হিমালয়ের পাদদেশ ও প্রাচীন বরেন্দ্র জনপদবেষ্টিত দেশের উত্তরাঞ্চল কেবল কৃষি নয়, ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদের এক বিশাল ভা-ার। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর থেকে শুরু করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও বগুড়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রাচীন ভূপ্রকৃতির নিচে লুকিয়ে আছে তেল, গ্যাস, কয়লা ও কঠিন শিলার বিপুল মজুদ। গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরাঞ্চলের মাটির গভীরে কেবল জ্বালানি নয়, বরং কাঁচা সোনার আকর পাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। তবে দশকের পর দশক ধরে রহস্যজনক কারণে এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়া থমকে আছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, একটি নির্দিষ্ট মহলের ‘অপচয় তত্ত্বের’ কারণে উত্তরের এই খনিজ সম্পদ আজও মাটির নিচেই পড়ে আছে।
খনিজ সংক্রান্ত নতুন ও পুরাতন তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাকিস্তান আমল থেকেই উত্তরাঞ্চলে খনিজের সন্ধানে তৎকালীন সরকার যথেষ্ট মনোযোগী ছিল। তবে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচনী ডামাডোল এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের পর খনিজ গবেষণা ও অনুসন্ধানের বিষয়টি এক প্রকার ধামাচাপা পড়ে যায়।
পরবর্তীতে দেশি-বিদেশি মিডিয়ার চাপে এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে স্বাধীনতার পর অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের সময় সরকারের জনপ্রিয়তা ও প্রশাসনিক মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরে গেলে খনিজ অনুসন্ধানের বিষয়টি গুরুত্ব হারায়। ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে দেশের কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে যখন স্থিতিশীলতা আনেন, তখন তিনি পুনরায় উত্তরাঞ্চলের খনিজ সম্পদের দিকে দৃষ্টি দেন। সে সময় চীন, কোরিয়া ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাপেক্সকে সক্রিয় করা হয়। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে জেনারেল জিয়ার মর্মান্তিক হত্যাকা-ের পর আবারও এই খাতের স্থবিরতা নেমে আসে।
আশির দশকে এরশাদ সরকারের আমলে উত্তরাঞ্চলে যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি খনিজ অনুসন্ধানে বড় ধরনের বিনিয়োগ দেখা যায়। ওই সময় বগুড়ার গাবতলী উপজেলার কোলাকোপা গ্রামে এবং দিনাজপুরের ভারত সীমান্ত ঘেঁষে শালবাহান নামক স্থানে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বিশালাকার রিগ ও পাইপলাইন বসানো হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে গণমাধ্যমে এই নিয়ে প্রচুর আশাব্যঞ্জক খবর প্রকাশিত হয়।
বগুড়ার একজন প্রবীণ সাংবাদিক সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে জানান, ১৯৮৭ সালে কোলাকোপায় বাপেক্সের ক্যাম্পটি ছিল দেখার মতো। মানুষের মধ্যে এক বিশাল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে, উত্তর জনপদের ভাগ্য এবার বদলে যাবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে কিছুদিন পরই হঠাৎ সেই অনুসন্ধান কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি ক্যাম্প সরিয়ে নেওয়ার আগে তেলের পাইপ ও কূপগুলোর মুখ সিমেন্ট দিয়ে স্থায়ীভাবে সিল করে দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এরশাদও পরবর্তী সময়ে এই অনুসন্ধান বন্ধের কারণ নিয়ে আর কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। এরপর নব্বই থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আসা প্রতিটি সরকারই উত্তরের খনিজের বিষয়ে এক প্রকার উদাসীনতা প্রদর্শন করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদ-নদীর বালুকাভূমিতে কাঁচ তৈরির প্রধান উপাদান সিলিকন এবং আধুনিক ব্যাটারির প্রাণ লিথিয়াম ও রেডিয়াম থাকার জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমনকি কোথাও কোথাও ইউরেনিয়াম ও স্বর্ণের খনির উপস্থিতির খবরও বিভিন্ন সময় আলোচিত হয়েছে। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে এই সম্ভাবনাগুলো যাচাইয়ের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
বগুড়ার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সার্ক চেম্বার ফোরামের স্থায়ী সদস্য মাহফুজ সিদ্দিক লিটন বলেন, আমরা মাঝে মাঝেই শুনি আমাদের এখানে মূল্যবান খনিজ আছে। কিন্তু পরে দেখা যায় সেই আশায় গুড়ে বালি। মূলত দেশবিরোধী কোনো অপশক্তি হয়তো বছরের পর বছর সরকারকে ভুল তথ্য দিয়ে এসব সম্পদ উত্তোলন থেকে বিরত রাখছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া তথা উত্তরাঞ্চলের সমস্যা এবং সম্ভাবনা নিয়ে যথেষ্ট সচেতন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। আমরা আশা করি, তিনি বগুড়া ও দিনাজপুরের সেই বন্ধ তেলকূপগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেবেন এবং বড়পুকুরিয়ার কয়লা খনি ও জামালগঞ্জের চুনাপাথর প্রকল্পের মতো বিষয়গুলোতে নতুন করে পদক্ষেপ নেবেন।
উত্তরাঞ্চলের মাটির নিচের এই সম্পদ এখন সময়ের দাবি। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এবং দেশের শিল্পায়নের চাকাকে সচল রাখতে উত্তরের এই খনিজ ভা-ার হতে পারে তুরুপের তাস। গবেষকরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন করে অনুসন্ধান চালালে কেবল তেল-গ্যাস নয়, বরং এমন সব মূল্যবান ধাতুর সন্ধান পাওয়া যেতে পারে যা বাংলাদেশের অর্থনীতির মানচিত্রই বদলে দেবে। উত্তর জনপদের মানুষের দাবি, রাজনৈতিক বিবেচনায় না দেখে জনস্বার্থে এই খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে একটি জাতীয় কমিশন গঠন করা হোক এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় দ্রুত উত্তোলনের ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
সূত্র: ইনকিলাব