দীপক চৌধুরী : বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও চলমান সামাজিক অবস্থায় অনেক সমস্যা এখনো সেই তিমিরেই চলছে। কোনটি জরুরি কিংবা কীভাবে কী করা হলে জনগণের কল্যাণ বয়ে আনবে তা যথাযথভাবে নিরূপন হয় না।
এদেশে ‘দুর্নীতি’ শব্দটি সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারিত হয় আমাদের মুখে। রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার আগে এর বিরুদ্ধে একটা ‘স্পীড’ থাকে আমাদের মধ্যে। অথচ ক্ষমতায় গিয়ে এটি আমাদের অনেকেরই তাড়ানোর চেষ্টা থাকে না।কিন্তু সেই স্পীড একটা সময় হারিয়ে যায়। অবশ্য আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ ব্যাপারে দারুণ মনোবলের সঙ্গে বলেছেন, ‘বিএনপি দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবে।’ এদেশের জনগণ এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে চায়, ভরসা রাখতে চায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর। আমাদের কৃষকরা সত্যিকারভাবেই অসহায়। আমরা জেনেছি, উত্তরাঞ্চলে ভয়ংকর অবস্থা বিরাজ করছে। সেচপাম্প কৃষিব্যবস্থার অন্যতম চালিকা শক্তি। কৃষকের কাছে সেচপাম্প না থাকা মানে খাদ্যনিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। কুষ্টিয়ায় একের পর এক সেচপাম্পের ট্রান্সফরমার চুরি হলেও অপরাধীরা ধরা পড়ছে না, উল্টো চুরি যাওয়া যন্ত্রের বিপুল আর্থিক দায় চাপানো হচ্ছে নিরীহ কৃষকের ঘাড়ে। এ থেকে কবে মুক্তি পাবে কৃষকরা?
সুনামগঞ্জ জেলার ১২টি উপজেলার সম্মানিত কৃষক ভাই ও স্থানীয় সর্বসাধারণের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, চলমান মৌসুমি বৃষ্টিপাত আমাদের প্রধান ফসল বোরো ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফসল রক্ষা বাঁধগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিগত ও বর্তমান অর্থ বছরে নির্মিত এই বাঁধগুলোই আগাম বন্যার হাত থেকে আমাদের ফসল রক্ষার প্রধান হাতিয়ার।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসন স্থানীয় কৃষকদের ব্যাপওে বেশ জাগ্রত বলেই মনে হচ্ছে। প্রশাসন বলছে, কিছু বৃষ্টির কারণে বা অন্য কোনো কারণে যদি কোনো বাঁধে ফাটল, ধস বা যেকোনো ধরনের নির্মাণ ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়, তবে দেরি না করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অথবা পানি উন্নয়নের সহকারী প্রকৌশলীকে জানানোর জন্য বিনীত অনুরোধ করা হচ্ছে।
আপনার একটি সচেতন তথ্য আমাদের হাজার হাজার কৃষকের কষ্টার্জিত ফসল রক্ষা করতে পারে। এ বিষয়ে কোনো বিশেষ সংবাদ বা তথ্য সরাসরি জেলা প্রশাসনকে জানাতে বা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। হাওরের ফসল আমাদের জীবন-জীবিকার একমাত্র মাধ্যম বা আশ্রয়। কিন্তু নিরীহ কৃষকদের নিয়ে যারা মসকরা করেন তাদের মানুষ অপছন্দ করে, ঘৃণা করে। এবছর অসমের প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। পানি প্রবাহের সুযোগ না থাকায় সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ , মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা এব এলাকার মানুষ এখন চোখে সরিষাফুল দেখেছেন।
কয়েকবছর আগের কথা। সাবেক এক মন্ত্রী আমাদের সুনামগঞ্জে গিয়েছিলেন। কৃষকদের কষ্টের কথা না শুনে তিনি ভ-দের কথাকে গুরুত্ব দিলেন। দুর্নীতিবাজদের কথা শুনলেন মন ভরে। কী অবাক করা কা-। এবং ওরাই ছিল সেই গুণধর মন্ত্রীর চারপাশে। উপস্থিত কৃষকরা কান্না করেছেন আর অভিশাপ দিয়েছেন। যাক, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জে ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুরে হাওড়ের বিভিন্ন ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি।
মন্ত্রী বলেন, হাওড়ে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির কারণে যেন সরকারের বদনাম না হয় সেজন্য সরকার জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক কর্মী ও নাগরিকদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি। এসব কথায় খুব কাজ হবে। উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী। সমস্যার গভীরে যান। গৎবাঁধা কথা বলে যেভাবে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা অভ্যস্ত এ্যানি ছিলেন এর উল্টো। প্রাক্তন তেজস্বী ছাত্রনেতা ও মেধাবী ছাত্র এ্যানি সবসময় অন্যায়ের বিরোধিতাকারী বলিষ্ঠ এক নেতা হিসেবে পরিচিত। কৃষকরা যেমন তাদের অভিযোগগুলো জানাতে পেরেছেন তেমনি মন্ত্রীও তাদের সমস্যার গভীরে গেছেন। মন্ত্রী মো. শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির ভাষ্য, ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে হাওড়ের ফসলের সুরক্ষা দিয়ে আসছে সরকার। বিগত সময়ে বাঁধ নির্মাণ কাজে অনিময় দুর্নীতি হয়েছে। বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে সচেষ্ট রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাঁধ নির্মাণ কাজ পরদর্শন করা হচ্ছে। তিনি নিয়মিত হাওড়াঞ্চলের খোঁজখবর রাখছেন।
