হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে রিমান্ড শেষে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেছে পুলিশ।
রোববার (৪ অক্টোবর) দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার উপপরিদর্শক মাজেদুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, "রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেছি। এ বিষয়ে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।"
প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আবু বক্কর ছিদ্দিকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আবেদনে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে আসামি মামলার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং কিছু তথ্য দিয়েছেন। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মামলার তদন্তও অব্যাহত রয়েছে।
এ অবস্থায় মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আখতারুজ্জামানকে কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে, গত ২ অক্টোবর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট-সংলগ্ন ধামালকোট এলাকার ১০ নম্বর রোডের ৩৫ নম্বর বাড়ি থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ৩ অক্টোবর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ১ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ জন প্রতিনিধি সপরিবারে মদিনা থেকে ঢাকায় আসেন। তাদের ফ্লাইটটি সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে এবং ৯টা ৮ মিনিটে পার্কিং করে। পরে যাত্রীরা ২১ নম্বর গেট দিয়ে টার্মিনালে প্রবেশ করে ইমিগ্রেশন শেষে লাগেজ সংগ্রহের জন্য ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় যান।
এজাহার অনুযায়ী, সে সময় বিমানবন্দরে আগমনী যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় সাময়িকভাবে ট্রলির সংকট দেখা দেয় এবং ট্রলি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। কয়েকজন প্রটোকল সহকারী লাইনের নিয়ম ভেঙে ট্রলি নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে লাগেজ আসতে দেরি হওয়া এবং জমজমের পানি না আসাকে কেন্দ্র করে কয়েকজন উত্তেজিত হয়ে অশোভন আচরণ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এ সময় ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে ঘটনাস্থলে ডেকে পাঠান। নির্বাহী পরিচালক সেখানে উপস্থিত হয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার সময় আখতারুজ্জামান তার দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে রূঢ় ও অশালীন ভাষায় কথা বলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, নির্বাহী পরিচালক বিমানবন্দরে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ ও ট্রলি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করলে আখতারুজ্জামান আরও উত্তেজিত হয়ে তাকে বলেন, "আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা", "গেট আউট ফ্রম হিয়ার", "ঘাড় ধরে বের করে দিবো", "কাজ জানেন না, তদবির করে পোস্টিংয়ে আসবেন" এবং "মাইর খাইতে চান?"
পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় মোহাম্মদ কামাল হোসেন নির্বাহী পরিচালককে সেখান থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে যান বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, এরপর আখতারুজ্জামান উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে বলেন, "আপনাদের সবাইকে বিমানবন্দরে বেঁধে পিটানো এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া দরকার, যাতে তারেক রহমান এটি দেখেন। তখন আপনারা সোজা হবেন। আপনাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো।"
এ ছাড়া বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে নিয়েও তিনি অশালীন ও অবমাননাকর মন্তব্য করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।তিনি বলেন, "হি ইজ আ বাস্টার্ড, বিমানবন্দরের জন্য কিছুই করছে না।"
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা কয়েকজন প্রটোকল সহকারী ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। এতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
এ সময় দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন কেপিআই-ভুক্ত এলাকায় ভিডিও ধারণ না করতে তাদের নিষেধ করেন। তখন আখতারুজ্জামান তাকে গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে শারীরিকভাবে আঘাত করেন বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে গেলে তার সঙ্গেও আখতারুজ্জামান অশোভন ও মারমুখী আচরণ করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া সাধারণ যাত্রীদের সংগ্রহ করা জমজমের পানির বোতল বা পাত্র ট্রলি থেকে ছুড়ে ফেলে ক্ষতিসাধনের অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এজাহারে বলা হয়েছে, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আখতারুজ্জামান কেপিআই-ভুক্ত ও স্পর্শকাতর স্থাপনা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনরত সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা সদস্যদের কাজে বাধা দিয়েছেন, ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়েছেন, প্রকাশ্যে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ ও মারমুখী আচরণ করেছেন এবং একজন নিরাপত্তা সদস্যকে শারীরিকভাবে আঘাত করেছেন।
এ ঘটনায় বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজিব বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা করেন।