শিরোনাম
◈ এখনই কারফিউ তুলে নেয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ আজ রাতের মধ্যেই ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালুর চেষ্টা চলছে: জুনাইদ আহমেদ পলক ◈ হুতি-ইসরাইল মধ্যে উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যে বড় যুদ্ধের শঙ্কা ◈ চলমান সহিংসতা ক্ষতির মুখে রফতানি আয়, যা বললেন অর্থনীতিবিদরা ◈ দুর্যোগ ভবনে চালানো তাণ্ডবে ‘পুড়েছে ৫৩ গাড়িসহ মূল্যবান জিনিসপত্র’ ◈ প্রেসিডেন্ট পদের দৌড় থেকে সরে দাঁড়ালেন বাইডেন, কামালা হ্যারিসের নাম প্রস্তাব ◈ বাড়তে পারে সাধারণ ছুটি, তৃতীয় দিনের মত কারফিউ চলছে ◈ শীর্ষ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ◈ ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় আটকে পড়েছে মানুষের জীবন-জীবিকাও ◈ আমির খসরু মাহমুদ, নিপুণ রায় ও নুরুল হক পাঁচ দিনের রিমান্ডে

প্রকাশিত : ০৮ জুন, ২০২৩, ১২:৩৮ রাত
আপডেট : ০৮ জুন, ২০২৩, ১২:৩৮ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আয়, ব্যয় সংকোচ এবং পুষ্টি কথা

আহসান হাবিব

আহসান হাবিব: [১] আমার এখন অনুসন্ধানের বিষয় একটাইÑ বস্তুগত প্রয়োজন আর কতোটা নিম্নে কমিয়ে আনলে আত্মহত্যার বিকল্পে টিকে থাকা সম্ভব? প্রথমেই মনে হলো আমার একলা থাকার জন্য এই এতো বড় বাসার দরকার নাই। এই প্রথম বাসাটিকে মনে হলো খুব বেশি অতিরিক্ত। অবশ্য বাসা বলতেই আমার নেদারল্যান্ডসের এক যুবকের কথা মনে পড়ে যায়। কয়েক বছর আগে আমার এক বন্ধু রাত্রি যাপনের জন্য এই বিদেশিকে আমার বাসায় এনেছিলেন। 

ছেলেটির নাম ম্যাক। সে আসলো। ছিপছিপে গড়নের লম্বা ছেলেটির সঙ্গে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভাব হয়ে গেলো। এটার অন্যতম কারণ ম্যাক একজন গায়ক, শুধু গায়ক নয় একজন মিউজিশিয়ান। সে গান গাইলো, হারমোনিয়াম বাজালো, তবলায় বোল তুললো। আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। কথা প্রসঙ্গে জানলাম সে মিউজিকে লেখাপড়া করেছে, দেশে তার একটা ব্যান্ড আছে। একসময় তাকে জিজ্ঞেস করলাম নেদারল্যান্ডসের কোথায় তার বাসা?

বললো, ‘আমি হোমলেস’। ‘মানে?’ ‘আমার নিজের কোন বাসা নেই, আমি পৃথিবী ঘুরে বেড়াই, যেখানে থাকি, সেটাই আমার বাসা’। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম তেইশ চব্বিশ বছরের একটা তরুণের দিকে। ঘুমুবার আগে বললাম, ‘তুমি আমার বিছানায় শোও’।  সে মাথা নেড়ে বললো, ‘না না, আমার বিছানা আছে।’ দেখলাম সে একটা ভাঁজ করা কিছু একটা বের করলো, দেখলাম একটা ছোট্ট বিছানা। সে সেটা মেঝেতে বিছিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লো। বিছানায় দেখলাম একটা মশারিও সেট করা আছে। একজন মানুষ ঠিক যতটা জায়গা দখল করে, তার বিছানার সাইজ ঠিক ততোটা। তখন আমার চার রুমের এই ছোট্ট বাসাটিকে মনে হলো প্রাসাদ!

