শাহাজাদা এমরান।। রাজনীতির মঞ্চে অনেকেই সুযোগের খোঁজে দল বদলান, নেতা পাল্টান, অবস্থান পাল্টান, সুবিধার পথে হাঁটেন। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন যারা বারবার বঞ্চিত হয়েও দল ছাড়েন না, নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারান না, নিজেদের ব্যক্তিগত কষ্টকে গোপন রেখে দলের সিদ্ধান্তকে মাথা পেতে নেন। কুমিল্লার রাজনীতিতে হাজী আমিন উর রশীদ ইয়াসিন ঠিক তেমনই এক বিরল নাম। তিনি হয়ে উঠছেন কুমিল্লার রাজনীতির বঞ্চনার প্রতিচ্ছবির নীলকন্ঠী হিসেবে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সাবেক এমপি হাজী ইয়াসিন রাজনীতিতে বারবার প্রতারিত হয়েছেন, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু তিনি কখনো বিএনপির সঙ্গে প্রতারণা করেননি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কিংবা দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান, কারও প্রতি তিনি অবিশ্বাস বা বিদ্রোহের পথ বেছে নেননি। হাজারো নেতাকর্মীর চোখে জল এনে, নিজে নিঃশব্দে চোখের পানি মুছেই তিনি দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ (সাবেক কুমিল্লা-৯) আসনের বিএনপির রাজনীতিতে হাজী ইয়াসিনের অবদান ইতিহাসের অংশ। যখন এই এলাকায় বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল দুর্বল, যখন কুমিল্লার বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান বেগম রাবেয়া চৌধুরী ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে এই আসনে জামানত হারিয়েছিলেন । ঠিক তখনই এই সদর দক্ষিণকে বিএনপির ঘাঁটি বানানোর জন্য ১৯৯৩ সালে তিনি রাবেয়া চৌধুরীর হাত ধরে বিএনপিতে যোগ দেন । সেই সময় দল গঠন, কর্মী সৃষ্টি এবং রাজপথে বিএনপির উপস্থিতি জানান দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি।দুই হাতে খরচ করেন অর্থ, শ্রম,মেধা আর ঘাম। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই সদর দক্ষিণ(সাবেক কুমিল্লা-৯ সংসদীয় আসন) বিএনপির ঘাঁটিতে পরিনত হয়।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট যখন সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে, তখন দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা প্রত্যাশা করেছিলেন দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা হাজী ইয়াসিন মনোনয়ন পাবেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম। জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে সদ্য যোগ দেওয়া মনিরুল হক চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, আর হাজী ইয়াসিনকে বঞ্চিত করা হয়। সেই বঞ্চনার ক্ষত আজও তার রাজনৈতিক জীবনের গভীরে দাগ কেটে আছে। চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই দাগ আরো গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। মাঝে কেটে গেছে ২৫ বছর। কিন্তু আবারো সেই মনোনয়ন বঞ্চিত হলেন সেই মনির চৌধুরীর কাছেই। আর বঞ্চিত করা প্রতিষ্ঠানটি হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি।
২০০১ সালে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েও হাজী ইয়াছিন দল ছাড়েননি। ক্ষোভকে শক্তিতে রূপান্তর করে গত প্রায় ১৭ বছর তিনি আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মামলা, হামলা, নির্যাতন সবকিছু সহ্য করেও বিএনপির পতাকা হাতে রাজপথে থেকেছেন। দুঃসময়ে কর্মীদের আগলে রেখেছেন, দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।
এবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। আবারও ধানের শীষের মনোনয়ন থেকে তিনি বঞ্চিত হন। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের ত্যাগী ও পরিক্ষিত নেতা হাজী ইয়াছিনের মনোনয়ন চলে যায় মনিরুল হক চৌধুরীর কাছে। স্বাভাবিকভাবেই হাজী ইয়াসিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত ছিল তার আত্মসম্মানের প্রশ্ন, তৃণমূল নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন।
কিন্তু এখানেই হাজী ইয়াসিন অন্যদের থেকে আলাদা। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুরোধে তিনি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। ব্যক্তিগত ক্ষোভ, রাজনৈতিক অধিকার সবকিছু একপাশে রেখে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। দলের স্বার্থকে তিনি নিজের চেয়েও বড় করে দেখেছেন।
শনিবারের (১৭ জানয়ারী) হাজী ইয়াসিন ও মনির চৌধুরীর একসঙ্গে থাকা একটি ছবি অনেক কিছু প্রমাণ করে দেয়। এটি প্রমাণ করে হাজী ইয়াসিন কখনো দলবদল করেননি, করেননি ষড়যন্ত্র। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন বিএনপির একজন বিশ্বস্ত সৈনিক হয়ে। দেখালেন দল ও জিয়া পরিবারের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা ও অকৃপণ বিশ^াস। তিনি দলের সম্পত্তি নন, সম্পদ হয়ে রইলেন।
প্রশ্ন থেকেই যায়, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি ও জিয়া পরিবারের জন্য হাজী ইয়াসিনের মতো ত্যাগ আর কয়জন স্বীকার করেছেন? কয়জন নেতা বারবার বঞ্চিত হয়েও দল ছাড়েননি? কয়জন নিজের চোখের পানি লুকিয়ে কর্মীদের চোখের পানি মুছিয়েছেন?
হাজী ইয়াসিনের এই ত্যাগ হয়তো এখন দৃশ্যমান পুরস্কার পায়নি। কিন্তু বিশ্বাস করা যায় মহান আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। হয়তো ভবিষ্যতে এমন কিছু তার জন্য অপেক্ষা করছে, যা আমরা সীমিত দৃষ্টিতে এখনো দেখতে পাচ্ছি না।
ভালো থাকবেন রাজনীতির মেঠোপথে বারবার হোঁচট খাওয়া বিএনপির দুঃসময়ের কান্ডারী হাজী আমিন উর রশীদ ইয়াসিন। আপনার এই নিঃশব্দ ত্যাগ রাজনীতির কোলাহলে হারিয়ে যাবে না। সময়ই একদিন সাক্ষ্য দেবে আপনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন বিএনপির ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হয়ে। বিশেষ করে কুমিল্লার বিএনপির রাজনীতিতে দলের আনুগত্যের প্রশ্নে আপোষহীন এক নেতার নাম হিসেবে আপনি যুগ থেকে যুগান্তরে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
লেখক : সম্পাদক,দৈনিক কুমিল্লার জমিন ও সাধারণ সম্পাদক,বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি কুমিল্লা জেলা।