শাহাজাদা এমরান: গত ১১ জুলাই শুক্রবার বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার মিডফোর্ডের যে ছবিটি ভাইরাল হয়েছে, তা দেখে গোটা বাংলাদেশের জনগণ মর্মাহত হয়েছে। আর রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। জাতি হিসেবে আমরা সভ্য কি না সে প্রশ্নও আজ উঠছে। বাংলাদেশের মানুষ কি এখনো আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগে ফিরে গিয়েছে কি না এটাও আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে।
ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে সোহাগ নামের এক ব্যবসায়ীকে কী নির্মম, নির্দয় ও নিষ্ঠুরতার সাথে হত্যা করা হয়েছে, সেই দৃশ্যটি একবারের বেশি দেখার হৃদপিণ্ড কতজনের আছে তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। নিজ বাসার সামনে বড় সিমেন্টের কণা দিয়ে থেতলিয়ে থেতলিয়ে হত্যা নিশ্চিত করা যে কতটুকু অসভ্যতার নিদর্শন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
একই দিনে আরো দুটি খবর আমাদেরকে শিহরিত করেছে। একটি হচ্ছে খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যুবদলের নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করার আগে মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য তার পায়ের রগও কেটে নেওয়া হয়। যদিও এর আগে সে অস্ত্র নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই ঘটনায় জামায়াত শিবিরকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছে জাতীয়তাবাদী যুবদল।
একই দিনে চাঁদপুরে মাওলানা নূরুর রহমানকে নামাজরত অবস্থায় পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। তার অপরাধ হলো, সে যে বিষয়ে জুম্মার খুতবায় বক্তব্য রেখেছে সে বিষয়টি বখাটে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে গিয়েছিল বলে। আমরা যে মানুষ, এটাই ভুলে গিয়েছিলাম এই তিনটি বিষয় বর্ণনা করতে গিয়ে।
১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছি। ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতন হওয়ার আগে শহীদ হয়েছেন ডা. মিলন ও নূর হোসেনসহ অসংখ্য মানুষ। আর সর্বশেষ ২০২৪-এর আন্দোলনে যা হয়েছে তা বিশ্বের ইতিহাসে অনেক যুগ পর্যন্ত বিরল হয়ে থাকবে। কারণ, কোন দেশের সরকার কোন দেশের ছাত্র আন্দোলন দমন করতে এত স্বল্প সময়ে প্রায় হাজারের উপর জীবন প্রদীপকে গুলি করে হত্যা করার ঘটনা আর হয়নি। হাজার হাজার ছাত্র জনতা এ আন্দোলনে আহত হয়েছে, বরণ করেছে পঙ্গুত্ব। এত রক্ত, এত ত্যাগ, এত জীবন বড্ড অসময়ে এভাবে বন্দুকের নলে ঝরে যাওয়ার পরেও এখন দেখছি আমরা মানুষ হলাম না। তাহলে আমরা আর সভ্য মানুষ হব কবে?
৫ আগস্ট কেন হয়েছিল? পতিত সরকার অন্যায়, নির্যাতন, নিপীড়ন করেছিল বলেই। বাক-স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল। আমাদের কণ্ঠরোধ করেছিল। ভোটের অধিকার পুরোপুরি কেড়ে নিয়েছিল। যে কারণে সারাদেশের মানুষ, গুটিকয়েক আওয়ামী লীগ সমর্থক ছাড়া টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ার সকল মানুষ আন্দোলনে নেমে এসেছিল রাজপথে। আর তাই ছাত্র জনতার লাল রক্তে রাজপথ হয়ে উঠেছিল রঞ্জিত।
৩৬ জুলাই বলি কিংবা ৫ আগস্ট বলি, আমরা কি এর পরিবর্তিত সময়ে এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? যে বাংলাদেশ ফিরে আসবে আবার পতিত শেখ হাসিনার কার্বন কপি হয়ে। নিশ্চয়ই না। আমরা এমন একটি সুন্দর ও সমুজ্জ্বল বাংলাদেশের প্রত্যাশা করেছিলাম, যে বাংলাদেশে অন্যায় থাকবে না, চাঁদাবাজি থাকবে না, প্রতিবাদকারীদের কণ্ঠরোধ করা হবে না, মত এবং পথ ভিন্ন হলেও প্রকাশের কোন বাধা থাকবে না। চাঁদাবাজি, দখল, টেন্ডারবাজি আর দেখতে হবে না। গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ফিরে আসবে। এবং আমরা একটি মননশীল, সৃজনশীল, অবক্ষয় ও অপসংস্কৃতিমুক্ত যুক্তিবাদী সমাজ বিনির্মাণ করতে পারব।
কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, ৫ আগস্টের পরে মানুষ যে যার স্বার্থে ইচ্ছামতো দেশটাকে ভোগ করে যাচ্ছে। নিজের মতো করে বন্দোবস্ত করে নিয়েছে দেশটাকে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি কেউ এই দায় এড়াতে পারবে না। আজ তো আওয়ামী লীগ নেই, তাহলে কী বলবেন বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নেতারা?