[২] এখন আমি এই বাসাটি ছেড়ে দেবো। না, আমি হোমলেস হওয়ার ক্ষমতা রাখি না। সবাই এটা পারে না, দু’একজন পারে, যেমন ম্যাক পেরেছে। মনে মনে ম্যাককে স্যালুট জানালাম। বাসাটা ছেড়ে দেবো ভাবতেই কোনো এক আশঙ্কায় বুকটা ধড়াস করে উঠলো। পনের বছর ধরে আমি এই বাসাটায় বাস করছি। এর পেছনে যে ব্যয়, এতোদিন যেভাবেই হোক আমি চালিয়ে এসেছি ঠিকঠাক, এখন পারছি না। যদি টিকে থাকতে হয়, বাসাটা ছেড়ে এমন একটা ঠাঁই খুঁজতে হবে যার পেছনে ব্যয় হবে একজন মানুষের থাকার জন্য সর্বনিম্ন। অথচ আমি আশৈশব ভেবে এসেছি আমার নিজের একটি বাসা থাকবে। আহামারি কিছু নয়, সামান্যই, তবু মনে হবে বাসাটা আমার নিজের।

‘নিজের’Ñ এই বোধ কোথা থেকে জন্ম লয়, আমার বিস্ময় লাগে মাঝেমাঝে। এই পৃথিবী তো মুফতে পাওয়া ধন, কারো নিজের নয়, বরং যারা আছে তাদের সবার। কিন্তু আমি অচিরেই দেখতে পেলাম পৃথিবীটাকে মানুষ নিজের নিজের দখলে ভাগ বাটোয়ারা করে নিচ্ছে। কী সব কাগজের তৈরি দলিল দস্তাবেজে নিজেদের নাম ঠুকে বলছে ‘এই অংশ আমার’।

পৃথিবীটা এখন গুটিকয়েক লোকের সম্পত্তি। রাষ্ট্র নামের এক অদ্ভুত প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে যার একটা নির্দিষ্ট সীমানা আছে। কে এই সীমানা নির্ধারণ করেছে? মানুষ করেছে। এই সীমানা ভেদ করা যাবে না, করলেই বিপদ, কারাগার তার জন্য অপেক্ষা করছে। অথচ এই রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে কতো কসরত। কতো অস্ত্র, কতো লোকবল, কতো আইন, কতো প্রতিষ্ঠান। কতো খুন, কতো গুম, কতো কারাগার। এই যে রাষ্ট্রের নামে ভাগ বাটোয়ারা, এই নিয়ম কোথা থেকে এলো, কে বানালো? উত্তর একটাইÑ মানুষ বানিয়েছে, এরা নাকি ক্ষমতাবান। 

আমি বাসা খুঁজতে লাগলাম। এমন একটা বাসা, যেখানে শুধু একলা মানুষ সর্বনিম্ন খরচে থাকতে পারবে। বাসা ছাড়ার কথা মনে মনে ফাইনাল হয়ে গেলে অন্যান্য দিকে মনযোগ দিলাম। ততোক্ষণে খেয়াল করলাম বুকের উপর থেকে অনেক ভার কমে গেছে। বাসায় তাকিয়ে দেখলাম কোনো অতিরিক্ত আসবাবই নেই। অতিরিক্ত বলতে কিছু বইয়ের কথা মাথায় এলো। এগুলো অনাবশ্যক জায়গা দখল করে আছে। ভাবলাম, পঠিত সব বই বিক্রি করে দেবো। কিংবা কোনো লাইব্রেরিতে দিয়ে দেবো। যেই ভাবা সেই কাজ, ফেসবুকে একটা বিজ্ঞাপন ছেড়ে দিলাম, কিছু পুরনো বই সুলভে বিক্রি হবে, যোগাযোগ করুন: আবু রায়হান, ফোন নম্বর: ০১২৩৪৫৬৭৮৯! বিজ্ঞাপনটা দেওয়ার পর মনে হলো বুকের উপর থেকে বেশকিছু চাপ কমে গেলো।

