো যে, বিষয়টা হয়ে গেছে হয়তো আল্লাহ্ চেয়েছেন। আপনারা দোয়া করবেন আমাদের জন্যে। কিন্তু না! তারা পাগল করেছে গান গাইলেন! তারা কোলে বসে ঢং করলেন। একে অপরকে খাইয়ে দিয়ে জনগণকে দেখাতে গেলেন। এখন কেউ নিজেকেই নিজেকে পাগল বলে যদি ঢলাঢলি জারি রাখে তাহলে তাদের সম্পর্ককে স্বাভাবিক সম্মান বাঙ্গালী করতে পারবে কি করে? বাঙ্গালী আর কিছু না বুঝলেও  সম্পর্ক নিয়ে ধান্দাবাজি তো বোঝে, তাই না? 

অনেকে বলবেন, পাশ্চাত্যের সব নকল করবে আর অন্য কারো সুগার ড্যাডি বা বয়সের পার্থক্য নিয়ে বিয়ে করে ভাইরাল হতে চাওয়াটা দেখলেই বাঙ্গালীর সহ্য হবে না! আসলে ব্যাপারটা তো সেটা নয়! বাঙ্গালী সব সহ্য করে। করেই আসছে। কিন্তু তাদের সহ্য ক্ষমতাকে তাচ্ছিল্য করাটা কখনো সহ্য করেনি। যদি করতো তাহলে আজকে এই বাংলাদেশ সৃষ্টি হতো না! এই দেশ পাশ্চাত্যের কোন দেশের দখলে থাকতো। 
যে কেউ যে কাউকে বিয়ে করতে পারে। বাঙ্গালীর তাতে আপত্তি নেই। যদিও এই মিডিয়ার যুগে মানুষের আঙ্গুল তোলাটা সহজ হয়েছে, থুথু দেওয়াটা জায়েজ হয়েছে কিন্তু একই সঙ্গে অমূলক বাহবারও জয়জয়কার হয়েছে, এটা তো অস্বীকার করা যাবে না! 

মোশতাক তিশাকে মেলায় যারা তিরস্কার করেছে, তারা মেলায় উড়ে আসেনি! তাদেরকে মেলায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী হিসেবে কেনো পুলিশ সরিয়ে দিলো না? এরকম পরিস্থিতি হলে তো একজন সত্যিকারের লেখকেরও মানহানি হবার সম্ভাবনা থাকছে মেলায়, সেটা দেখবার কেউ তো তাহলে থাকছে না! মেলায় কে থাকবে কে থাকবে না এটা যদি জনগণ সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে আইন কোথায়? 

এই দেশের মানুষ তো গণপিটুনি দিয়েও যত্রতত্র মানুষ মারে! মেলার মাঠে সেরকম কিছু হবে না, সেটারও তো কোন  গ্যারান্টি পাইনা! 

যাইহোক মোশতাক তিশাকে কেউ আসলে বের করে দেয়নি। ওরা চলে যাচ্ছিলো ঝামেলা দেখে। কারণ স্টলের সামনে ভিড় বাড়ছিলো। ক্রেতা আসতে পারছিলো না। আর সেই সময়ে কিছু নোংরা উৎসুক ছেলেপুলে যারা আমার মনে হয়েছে আদতে পাঠক নয়, তারা স্লোগান তুলে তুলে পেছন পেছন কিছুদূর গিয়ে তাদের বিকৃত আনন্দ ভোগ করেছে। যেটা প্রশাসনের দেখা ও ট্যাকল দেয়া উচিত ছিলো। ওদেরকে তো মেলায় কান চুলকাতে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়নি ! 

একটা বই বের হলে প্রচ্ছদের কিছু নিয়ম মেনে বের করতে হয়। যে বই নিয়ে এতো কথা প্রচ্ছদের মান বিচারে সেটা কতটা মানসম্পন্ন, সেটাও কিন্তু বিষয়। তবুও এই দেশে গরু ছাগল মেলায় বই বের করছে যখন আর মানুষও যখন তাদের লেখার জাবর নিজেরা কাটছে, তাহলে আর দোষ দেবো কাকে! দোষ তো আমাদেরই। 

শুধু বলবো, জাগের নানা তার বাচ্চা বউ নিয়ে সংসার করলে করুক। সং সেজে সার এর ব্যবসা করে অধিক ফসলের লোভ করতে গেলেই সমস্যা হবে। আর মানুষ সমস্যা দেখলেই সুযোগ নেয়। বাঙ্গালী বলে কোন কথা নেই, এই বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর সকল জায়গার সকল মানুষের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়