স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ পণ্য যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বাজারে ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ পণ্য লাইনে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে।
এলডিসি উত্তরণের পর তিন বছরের একটি রূপান্তরকালেও এ সুবিধা অব্যাহত থাকবে। এরপর ৯২ শতাংশ পণ্য লাইনে শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে, যার মধ্যে তৈরি পোশাকও অন্তর্ভুক্ত।
রবিবার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের একটি সেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
সারাহ কুক বলেন, ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ যেন মসৃণ ও টেকসই হয়, সে বিষয়ে যুক্তরাজ্য কাজ করছে।
যুক্তরাজ্যের উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাণিজ্য ব্যবস্থা বিশ্বের সবচেয়ে সহজ এবং উদার বাণিজ্য সুবিধাগুলোর একটি হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বাজারে ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ পণ্য লাইনে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে এবং এলডিসি উত্তরণের পর তিন বছরের একটি রূপান্তরকালেও বাংলাদেশ এ সুবিধা পাবে। এরপর ৯২ শতাংশ পণ্য লাইনে শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে, যার মধ্যে তৈরি পোশাকও থাকবে।’
সারাহ কুক বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের জন্য নির্ভরযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদার হওয়ার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের অঙ্গীকারের একটি স্পষ্ট সংকেত।
বাংলাদেশকে যুক্তরাজ্যের কৌশলগত ও বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বহু বছর ধরে দুই দেশের অংশীদারত্ব মূলত উন্নয়ন সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। এ সহযোগিতা বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সহনশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক আরও আধুনিক কৌশলগত অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে, যা বিশ্বে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার প্রতিফলন।’
দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগকে এই সম্পর্কের অন্যতম শক্তি উল্লেখ করে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে পাঁচ লাখের বেশি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষ বসবাস করছেন। এর মাধ্যমে দুই দেশের সমাজ, অর্থনীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অর্থ থেকে ফ্যাশন, শিক্ষা থেকে জ্বালানি বিভিন্ন খাতে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী। ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে সহায়তা করেছে এবং বহু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়ে সারাহ কুক বলেন, আস্থা ও অভিন্ন লক্ষ্যের ভিত্তিতে দুই দেশের নিরাপত্তা অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে। মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিষয়ে দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের দায়িত্বকেও স্বীকৃতি দেয় যুক্তরাজ্য। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও জলবায়ুজনিত নিরাপত্তাহীনতার মতো সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐতিহ্যগত সীমারেখার বাইরে গিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা সংকটকে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বড় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন সারাহ কুক।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অসাধারণ উদারতার পাশে রয়েছে যুক্তরাজ্য।
রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা, সংকটের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখা এবং পরিস্থিতি তৈরি হলে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
সারাহ কুক বলেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ ও জবাবদিহির জন্য চাপ অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটে অন্যতম বৃহৎ দাতা হিসেবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি রাখাইন রাজ্যের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়েও বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জলবায়ু ঝুঁকির বাস্তবতা বাংলাদেশের চেয়ে ভালোভাবে খুব কম দেশই বোঝে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পরিবর্তিত আবহাওয়া ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব ফেলছে এবং এর প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলবে।’
বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজনের সক্ষমতা, উদ্ভাবন ও নেতৃত্ব বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত বলেও মন্তব্য করেন সারাহ কুক। বাংলাদেশের সহনশীলতা আরও শক্তিশালী করতে বাস্তবভিত্তিক অংশীদারত্ব ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য কাজ করছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অধিদপ্তরের অংশীদারত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে বন্যার পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হচ্ছে। ফলে জলবায়ুজনিত অভিঘাতের আগে জনগোষ্ঠী, ব্যবসা ও সরকার প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।’
এ ছাড়া জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানো এবং উচ্চমানের কার্বন বাজার গড়ে তুলতেও বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছে যুক্তরাজ্য বলে জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে সারাহ কুক বলেন, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, সংঘাত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চাপের মধ্যে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অস্থিতিশীলতার উত্তর পিছু হটা বা বিভক্তি নয়, বরং দেশগুলোর মধ্যে আরও শক্তিশালী সহযোগিতা।
কার্যকর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান এবং দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্ব সম্মিলিত নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য বলেও মন্তব্য করেন।