প্রসঙ্গত বলে রাখি আমি প্রায় পাঁচ সাত বছর কোনো টিভি দেখি না। আর বছর তিনেক থেকে কোনো দৈনিক পত্রিকা বাসায় রাখি না। এই দুটো জিনিস বাদ দেওয়ার ফলে আমি বেশ কিছু অতিরিক্ত খরচের হাত থেকে বেঁচে গেছি। কিন্তু এখন তাতেও কুলাচ্ছে না, আরো ব্যয় সংকোচন করতে হবে। কারণ এখন আমার আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে। জানিয়ে রাখি আমি একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, বিষয় হচ্ছে পুষ্টি। আমি এই বিষয়ে মানুষকে স্বাস্থ্য সহায়তা দিয়ে থাকি। এতোদিন এই দিয়ে যৎসামান্য যা উপার্জন করতাম, এখন তা তলানিতে এসে ঠেকেছে। সুতরাং আমাকে জীবন টিকিয়ে রাখতে ব্যয় সংকোচনের কথা ভাবতে হচ্ছে।

পুষ্টির কথা যখন উঠলো, তখন এদিকে আমি হিসেব মেলাতে শুরু করলাম। প্রতিদিন আমি একটা ডিম খাই, এটি বাদ দিলে কি আমি পুষ্টিহীনতায় ভুগবো? মনে হলো- না, ডিম ছাড়াও চলবে। কতো কোটি কোটি লোক ডিম খায় না। এর বদলে একটু ডাল খেলেই চলে। আমি প্রত্যহ ডিম খাওয়ার অভ্যেস মেনু থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো আমার বুক থেকে বেশ কিছু ভার নেমে গেলো। দুপুরে এবং রাতে দুই টুকরো মাছ খেতাম, এখনো খাই। সঙ্গে একটা মিক্সড শব্জি এবং যেকোনো একটি শাক। কলমি শাক আমার খুব পছন্দ। ভাবলাম দুবেলা মাছের কী দরকার? এক বেলা, শুধু দুপুরে খেলেই তো হয়। বাদ দিয়ে দিলাম। তার বদলে আমার কাজের মেয়েটিকে বললাম, আজ থেকে ডাল রান্না করবা, একটু ঘন করে যাতে আমি দুবেলা খেতে পারি।  কেন, মামা, ডিম খাবেন না সকালে? না, আজ থেকে বাদ।

রুবী, আমার কাজের মেয়ে, আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলো। ডিম বাদ দিতেই আমার বুকের উপর থেকে অনেক ভার কমে গেলো। বাসায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ফ্রিজের দিকে চোখ গেলো। অনেক দিনের, প্রায় পনের বছরের। তার দিকে তাকিয়ে মনে হলো এটা বেশি বেশি। না থাকলে কি চলবে না? হিসেব করে দেখলাম যদি আমি প্রতিদিনের রান্না প্রতিদিন করে ফেলি, তাহলে ফ্রিজের কোন দরকারই নাই। আমি কি বিক্রির জন্য একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে ফেলবো? মন বললো- থাক, বরং বাসাটা বদল করার সময় এটা বিক্রি করে দেবো। ফ্রিজটা বিক্রি করে দেবো ভাবতেই আমার বুক থেকে অনেক ভার বন্যার পানির মত নেমে যেতে শুরু করলো। এখন আমার অনেক হালকা লাগছে। এরপরে বাসায় এমন কিছু দেখলাম না যা অতিরিক্ত। মনটা শান্ত হয়ে এলো। হারমোনিয়ামটা টেনে নিয়ে বসলাম। কয়েকদিন থেকে একটা গান তোলার চেষ্টা করছি: দিন যদি হলো অবসান। সেটাকে নিয়ে বসে পড়লাম।

[৩] কিন্তু গানটা কোনমতেই সুরে বসাতে পারছি না। তারার গা কোনমতেই গলায় লাগছে না, গলা ভেঙে যাচ্ছে। আমার মন খারাপ হয়ে গেলো। কেন এমন হচ্ছে? আমি তারার পঞ্চম ছুঁয়ে আসতে পারি খুব সহজেই। তাহলে কি আমার আস্থার অভাব ঘটে গেছে? হয়তো। হারমোনিয়াম থেকে উঠে পড়লাম। নতুন বাসা পাওয়ার কথা মাথায় ঠোকর মারতে লাগলো। আমি কি বাসা খুঁজতে বের হবো? এক রুমের বাসা কি পাওয়া যায় এই শহরে? নাকি মেসের কথা ভাববো? মেসের কথা ভাবতেই শরীর কেঁপে উঠলো! এতোদিনের অভ্যেস কি বদলাতে পারবো? কেন পারবে না? ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠলো। মানুষ পারে না এমন কিছু নেই। অভিযোজনই প্রাণের ধর্ম। প্রাণের ধর্ম, অভিযোজন কথাগুলি আমাকে অনেক শক্তি যোগালো। 