এই মুহূর্তে জুলাইকে আমরা স্মরণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। কিন্তু আমরা কি জুলাইকে ধারণ করতে পেরেছি? ১১ জুলাই কুমিল্লায় ছাত্ররা রক্ত দিয়েছে। সারাদেশের মানুষ প্রথমবারের মতো জানল কোটা বিরোধী আন্দোলন সরকার কঠোর হস্তে দমন করতে চাচ্ছে। ঢাকাসহ সারাদেশ গর্জে উঠলো—"কুমিল্লাতে গুলি কেন? প্রশাসন জবাব দে"।
১৮ জুলাই কুমিল্লার কোটবাড়ি বিশ্বরোডে স্মরণকালের ভয়াবহ আক্রমণের শিকার হলো ছাত্ররা। পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি একত্রে নিরস্ত্র কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উপর হায়েনার মতো হামলে পড়ল। সাথে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে যোগ দিল পতিত ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ। দাবি আদায়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ শিক্ষার্থীদের রক্তে লাল হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি বিশ্বরোড ও এর আশেপাশের এলাকা। মারাত্মক আহত শিক্ষার্থীদের বুক ফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠল কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাম্পাস। সেখানেও অনেক আহত শিক্ষার্থী তৎকালীন আওয়ামী লীগের গুণ্ডা-পান্ডাদের হাতে আক্রান্ত হয়েছিল।
আর ৩৪ জুলাই কিংবা ৩ আগস্ট কুমিল্লা মহানগরীর পুলিশ লাইনে মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ ও ছাত্রলীগ যেভাবে নির্দয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, হাইস্কুলের ছাত্রছাত্রীদের উপর কাপুরুষিতভাবে হায়েনার মতো হামলে পড়েছিল, সেই ঘটনার বর্ণনা দেওয়া সম্ভব না। শুধু এতটুকু বলতে পারি, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীও এমনভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন করেনি কোমলমতি নিরস্ত্র অসহায় শিক্ষার্থীদের উপর।
সেদিন পুলিশ লাইন ও রানীর বাজারের মাঝামাঝি অবস্থায় পড়ে আওয়ামী লীগের হাত থেকে বাঁচার জন্য যখন দ্বিকবিদিক ছুটাছুটি করছিল, চিৎকার করছিল তখন জীবন-মরণের ঝুঁকি নিয়ে আজকের এনসিপি নেত্রী হাফসা জাহানসহ ৮/১০ জন অসহায় ছাত্রীকে পিতৃস্নেহ দিয়ে দৈনিক আমাদের কুমিল্লা অফিসে আশ্রয় দিয়েছিলাম। শুধু তাই নয়, অন্যদের নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে বর্তমান এনসিপি নেত্রী হাফসা জাহানকে সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ইয়াসমীন রীমা আপার বাসায় পাঠিয়ে দেই। পরদিন সকালে তাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়। এ জন্য ৪ আগস্ট কত হুমকি আর ধমকি যে আমাকে হজম করতে হয়েছে তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন। আর “আঙ্কেল গেইটটা খোলেন” না— বহুল আলোচিত এই ঘটনাকে জীবনের বিনিময়ে ধারণ করেন টিম আমাদের কুমিল্লার রুবেল মজুমদার ও জাহিদ হাসান নাইম। মৃত্যুকে তারা সেদিন খুব কাছ থেকে দেখেছিলো।
কিন্তু ৫ আগস্টের এক বছরকে সামনে রেখে যখন সামগ্রিকভাবে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার হিসেব মিলাই তখন চোখে ধু-ধু অন্ধকার ছাড়া আর কিছু দেখি না। যদি ৫ আগস্টে সফল না হতো, তাহলে হয়তো আজ আমাকেও গুম কিংবা খুনকে আলিঙ্গন করতে হতো। ৫ আগস্ট সফল হওয়ার পরেও পরাজিত প্রেতাত্মাদের নীল বিষ আমাকে ক্ষতবিক্ষত করছে প্রতিনিয়ত।
কাদম্বিনীকে মরিয়া প্রমাণ করিতে হইয়াছে যে, সে সৎ ছিল। আমার আজকের অবস্থাও তার ব্যতিক্রম নয়।
আজ সবাই নতুন বন্দোবস্তের কথা বলছেন। শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত ও এনসিপি সবাই গাদ্দারি করছেন বলে। আপনাদের এই গাদ্দারি করার জন্য তো ৫ই আগস্ট আসেনি।
আরেকটি কথা বলি, অনেকে বলতে পারেন আমি বিএনপিকে ডিফেন্ড করছি কিনা। ৫ আগস্টের পর যত অন্যায় হয়েছে, টেন্ডারবাজি হয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে বিএনপি কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে, বহিষ্কার করেছে। একটি রাজনৈতিক দলের বহিষ্কারের বাইরে আর কিছু করার কি ক্ষমতা আছে? কারণ, বিএনপি তো সরকারে নেই। বিএনপির হাতে তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নেই। তাহলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা ছাড়া তারা আর কি করতে পারে?
