শিরোনাম
◈ এবার ইসরাইলের প্রতি সহায়তা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জার্মানি ◈ ঈদের ছুটিতে পর্যটনে প্রাণচাঞ্চল্য ◈ শর্ত সাপেক্ষে পা‌কিস্তান সুপার লি‌গে খেলার এনওসি পেলেন মুস্তাফিজ-রিশাদরা ◈ শেষ দিনে ফাঁকা স্টেশন, অর্ধেক যাত্রী নিয়ে ছেড়েছে ট্রেন ◈ ২৭ মার্চ গুয়াতেমালার বিপক্ষে শেষ প্রস্তু‌তি ম‌্যাচ খেল‌বে আর্জেন্টিনা ◈ শেখ হাসিনা-ওবায়দুল কাদেরসহ ১২৪ জনের দোষ পায়নি পুলিশ ◈ আজ সৌদিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদযাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর ◈ শুধু ট্রাম্পই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন: জাপানের প্রধানমন্ত্রী ◈ ট্রাম্পের অনুরোধে ইরানের সাউথ পার্সে আর হামলা নয়: নেতানিয়াহু ◈ কাতারের এলএনজি স্থাপনায় ক্ষতি: বিদ্যুৎ সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশসহ তিন দেশ

প্রকাশিত : ২০ মার্চ, ২০২৬, ১০:৩২ দুপুর
আপডেট : ২০ মার্চ, ২০২৬, ১২:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নিরাপত্তাহীন ঈদ যাত্রা, দেশের পরিবহন ব্যবস্থার করুণ বাস্তবতা

বাংলাদেশের সড়ক, নৌ ও রেল এই তিনটি খাতেই চলছে দীর্ঘদিনের নৈরাজ্য, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং দায়িত্বহীনতার এক ভয়াবহ সংস্কৃতি। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনা ঘটে, প্রাণ ঝরে, পরিবার ভেঙে যায়। অথচ এসব যেন আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যা কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না।

বিশেষ করে ঈদের সময় এই চিত্র আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। লাখো মানুষ যখন পরিবার-পরিজনের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নেয়, তখন দেশের পরিবহণ ব্যবস্থা যেন তাদের জন্য এক অনিশ্চয়তার ফাঁদ তৈরি করে। অতিরিক্ত ভাড়া, টিকিট সংকট, দালাল চক্র, চাঁদাবাজি, যানজট, দুর্ঘটনা সব মিলিয়ে ঈদের যাত্রা হয়ে ওঠে দুর্ভোগের মহাযাত্রা।

রাজধানী ঢাকার প্রধান পরিবহণ কেন্দ্রগুলোতে এই বিশৃঙ্খলার চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট। এবং এই স্থানগুলো যেন শৃঙ্খলার চেয়ে বিশৃঙ্খলার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এখানে যাত্রীদের দুর্ভোগ যেন অনিবার্য। টিকিট কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন, দালালদের দৌরাত্ম্য, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, পুলিশ ও প্রশাসনের নীরবতা সব মিলিয়ে একটি অসুস্থ ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে।

সড়ক পরিবহণের দিকে তাকালে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। বেপরোয়া গতি, অদক্ষ ও অশিক্ষিত চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগের অভাব এই পাঁচটি বিষয় একত্রে একটি মৃত্যুফাঁদ তৈরি করেছে। ঈদের সময় যখন যাত্রীর চাপ বেড়ে যায়, তখন এই ঝুঁকি আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। বাসগুলোতে গাদাগাদি করে যাত্রী তোলা হয়, ছাদে মানুষ বসানো হয়, এমনকি ট্রাক বা পিকআপেও যাত্রী বহন করা হয় যা সম্পূর্ণ অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ।

চালকদের একটি বড় অংশ যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই গাড়ি চালায়। অনেকেই মাদকাসক্ত অবস্থায় স্টিয়ারিং ধরে, আবার অনেকেই অতিরিক্ত ক্লান্ত অবস্থায় দীর্ঘ সময় গাড়ি চালায়। এর সাথে যুক্ত হয় প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা কে আগে যাবে, কে বেশি ট্রিপ দেবে। এই প্রতিযোগিতা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

চাঁদাবাজি এই খাতের আরেকটি বড় সমস্যা। দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে একাধিক স্থানে গাড়ি থামিয়ে অবৈধভাবে টাকা আদায় করা হয়। পরিবহণ শ্রমিক সংগঠন, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী কিংবা অসাধু প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এই চাঁদাবাজি পরিচালিত হয়। এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, ফলে ভাড়া বেড়ে যায় অস্বাভাবিকভাবে।