একটা ফোন এলো। ‘হ্যালো, আবু রায়হান বলছি’। ‘আমি স্বখাতসলিল, আপনার বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করছি। আমি কিছু বই কিনতে চাই’। ‘অনেক ধন্যবাদ। চলে আসুন’। ‘আপনার ঠিকানাটা বলুন, লিখে নিই’। আমার ঠিকানা বললাম, ‘বাসা নম্বর ২১, রোড নম্বর ৭, রূপনারানপুর’। ‘বাই দা ওয়ে, কী ধরনের বই আছে আপনার কাছে?’ ‘সাহিত্যের’। ‘ভেরি গুড। আমি আসছি’। ফোনটা রেখে দিলে আমি লক্ষ্য করলাম, আমার ভেতরে একটা ভালোলাগার ঢেউ ছলাৎ করে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো আমি কি তাহলে এক রুমের একটি বাসা চাই বলে একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে ফেলবো? মন বললো, সেটাই বেটার। একটা বিজ্ঞাপন ফেসবুকে ছেড়ে দিলাম।

[৪] সব মিলিয়ে আমার বেশ নির্ভার মনে হতে লাগলো। বিকেল বেলা কাজে বেরিয়ে রাস্তার দু’পাশে তাকিয়ে মনে মনে সক্রেটিসের সেই কথাটা আওড়াতে লাগলাম: হাউ মেনি থিংস আই ক্যান গো উইদাউট! যা দেখি সবকিছুকে অতিরিক্ত লাগে। এমনকি রাস্তার ধারে বসে থাকা হরেক রকম ফলের দোকানকে বিলাসিতা মনে হয়। কী দরকার এতো ফল খাওয়ার। সন্ধ্যা হতে না হতেই দোকানে দোকানে আলো জ্বলে ওঠে। অতিরিক্ত মনে হয়। কী দরকার এতো আলোর? অনেক কম আলোয় তো দিব্যি চলতে পারে। মানুষকে আমার অবিবেচক প্রাণী মনে হয়। এরা প্রয়োজনের এতো অতিরিক্ত ব্যবহার করে যে এদেরকে লোভী এবং ভোগবাদী লাগে। মানুষকে আমার বিশ্রী লাগতে শুরু করে। তার চেয়ে প্রকৃতির যে কোন প্রাণীকে আমার সঠিক মনে হয় যারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক কণাও ব্যবহার করে না। মাঝেমাঝেই আমার মনে হয় মানুষ প্রকৃতির ভুল চয়েস।

আমি যে শেষাবধি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবকিছু ছেঁটে ফেলতে চলেছি, এই ভাবনা আমার এক প্রকার সুখ দিতে শুরু করেছে। আমার অপারগতা কিংবা ব্যর্থতাকে কোন পাত্তাই দিতে ইচ্ছে করছে না, বরং এতোদিন কেন এই অতিরিক্ততা নিয়ে ছিলাম, এই নিয়ে একটু গ্লানিও উঁকি দিতে শুরু করেছে। আমার ভাল লাগছে। এখন আমি একটা ফোনের অপেক্ষা করছি যে ওপার থেকে বলবে: এক রুমের ভাড়া হবে, যেগাযোগ করুন। কাজ থেকে বাসায় ফিরে বাসাটার দিকে তাকালাম। আহা, কত প্রিয় এই স্থান, কত স্মৃতি, কত অভিজ্ঞতা! রাতে ঘুমুতে যাবার পর বালিশে মাথা রাখতেই কেন যেন চোখ থেকে জল গড়িয়ে এলো আর মনে পড়ে গেলো পনের বছর আগের সেই প্রথম রাতের ঘুমিয়ে পড়ার ক্ষণটির কথা। লেখক: ঔপন্যাসিক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়