শিরোনাম
◈ ৯৪ মিনিটে গোল, সুইসদের বিপক্ষে কাতারের অবিশ্বাস্য ড্র ◈ শান্তিচুক্তি সইয়ের সময়সূচি ঘোষণা ট্রাম্পের, ভিন্ন অবস্থানে ইরান ◈ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত হবে, লবণচাষীরা পাবেন ন্যায্যমূল্য ◈ বাংলাদেশকে স্বনির্ভর ও শিল্পোন্নত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: মির্জা ফখরুল ◈ ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল: অর্থনীতির জন্য কতটা ইতিবাচক? ◈ ক্রিকেটার নাঈমের শারী‌রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে চট্টগ্রামে গে‌লেন বিসিবির ফিজিওরা ◈ ব্রাজিলের এক‌টি গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মরক্কোর বিপক্ষে জয় চান না ◈ ইংল্যান্ড দ‌লের বল ও বুটসহ অ‌নেক অনুশীলন সরঞ্জাম চুরি ◈ সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে একটি করে গাছ লাগান: প্রধানমন্ত্রী ◈ বিপ্লবের পর বাস্তবতার মুখে বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা

প্রকাশিত : ০৯ মে, ২০২৪, ০৫:২০ সকাল
আপডেট : ০৯ মে, ২০২৪, ০৫:২০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মা লো মা, ঝি লো ঝি

ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল

ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল: গানটাতো সুন্দর। নিঃসন্দেহে সুন্দর। সারি গানের সুরের মধ্যে হাওর বাওড়ের যে জলজ ঘ্রাণ আর ঢেউয়ের মতো চলন থাকে,  তা মন না কেড়ে পারে না। সাগর দেওয়ান এই সময়ের সবচেয়ে মেধাবী গায়কদের একজন। বিগত পাঁচ বছর ধরে আমি তাকে অনলাইনে ফলো করছি। অনেক রসিকজনকে তার গানের ভিডিও পাঠিয়েছি ইনবক্সে। কণ্ঠে যেমন সুর, তেমন আওয়াজ, তেমন তার দক্ষতা।  ক্লাসিক্যালে যেমন,  লোকগানেও তেমন। গায়ক হিসেবে দেওয়ান ঘরানার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিভা সাগর দেওয়ান। তবে এই গানের আগে দেশের সম্ভ্রান্ত আসরে তার নাম তেমন একটা শোনা যায়নি। 

বছর দুয়েক আগে আমি তাকে আমাদের ডাক্তারদের এক কনফারেন্সের কালচারাল নাইটে মূল আকর্ষণ হিসেবে এনেছিলাম। আনার পর বুঝলাম আমাদের কেউই তাকে চেনে না। নাম শোনেনি, চোখের দেখাও দেখেনি আমার সকল উচ্ছ্বাস মিইয়ে গেছে অচেনা গায়কের প্রতি সবার নির্লিপ্তি দেখে। গান কেমন গাইলো সেই বিচার করার সময়ও কারো ছিলো না। কারণ কনফারেন্স শেষে সবার তাড়া ছিল ডিনার নিয়ে। ডিনার শেষে বাড়ি ফেরা নিয়ে। যা হয় আরকি। আরিফ দেওয়ান একজন লিজেন্ড। কেরানীগঞ্জের দেওয়ান গোষ্ঠীর এই সময়ের  সবচেয়ে বড় নাম তিনি। সবাই তাকে সম্মান করে। আলী হাসান ভালো র‌্যাপ গাইছেন। বেশ সরল আর জীবনঘনিষ্ঠ। ছন্দেও পাকা। এই গানে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ছাদ পেটা গান। এককালে এটাও ছিল বাংলা গানের এক বিশেষ জনরা। আমাদের কবি নজরুলও ছাদপেটা গান লিখেছেন সারাদিন পিটি কার দালানের ছাদ লে। ছাদপেটা গান এখন বলতে গেলে হারিয়ে গেছে। সারি গানের সাথে ছাদপেটা গান শুরুতে একটু খাপছাড়া লাগলেও কয়েকবার শোনার পর ভালই লাগছে। পদ  হিসেবে এর অন্তর্নিহিত অর্থ আরো বেশি সুন্দর।