সুতরাং উদোর পিণ্ডি বুধোর গাঁয়ে না চাপিয়ে। পরিষ্কার ভাষায় বলতে হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই দায় অবশ্যই সরকারকে নিতে হবে। কেন সরকার পারছে না তাও বলতে হবে। তবে অবশ্যই রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিও এর দায় থেকে মুক্ত থাকার কোন উপায় নেই।
দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সরকারের দায়িত্ব। সরকারের হাতে তো সেনাবাহিনী আছে, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি আছে, কিন্তু সরকার কি পারছে? এই দায় সরকারকেই বহন করতে হবে।
আমি মাননীয় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে অনুরোধ করে বলব, আমি আপনার পদত্যাগ দাবি করব না। কারণ, পদত্যাগ কোনো সমাধান নয়। তাই আমি আপনাকে অনুরোধ করব, এখন তো আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জামায়াত ক্ষমতায় নেই। তাহলে আপনার বাহিনী পারছে না কেন? পুলিশ কেন এক বছরের মধ্যেও স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করতে পারছে না? এর দায় তো আপনাদের। আপনারা কি করছেন? আপনারা এসির বাতাসে বসে বসে হাওয়া খাওয়ার জন্য তো ছাত্র-জনতা রক্ত দেয়নি। আপনারা তো কোমলমতি শিক্ষার্থীদের রক্তের উপর দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। রাতে যখন ঘুমাতে যান, মাননীয় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, রক্তের গন্ধ কি আপনার নাকে আসে না? আমাদের আসে।
আমি আর কাউকে দায় দিতে চাই না। আমি অনুরোধ করতে চাই, যারা চাঁদাবাজি করে তাদের পরিচয়—তারা কুলাঙ্গার চাঁদাবাজ। নর্দমার কিট। এই চাঁদাবাজদের কোনো বাপ-মা থাকতে পারে না। এই চাঁদাবাজদের কোনো দল, কোনো নেতা বা নেত্রী থাকতে পারে না। তাই চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে, দখলদারের বিরুদ্ধে আমাদের সম্মিলিতভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই মুহূর্তে এর কোন বিকল্প নেই। আর ঘরে বসে থাকার সময় নেই।
এই কুমিল্লায় যারা চাঁদাবাজি করেন, যে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা চাঁদাবাজি করেন আমি তাদেরকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি, আমাদের কলম আর থেমে থাকবে না। আপনাদেরকে এক বছর সময় দিয়েছি, আর না। এবার হয় চাঁদাবাজি বন্ধ করেন, নতুবা মিডিয়ার শিরোনাম হবেন।
আর যারা চাঁদা দেন তাদেরকে বলছি, অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে দুজনেই সমান দায়ী। আপনি চাঁদা না দিয়ে পুলিশকে জানান। পুলিশ যদি আপনার পক্ষে না দাঁড়ায়, মিডিয়া আপনার হয়ে দাঁড়াবে। চাঁদাবাজদের নির্মূল করতেই হবে।
এই হোক আমাদের দীপ্ত দৃঢ় শপথ
লেখক : সাংবাদিক, সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক। 01711-388308