শিরোনাম
◈ আওয়ামী লীগ সরকার অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর : প্রধানমন্ত্রী  ◈ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্রিফিংয়ে বিএনপির বেতনভুক্ত কেউ আছে: ড. হাছান মাহমুদ ◈ গাজীপুরে যুবককে গুলি করে হত্যা ◈ বাংলাদেশকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল যুক্তরাষ্ট্র ◈ সংবাদপত্রকে জনগুরুত্বপূর্ণ শিল্প ঘোষণা ও কর কমানোর দাবি ◈ সচিব পদে পদোন্নতি ও রদবদল ◈ হায়দরাবাদকে ৮ উইকেটে হারিয়ে ফাইনালে কলকাতা ◈ নেতানিয়াহু ও সিনওয়ারার বিরুদ্ধে আইসিসি’র গ্রেপ্তারি আবেদনে ফ্রান্সের সমর্থন  ◈ বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ডিউটি ফ্রি, কোটা ফ্রি সুবিধা অব্যাহত রাখবে অস্ট্রেলিয়া  ◈ বিএনপিসহ টিআইবির অপপ্রচারে ভোটার উপস্থিতি কমেছে: ওবায়দুল কাদের 

প্রকাশিত : ২৬ মে, ২০২৩, ০৩:৩৬ রাত
আপডেট : ২৬ মে, ২০২৩, ০৩:৩৬ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

‘ক্ষ্যাপাটে’ বিদ্রোহী কবিতা ও দুঃখু মিয়া

মনজুরুল হক

মনজুরুল হক: বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন ২৫ মে। ১৮৯৯ সালের ২৫ মে, ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, এতটুকু ইতিহাস। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র মনে করি সংগীত। তিনি যদি তাঁর ওই বিখ্যাত ‘ক্ষ্যাপাটে’ বিদ্রোহী কবিতা নাও লিখতেন তবুও তিনি গানের কথা আর সুরের জন্য শত শত বছর সমাদৃত হতেন। এতো গেলো আমার কথা। নজরুল পূর্ববঙ্গে ভীষণ ভীষণ জনপ্রিয়। বিশেষ করে মুসলিম সমাজে। তাঁকে, তাঁর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণার জন্য সরকারিভাবে এবং বেসরকারিভাবেও প্রচুর প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের নিরক্ষর মানুষটিও নজরুলকে চেনেন। কার্যত বাংলাদেশে নজরুল ‘কবি কিংবা সংগীত রচয়ীতা হিসাবে যতটা পরিচিত তার চেয়েও বেশি সমাদৃত ‘মুসলিম স্লাঘার রূপক হিসাবে’। সে কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁর সম্পর্কে বলতে গেলে তাঁকে ‘মুসলিম ভাবমানসের অগ্রদূত’ বানিয়ে দেওয়া হয়। অধিকাংশ সংবাদপত্রে তাঁকে এভাবে বর্ণনা করা হয়।

‘বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব এ কবি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ, দুই স্থানেই সমানভাবে সমাদৃত। তার কবিতায় বিদ্রোহী মনোভাবের কারণে তাকে বিদ্রোহী কবি বলে আখ্যায়িত করা হয়। পিতামহ কাজী আমিন উল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান এই বিদ্রেহী কবি। তার বাবা ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মাযারের খাদেম। নজরুলের তিন ভাইয়ের মধ্যে কনিষ্ঠ কাজী আলী হোসেন এবং দুই বোনের মধ্যে সবার বড় কাজী সাহেবজান ও কনিষ্ঠ উম্মে কুলসুম। কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম ছিলো ‘দুখু মিয়া’। নজরুল গ্রামের স্থানীয় মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন। মক্তবে কুরআন, ইসলাম ধর্ম, দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন শুরু করেন। ১৯০৮ সালে তার পিতার মৃত্যু হয়, তখন তার বয়স মাত্র নয় বছর। পিতার মৃত্যুর পর পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে তার শিশু জীবন বাধাগ্রস্ত হয় এবং মাত্র দশ বছর বয়সে জীবিকা অর্জনের জন্য কাজে নামতে হয় তাঁকে। এসময় নজরুল মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উক্ত মক্তবেই শিকতা শুরু করেন। একইসঙ্গে হাজি পালোয়ানের কবরের সেবক এবং মসজিদের মুয়াযযিন হিসেবে কাজ শুরু করেন। এইসব কাজের মাধ্যমে তিনি অল্প বয়সেই ইসলামের মৌলিক আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পান যা পরবর্তীকালে তার সাহিত্যকর্মে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। তিনিই বাংলা সাহিত্যে ইসলামী চেতনার চর্চা শুরু করেছেন বলা যায়। বিংশ শতাব্দীর বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। তাঁর কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে। অগ্নিবীণা হাতে তাঁর প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তাঁর প্রকাশ। যেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনই জীবনে ও কাজেও ‘বিদ্রোহী কবি’।