নদী ও খাল খননের ব্যাপারে পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, সরকার খাল ও নদী খননের ব্যাপারে সচেষ্ট রয়েছে। ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে খনন কাজ করা হবে। সরকারে এসব কাজে পাহারাদারের ভূমিকায় থাকবে বলে জানান তিনি। সবচেয়ে বড়কথা হচ্ছে, এলাকার সাধারণ কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন মন্ত্রী। তিনি তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেন এবং বাঁধের কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে পানি উন্নয়ন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন। সাধারণ মানুষ এ ধরনের ব্যক্তিকেই নেতা মানতে চায়, মন্ত্রী মানতে চায়। যাদের কাছে শয়তান শ্রেণির ঠিকাদার প্রশ্রয় পায় না। এ সময় উপস্থিত ছিলেন- সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন, সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল, সুনামগঞ্জের-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজামান কামরুলসহ জেলা-উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এবং পানি উন্নয়ন বোডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যনিয়ন্ত্রক। ইতিহাসে এর বহু নজির আছে। বাংলাদেশের চোখের সামনে রয়েছে বহু বড়বড় উদাহরণ। কেউ মানুক বা না মানুক এটা অস্বীকারের উপায় নেই। ইতিহাস ঘেটে বোঝা যাবে রাজনীতি, সমাজনীতিতে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে পরিবর্তন তার নিজের গতিপথে পরিভ্রমণ করে থাকে। তবে যে পরিবর্তন স্বাভাবিক তা মানুষ মেনে নেয়। অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন বা বিনাশ মেনে নেয় না জনগণ। পরিবর্তনের সূচনা কীভাবে হয়ে থাকে? তা আগে জনগণ কিছুটা আন্দাজ-অনুমান করতে পারে। এটি ব্যক্তির হোক বা সমাজের এমনকি রাষ্ট্রের হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যনিয়ন্ত্রক, পরিণতি নিয়ন্ত্রক। গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব জীবনে ভূমিকা রাখলেও মানুষ নিজেই তার সিদ্ধান্ত ও কর্মই চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করে। আমি সেদিকে যাচ্ছি না। তবে এটা প্রমাণিত যে, সাহস, ধৈর্য ও সঠিক মানসিকতা আপনাকে যেকোনো পরিস্থিতিতে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। অত্যন্ত সময়োপযোগী প্রশ্ন, অন্যকে দোষারুপ করার সংস্কৃতি থেকে আমরা কী বেরোতে পেরেছি? পারিনি। সুতরাং আসুন, নিজের পায়ে নিজে কুড়াল না মারি। চট্টগ্রামের পোলোগ্রাউন্ডে বিএনপির নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘আজ দেশের জনগণ যদি বিএনপির পাশে থাকে, ইনশাআল্লাহ আগামী দিন আমরা একইভাবে কঠোর হস্তে দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করব, যেন দেশের সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ যেন নির্বিঘেœ জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।’
সেদিন তারেক রহমান আরো বলেছিলেন, ক্ষমতায় গেলে তাঁর দল দুর্নীতি দমন করবে এবং কঠোরভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করবে। তাঁর মতে, পরিষ্কারভাবে বলে দিতে চাই, আমরা যেসব পরিকল্পনা নিয়েছি, সেসব পরিকল্পনার মধ্যে কেউ যদি আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বা দুর্নীতির মাধ্যমে সেগুলোকে বাধাগ্রস্ত করে, তাদের কোনো ছাড় আমরা দেবো না।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও বলেছেন, ‘আমরা যতই পরিকল্পনা নিই না কেন, একটি বিষয়ে যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ না করি, তাহলে আমাদের কোনো পরিকল্পনা সফল হবে না। কী সেটি? সেই বিষয়টাও বিএনপি অতীতে প্রমাণ করেছে, একমাত্র বিএনপির পক্ষেই সম্ভব সেই বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সেটি হল দুর্নীতি। যেকোনো মূল্যে আগামীতে বিএনপি দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবে।’
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম এক মাসের (ফেব্রুয়ারি-মার্চ, ২০২৬) কর্মকা- ও গৃহীত পদক্ষেপের ভিত্তিতে বলা যায়, তিনি প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, কৃষিখাতে ভর্তুকি, এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে দ্রুত সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। কর্মস্পৃহা ও সংস্কারমুখী পদক্ষেপগুলোর কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছেন, যদিও পূর্ণাঙ্গ সুশাসন চালুর কথা আমরা বলব তখনই যখন এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা হবে।
দ্রুত সংস্কার ও পদক্ষেপ নিচ্ছে তাঁর সরকার। এ সরকার গঠনের প্রথম ২৮ দিনে ২৮টি বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে পরিবার কার্ড, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী, এবং ত্রাণ বিতরণ উল্লেখযোগ্য। কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে জোর দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে এবং পহেলা বৈশাখ থেকে 'ফার্মার কার্ড' চালু করা ।
কর্মসংস্কৃতিতে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তার কথা ভাবা হচ্ছে। খালখনন কর্মসূচি এবং অস্বচ্ছল পরিবারের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা শক্তিশালী করা হচ্ছে। উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষা খাতের কথা যদি বলি তবে শুরুতেই বলব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পুনরায় ভর্তি ফি এবং লটারি বাতিল, এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বিনা জামানতে ব্যাংক গ্যারান্টির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপরিচালনাকারীদের এটা মনে ও রাখতে হবে। মানুষ সবসময় সজাগ। জনগণ এখন অনেক বেশি জাগ্রত।
জনগণ প্রত্যাশা করে যে, এই সংস্কারমূলক উদ্যোগগুলো দুর্নীতিরোধ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে, যা একটি পূর্ণাঙ্গ সুশাসিত রাষ্ট্র গড়তে সাহায্য করবে যা চান আমাদের প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং লক্ষ্য নিয়ে এ সরকারকে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করতে হবে এখন থেকেই।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও ফিল্মমেকার