গরীব নেওয়াজ: আমি যদি নিজেকে প্রশ্ন করি আমি কে, তাহলে তার উত্তর হবে, আমার জীবনের স্মৃতিই আমি। আমার স্মৃতি না থাকলে আমার অস্তিত্বই নেই, নিজস্ব কোনো সত্তা নেই। আপনার বেলায়তাই। প্রত্যেকটি মানুষের জীবনের স্মৃতি পৃথক। দুই জনের স্মৃতি এক হতে পারে না। একজনের নিজস্ব পরিবেশ, পরিস্থিতি, কর্মকাণ্ড, অভিজ্ঞতা, লেখাপড়া, চিন্তাভাবনা, ধারণ ক্ষমতা ইত্যাদি সবকিছু মিলে তার মস্তিষ্কে নিজস্ব এক স্মৃতি ভান্ডার গড়ে তোলে। এই স্মৃতিই একজনকে অন্যজন হতে পৃথক করে। এর ফলে যমজ হয়ে জন্ম নেওয়া দুইজনের স্মৃতিও এক হতে পারে না। তাই তারা ভিন্ন দুই জন মানুষ। এমনকি আজকের আপনি আর দশ বছর আগের আপনিও সম্পূর্ণ এক মানুষ না। আজকের আপনি আর দশ বছর পরের আপনিও সম্পূর্ণ এক মানুষ থাকবেন না। কারণ দশ বছরে অনেক নতুন স্মৃতি যুক্ত হয়ে একজনকে অনেক পরিবর্তন করে ফেলে।
আপনার শরীরের একটি কোষ (স্টেম সেল) যা আপনি আপনার বাবা-মা হতে পেয়েছেন, তা ক্লোন করে যদি আর একজন সৃষ্টি করা হয়, তবে যে হবে সে আপনার বাবা-মা হতে আপনার পাওয়া একই দেহ-সংগঠনের অধিকারী হবে। সে আপনার ভাইও হবে না, ছেলেও হবে না। সে আপনি আপনার বাবা-মা থেকে যে দেহ পেয়েছেন সেই একই দেহ-সংগঠনের অধিকারী হবে। কিন্তু ভিন্ন পরিবেশ ও অভিজ্ঞতায় বেড়ে ওঠায় তার স্মৃতি আপনার থেকে ভিন্ন হবে এবং সে এক ভিন্ন মানুষ হয়ে উঠবে। এক দেহ-সংগঠনের অধিকারী হয়েও সে এক ভিন্ন ব্যক্তিত্ব।
আপনার এই স্মৃতি যা আপনার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান বহন করে তা আপনার আচরণ ও কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। একজন মানুষ যদি শিশুকাল হতে বনজঙ্গলে পশু সমাজে লালিত-পালিত হয়, তাহলে তার যে স্মৃতি গড়ে উঠবে তার অভিজ্ঞতায় সে মানুষের মতো নয় অনেকটা পশুর মতোই আচরণ করবে। জিনগত কার্যক্রম খুব সামান্য ভূমিকাই রাখবে। তবে তাকে মনুষ্য সমাজে নিয়ে আসলে নতুন স্মৃতিতে জিনগত কারণে অতিদ্রুত মানুষের আচরণ রপ্ত করবে। যদি কোনো সময় দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে আপনার মস্তিষ্কের স্মৃতি মুছে যায়, বা ইলেট্রো-ম্যাগনেটিক পাওয়ার দিয়ে মুছে দেওয়া হয়, তাহলে যে থাকবে সে মানুষ আপনি নয়। স্মৃতি মুছে যাওয়ার পর তার জীবন চলতে থাকলে সেই নতুন জীবনের স্মৃতি নিয়ে সে এক নতুন মানুষে পরিণত হবে। তবে শুনেছি, একজন মানুষ স্মৃতি হারালেও নাকি সে তার ভাষা ভোলে না। তাই বলছিলাম, আমার জীবনের স্মৃতিই আমি, আপনার জীবনের স্মৃতিই আপনি। স্মৃতির বাইরে আপনার আমার নিজ বলে আর কোনো অস্তিত্ব নেই। ফেসবুক থেকে