মনিরুল ইসলাম : সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে গ্রেফতারের দাবিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রকাশ্যে এ দাবি তোলার পর বিষয়টি নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন সুর। একই সঙ্গে পরিস্থিতি ঘিরে আর্থিক খাতেও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এনসিপির দাবি: ‘আইনের আওতায় আনতেই হবে’
এনসিপির নেতারা মোঃ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এর গত শুত্রুবার পদত্যাগ পত্র স্পিকারের কাছে পাঠানোর পরপরই এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক বিভিন্ন অভিযোগ, বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা সংক্রান্ত ইস্যু—নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে দ্রুত গ্রেফতার করা প্রয়োজন। দলটির মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
তারা আরও বলেন, দেশে অতীতে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া চলবে না।
তবে গতকাল রোববার সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বলেন, চুপ্পুর বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হবে কি না, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে তদন্ত সংস্থা ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর। সরকার কোনো রাজনৈতিক চাপের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় না।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পেলে এবং আদালতের নির্দেশনা থাকলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। বর্তমানে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
এদিকে, গতকাল রোববার আইনমন্ত্রী মো আসাদুজ্জামান বলেন, সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান কিংবা ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক পদে থাকাকালীন বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ যাচাই-বাছাই করছে সরকার। জনদাবি বিবেচনায় নিয়ে অতীতের এসব কর্মকাণ্ড তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নবীন আইনজীবীদের বরণ ও প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত হয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার চায় না অন্যায্যভাবে কেউ কষ্ট পাক, তবে সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
বিদায়ী রাষ্ট্রপতিকে গ্রেফতারের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো থেকে এমন দাবি উঠতেই পারে এবং সেটির যৌক্তিকতা আইনগতভাবে দেখা হবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক খাতে সতর্ক নজরদারি ওপর একটি ঘোষণা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক খাতে অস্থিতিশীলতা ঠেকাতে সতর্কতামূলক নির্দেশনা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে ব্যাংকিং লেনদেন স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।বড় অংকের অস্বাভাবিক লেনদেন পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিক নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও আশ্বস্ত করেছে, দেশের আর্থিক খাত স্থিতিশীল রয়েছে এবং গ্রাহকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
সাবেক রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে এমন দাবি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। সরকার একদিকে আইনি প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ চাচ্ছে। এই দ্বিমুখী অবস্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। সব মিলিয়ে, মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে গ্রেফতারের দাবিকে ঘিরে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। সরকার আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা বলছে, আর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে বিরোধী পক্ষ থেকে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে চলমান তদন্ত, আইনি প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর বলে মনে করেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।
জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও দমন-পীড়নে সংশ্লিষ্টতায় সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করেছে বাংলাদেশ আজাদ পার্টি (বিএপি)।
রোববার দুপুরে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে অভিযোগ জমা দেন বিএপির সভাপতি হাসিনুর রহমান।
এই অবস্থায় সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবন ছেড়ে তার গুলশানস্থ বাসায় উঠেন। এখানেই তিনি থাকবেন বলে তার পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।