এই যে আক্ষেপ, সংসার জীবনের যাবতীয় মায়াজালে আটকে থেকে সাধন-ভজন হলো না। কামনা বাসনার ভয়াল থাবায় দেহ এক অকেজো, ভাঙ্গা নৌকায় পরিণত হলো। এই দেহ তো সাধনের অনুপযোগী। এর মধ্যেই চলে এলো বার্ধক্য। কী সম্বল নিয়ে দাঁড়াবে তার আশেক পরমজনের সামনে? সাধক বাউলদের এই আক্ষেপ চিরন্তন। এই হাহাকার তাকে করে তোলে নিষ্পাপ, সুন্দর। এই হাহাকার সে ছড়িয়ে দেয় বাংলার খোলা প্রান্তরে, নদীর ঢেউয়ে, মেঘের ভাঁজে ভাঁজে। কিন্তু আমরা যারা তথাকথিত  নাগরিক শ্রোতা আমরা এই সুন্দরের নাগাল এমনিতে পাই না। একটা মাটি ও জলের গান লাল নীল আলো, বাহারি পোশাক, ঝলমলে মঞ্চ, আধুনিক  যন্ত্রপাতি দিয়ে না গাওয়া অবদি আমরা জানতে পারি না এমন একটা গান আমাদের ছিল। একটা সুদৃশ্য মোড়কে না মোড়ালে আমরা জানতে পারি না আমাদেরও গান আছে, যা কেবল এই ভূমি আর তার কাদাজল থেকে উৎসারিত। কিন্তু এরকম হঠাৎ করে একটা আধটা গান আবিষ্কার হলে কার কী লাভ হয়? এই গানের পদকর্তা খালেক দেওয়ানই হোন আর রশিদউদ্দিনই হোন কারোর কোন লাভ নেই। তারা এর উর্ধে চলে গেছেন। এমনকি এসব গান যারা গায় তাদেরও তেমন লাভ হয় না এভাবে গত পঁঞ্চাশ বছরে এক বারী সিদ্দিকী ছাড়া আর কাউকে আমরা লাভবান হতে দেখিনি। বারী সিদ্দিকীও মোড়ক সর্বস্ব গায়ক ছিলেন না। হুমায়ূন আহমেদ তাকে বিশেষ পোশাক পরিয়ে, বিশেষ সংগীতায়োজনে, বিশেষ মঞ্চে উপস্থিত করেননি। মাটি ও জলের গন্ধ দিয়েই উপস্থাপন করেছেন আমাদের কাছে। এই মা লো মা গান, এই গানের বেশিরভাগ শ্রোতাই গানটি আগে শোনেনি। আল্ফু দেওয়ান,মালেক দেওয়ান, খালেক দেওয়ানের নাম শোনেনি। রশিদ উদ্দিনকেও চেনেনা এমন না যে এই গানের পর রশিদ উদ্দিনের গান বা খালেক দেওয়ানের গান তারা খুঁজতে থাকবে। হয়না তেমন।  

হলে আরো আগেই হতো। আমাদের এই শ্রোতারা ছোট বাচ্চাদের মত।  যারা শাকসবজি খায়না। সবজি খাওয়াতে হলে একটু মাংস ভরে, একটু মেয়োনিজ দিয়ে, সস টস প্রভৃতি অস্বাস্থ্যকর উপাদান যোগ করে তাকে খাওয়াতে হয়তো এইভাবে পাকোড়া বানিয়ে সবজি খাওয়া যার অভ্যাস তার আর সবজি খাওয়া হয়না। আসল স্বাদ বা পুষ্টি কিছুই আর আস্বাদন করা হয়না, ভিউ হয়, ট্রেন্ডিং হয় কিন্তু লোক গানের শীর্ণ শরীরে পুষ্টি আসেনা।   যারা গানটি উপভোগ করছেন আমি তাদের বাগড়া দিতে আসিনি। গানটি নি:সন্দেহে উপভোগ্য। প্রীতম হাসান জিনিয়াস মানুষ। এই গানে একটা নয়া রিদম সে আমাদের উপহার দিয়েছে কিন্তু এত চটকদারি দিয়ে আসলে আমাদের লোক গানের দীর্ঘমেয়াদে লাভ হয়না। এভাবে চল্লিশ মন ঘি দিয়ে তো রোজ রোজ রাধাকে নাচানোও যাবেনা। তাই আমি শুধু শ্রোতাদের বলি, আমাদের লোক গানের প্রতি সদয় হোন। কোক স্টুডিও তার কাজ করেছে। তার দরকার পপুলারিটি ও পাবলিসিটি। সে তাই করেছে। সফল। আপনারা কেবল কোক স্টুডিও নেক্সট সিজনে কি আনছে সেই আশায় বসে থাকবেন না। শ্রোতা হিসেবে নিজেদের একটু সাবালক করে নিন। এমন মনোহারী মিউজিক আর রিদমে আটকে না থেকে একটাবার অনাড়ম্বর মাটির গানটাও মন লাগিয়ে শুনুন। সাধকদের আরো আরো গানের সন্ধান করুন। ইউটিউব এখন বিপুল ভান্ডার। আঙ্গুলের ছোঁয়ায় সব মিলে যায়। এভাবে পাকোড়া খেতে খেতে একদিন সবজিটাও ধরুন তাহলেই আপনাদের শ্রবণ পুষ্টি পাবে। আমাদের লোকসংস্কৃতিও প্রাণ পাবে। মা লো মা গানের ব্যাপক সাফল্য আর উচ্ছ্বাসের মাঝখানে এমন বেরসিক আলাপ দেওয়ায় আপনারা বিরক্ত হতে পারেন। তাই এই বেলা ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আনন্দ হোক। লেখক: চিকিৎসক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়