নৌ পরিবহণ খাতের অবস্থাও কম করুণ নয়। নদীমাতৃক দেশ হওয়া সত্ত্বেও এই খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চরম অবহেলা দেখা যায়। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, লাইফ জ্যাকেটের অভাব, জরাজীর্ণ লঞ্চ, দুর্বল তদারকি সব মিলিয়ে প্রতি বছরই ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। সম্প্রতি সদরঘাটে ঘটে যাওয়া লঞ্চ দুর্ঘটনা আবারও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এই খাত কতটা অনিরাপদ। এই ধরনের দুর্ঘটনা শুধু একটি ঘটনার নাম নয়; এটি একটি ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার প্রতীক।

রেল পরিবহণ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হলেও, এখানে রয়েছে অন্য ধরনের সমস্যা। টিকিট সংকট, কালোবাজারি, অনলাইন সিস্টেমের দুর্বলতা এবং সেবার নিম্নমান সব মিলিয়ে যাত্রীদের জন্য এটি একটি হতাশাজনক অভিজ্ঞতা। ঈদের সময় টিকিট পাওয়া যেন একপ্রকার যুদ্ধের মতো। সাধারণ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও টিকিট পায় না, অথচ দালালদের কাছে উচ্চমূল্যে টিকিট পাওয়া যায় সহজেই।

এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো দুর্নীতি। পরিবহণ খাতের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। লাইসেন্স প্রদান, ফিটনেস সার্টিফিকেট, রুট পারমিট, টিকিট বিক্রি সব ক্ষেত্রেই ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অযোগ্য চালকও ঘুষ দিয়ে লাইসেন্স পেয়ে যায়। ফিটনেসবিহীন যানবাহনও ঘুষের মাধ্যমে রাস্তায় নামার অনুমতি পায়। ফলে এই খাতটি পরিণত হয়েছে এক ধরনের ‘অনিয়মের বৈধ বাজারে’।

আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই এই বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান পরিবহণ খাতে। যতটুকু আইন রয়েছে, তা অনেক সময় প্রয়োগ না হয়ে বরং অপব্যবহার হয়। ট্রাফিক পুলিশের একটি অংশ ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে অপরাধকে বৈধতা দেয় এমন অভিযোগ নতুন নয়। ফলে অপরাধীরা শাস্তির ভয় পায় না, বরং আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

এই খাতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ থাকলেও, এর কোনো কার্যকর তদন্ত বা শাস্তির নজির খুব কমই দেখা যায়। আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা বিধি ও নীতিমালা অনুসরণের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। ফলে আমরা একটি ‘ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহণ সংস্কৃতি’র মধ্যে বসবাস করছি।

সবচেয়ে অবহেলিত বিষয়গুলোর একটি হলো মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য নিরাপদ ও সহজ যাতায়াতের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। বাস, ট্রেন বা লঞ্চে ওঠানামার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই, নেই সহায়ক কর্মী। ফলে এই জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক।

এখন প্রশ্ন হলো এই অবস্থার পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব?

প্রথমত, একটি সমন্বিত জাতীয় পরিবহণ নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে সড়ক, নৌ ও রেল তিনটি খাতকে একসাথে পরিকল্পনা করা হবে। বিচ্ছিন্নভাবে উন্নয়ন নয়, বরং সমন্বিত উন্নয়নই হতে পারে টেকসই সমাধান।

দ্বিতীয়ত, আইন প্রয়োগে কঠোরতা নিশ্চিত করতে হবে। ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অযোগ্য চালকদের রাস্তায় নামতে দেওয়া যাবে না।

তৃতীয়ত, চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া কঠোর করতে হবে। মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

চতুর্থত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা স্বচ্ছ করতে হবে, ট্রাফিক মনিটরিংয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।

পঞ্চমত, টার্মিনাল ও স্টেশনগুলো আধুনিকায়ন করতে হবে।  বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে।

ষষ্ঠত, নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে যা একটি মানবিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।

সবশেষে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এই খাতের সংস্কার করতে হলে শুধু পরিকল্পনা নয়, প্রয়োজন বাস্তবায়নের দৃঢ় ইচ্ছা। দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভেঙে ফেলতে হবে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া লঞ্চ দুর্ঘটনা আমাদের বিবেককে আবারও নাড়া দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমরা কি এই নাড়া থেকে কিছু শিখবো, নাকি আবারও ভুলে যাবো?

বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন মানুষের জীবনের বিনিময়ে না হয়। একটি নিরাপদ, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং মানবিক পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, প্রতি বছর ঈদের সময় একই শোকগাঁথা, একই মৃত্যুমিছিল আমাদের তাড়া করে ফিরবে।

এই নৈরাজ্যের অবসান হোক এটাই হোক আমাদের সম্মিলিত প্রত্যাশা।

আবুল কালাম আজাদ

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়