অথচ আঠারো-উনিস বছর বয়সে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কেন যোগ দিলেন, কেন প্রকাশক আলী আকবর খানের সঙ্গে কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে আসেন এবং প্রমীলা দেবীর সঙ্গে প্রণয় পরবর্তী বিয়ে করেন এবং কাবিনে নজরুলের ঘর জামাই থাকার শর্ত নিয়ে বিরোধে বাসর সম্পন্ন হবার আগেই নার্গিসকে রেখে কুমিল্লা শহরে বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে চলে যান সেটা উহ্য থেকে যায়। আরও উহ্য থাকে তাঁর বিয়ে ঠিক হয়েছিলো আলী আকবর খানের ভগ্নী নার্গিস আসার খানমের সঙ্গে। একদিকে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন। সেই চাকরি ছেড়ে কাগজের সম্পাদনা করেছেন। এবং সে সময়েই ব্রিটিশবিরোধী লেখালিখি করেছেন। অথচ চাকরির প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলা হয়, ‘এসময় তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। প্রকাশ করেন বিদ্রোহী এবং ‘শেকল ভাঙার গান’ এর মতো কবিতা। জেলে বন্দী হওয়ার পর লেখেন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’। ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। বাংলা কাব্য তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এটি হলো ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল। এর পাশাপাশি তিনি অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামাসংগীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করেন। নজরুল প্রায় তিন হাজার গান রচনা এবং অধিকাংশে সুরারোপ করেছেন’। 

কিন্তু অদ্ভুতভাবে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে তিনি ‘পিক্স ডিজিজে’ আক্রান্ত হন। এর ফলে আমৃত্যু তাকে সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। একই সঙ্গে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। কেন এই রোগটি হয়েছিলো সে বিষয়ে গবেষকরা কী পেয়েছিলেন তা অজানাই থেকে যায়। এর পরের অধ্যায় বেশ চমকপ্রদ। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ১৯৭২ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকা আসেন। এসময় তাকে বাংলাদেশের জাতীয়তা প্রদান করা হয়। এখানেই তিনি ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। কেন তিনি বাংলাদেশের জাতীয়তা গ্রহণ করলেন? ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কী তিনি অচ্ছুৎ ছিলেন? অবহিলিত? মোটেও নয়। এ সময় তাঁকে অনুরোধের ঢেঁকি গিলতে হয়। একটি ‘ভিন্ন দেশের’ নাগরিকত্ব নিলে জন্মভূমির নাগরিকত্ব থাকে না এটা কি তিনি জানতেন না? নিশ্চয়ই জানতেন।

নজরুলকে নিয়ে কাটমোল্লা আর কাটমোল্লা গোছের আম পাবলিকদের ভেতরে ঠেসেঠুসে বেশ কিছু মিথ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার অন্যতম, ‘নজরুলের খ্যাতির দাপটে রবীন্দ্রনাথ পরশ্রীকাতর হয়েছিলেন’। এর পরে বিষ-টিশ ইত্যাদি ক্লিশে সব কথাবার্তা। যেমন ‘নজরুলেরই নোবেল পাওয়ার কথা ছিলো, সেটা রবীন্দ্রনাথ ছিনিয়ে নিয়েছে’। যদিও এসব তৃতীয় শ্রেণির কথা নজরুল নিজে কখনও ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি। কেননা রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির সময়ে নজরুলের বয়স মাত্র ১৪ বছর। এবং নজরুল নিজেও জেনেছেন কবিগুরু তাঁকে কতটা স্নেহ করেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নজরুলের অভ্যুদয়কে এই বলে স্বাগত জানিয়েছিলেন, ‘আয় চলে আয়রে ধূমকেতু, আঁধারে বাধ অগ্নিসেতু’।

নজরুল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ধূমকেতুর মতো আঘাত হেনে জাগিয়ে দিয়েছিলেন ভারতবাসীকে। তাঁর কবিতা, গান, উপন্যাসসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পরাধীন ভারতে বিশেষ করে অবিভক্ত বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা, সামন্তবাদ, সাম্রাজ্য ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ও সোচ্চার কণ্ঠ ছিলেন। সে কারণে ইংরেজ সরকার তার গ্রন্থ ও রচনা বাজেয়াপ্ত করেছে এবং কারাদণ্ড দিয়েছে। কারাগারে নজরুল টানা ৪০ দিন অনশন করে বিদেশী সরকারের জেলজুলুমের প্রতিবাদ করেছিলেন। এই কথাগুলোও বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে তেমন একটা প্রচার পায় না। আমি কবিতাটবিতা পারি না। তাই তাঁরই কবিতা দিয়ে জন্মদিনের শুভাশিষ জানাই।

 মোর ঘুম ঘোরে এলে মনোহর/নমো নম, নমো নম, নমো নম/শ্রাবণ-মেঘে নাচে নটবর/রমঝম, ঝমঝম, রমঝম...। কাজী নজরুলের জন্মদিনে এই এতটুকুই শ্রদ্ধার্ঘ। কেননা আমরা এমন একটা সময়ে বসবাস করছি যেখানে, ‘আমি দুর্বার, আমি ভেঙ্গে করি সব চুরমার। আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল, আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল। আমি মানি না কো কোন আইন’...। বলার পরিস্থিতি নেই। এসব লিখলেই সরকারের খোল, নলচে, কড়ে-বর্গা সব নড়ে উঠবে। লাগু হবে নির্বতনমূলক ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’।

আমরা এখন তীব্র এক অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছি আর ভাবছি নীচে কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই তল আছে। নজরুলকে এই সময়ে এখানে এনে ফেললে এক মুহূর্তও থাকতেন না। এমন বিষ-বাস্প ছড়ানো আবহাওয়া তাঁর মোটেও পছন্দ হতো না। একেবারেই না। অন্তত আমার কাছে সেরকম মনে হয়। লেখক ও ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়