শিরোনাম
◈ সনের নেতৃত্বে চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে মাঠে নামছে এশিয়ার দল দক্ষিণ কোরিয়া ◈ কক্সবাজার, যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুর হবে নতুন আন্তর্জাতিক গেটওয়ে ◈ অর্থের উৎস নিয়ে বিতর্ক, স্থগিত ‘এশিয়ার সর্ববৃহৎ’ রামমূর্তি নির্মাণ ◈ তৃতীয় ভাষা শিখলে মিলবে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত শিক্ষা ঋণ ◈ নতুন বাজেটে কোন ব্র্যান্ডের সিগারেটের দাম কত? ◈ অস্ট্রেলিয়ার বিরু‌দ্ধে বাংলা‌দে‌শের টি-টোয়েন্টি দল ঘোষণা ◈ দিল্লির শীর্ষ বৈঠকেও ‘পুশ-ইন’ সংকটের সমাধান মিলল না ◈ ভাইকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন সেই বৃদ্ধ ষষ্ঠী বর্মন, ভারতে গেলেন যেভাবে ◈ মাথায় ব‌লের আঘাত, হাসপাতালে মে‌হে‌দি মিরাজ ◈ অস্ট্রেলিয়ার বিরু‌দ্ধে ওয়ানডে সিরিজ জয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর অভিনন্দন

প্রকাশিত : ০৮ এপ্রিল, ২০২৬, ০৭:৩৪ বিকাল
আপডেট : ০১ জুন, ২০২৬, ০৭:০০ বিকাল

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

দিল্লি না ঢাকা'-র রেশ কাটিয়ে দিল্লি ও ঢাকা কি কাছাকাছি আসতে পারবে?

এল আর বাদল : ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে একটা দীর্ঘ অস্বস্তিকর পর্বের পর ঢাকায় একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে – এবং সেই সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এই প্রথমবারের জন্য দিল্লি সফরে এসেছেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড: খলিলুর রহমানের চলমান ভারত সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঠিক এই পটভূমিতেই – আর ভারতও তার এই সফরকে যথেষ্ঠ গুরুত্ব দিচ্ছে।

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বিকেলে দিল্লিতে এসে নামার পর রাতেই ড: রহমান একান্ত বৈঠকে দেখা করেছেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে। দুজনে একসঙ্গে নৈশভোজও সেরেছেন। ---- বি‌বি‌সি বাংলা

এরপর এদিন (বুধবার ৮ এপ্রিল) দিল্লিতে তার পরপর বৈঠক নির্ধারিত আছে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল আর পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর সঙ্গে।

গঙ্গা চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরু করা, গত দেড় বছরে প্রত্যাহার করে নেওয়া বাণিজ্য সুবিধাগুলোর পুনর্বহাল এবং বিদ্যমান চুক্তির আওতায় পাইপলাইনে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহ – এই সব বিষয়ে বৈঠকগুলোতে আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনও বিবৃতি বা হ্যান্ডআউট জারি করেনি – ফলে এই সফর নিয়ে ভারতের 'সরকারি অবস্থান' কী, তা খুব একটা স্পষ্ট নয়।

তবে সফরের ঠিক পরেই আগামিকাল (৯ এপ্রিল) ড: রহমান ও ড: জয়শংকর দিল্লি থেকে এয়ার মরিশাসের একটি বাণিজ্যিক বিমানে চেপে একসঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যোগ দিতে যাচ্ছেন বলে বিবিসি জানতে পেরেছে।

কূটনীতিতে দুটো দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এভাবে লং হল বা দূরপাল্লার ফ্লাইটে একসঙ্গে যাত্রা করার ঘটনা বেশ বিরল, আর সে কারণেই এটা বোঝা যাচ্ছে যে দুই সরকারই একে অন্যকে যথেষ্ঠ গুরুত্ব দিচ্ছে, পরস্পরকে 'বোঝার চেষ্টা করছে'।

এদিকে দিল্লিতে ড: রহমানের সফরসঙ্গী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বুধবার দিল্লিতে ভারতের শাসক দল বিজেপির সদর দফতর পরিদর্শনে যাচ্ছেন। বিজেপি কার্যালয়ে দলটির বৈদেশিক শাখার প্রধান, ড: বিজয় চৌথাইওয়ালের সঙ্গে তার বৈঠক ও মতবিনিময় হবে বলেও জানা যাচ্ছে।

দিল্লি না ঢাকা'-র রেশ কতটা পড়বে?

২০২৪-র অগাস্টে যে প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে ঢাকায় টানা ষোলো বছরের আওয়ামী লীগ শাসনের অবসান ঘটেছিল, সেই আন্দোলনের অবশ্যই একটা ভারত-বিরোধী মাত্রা ছিল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের কাছে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়েছেন, এই অভিযোগ তখন আন্দোলনকারীদের মুখে প্রতিনিয়তই শোনা গিয়েছে।

সে সময় বাংলাদেশের রাজপথে মুহুর্মুহু স্লোগান উঠেছে 'দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা!' ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক দেওয়া হয়েছে, ঢাকাতে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল ভারতীয় দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটিও।

পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ভারতও বাংলাদেশে তাদের ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে, একের পর এক বাণিজ্য সুবিধা তুলে নেওয়া হয়েছে, বাতিল হয়েছে নির্ধারিত ক্রিকেট সফরও। সেই পরিস্থিতি থেকে কিছুটা উত্তরণ ঘটলেও অবস্থা আগের মতো আবার কখনো হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকছেই।

দুটো দেশের মানুষেরও একটি অংশের মধ্যে পরস্পরের প্রতি যে পরিমাণে বিদ্বেষ ও আক্রমণ হালে দেখা গেছে, সেটা পুরোপুরি উপেক্ষা করাও হয়তো দুই সরকারের পক্ষেই কঠিন হবে।

কারণ দুটো দেশের দুটো শাসক দলেরই অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাধ্যবাধকতাও আছে, বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ঘোষিত মূল কথাও হল 'বাংলাদেশ ফার্স্ট'।

তবে ভারত সরকারের একটি সাম্প্রতিক চিন্তাভাবনা থেকে মনে হচ্ছে, ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুরা চরম নির্যাতিত বলে বাংলাদেশে অনেকেই যে কথা বলে থাকেন, সেই ন্যারেটিভ মোকাবিলার একটা চেষ্টা দিল্লির তরফে দেখা যাচ্ছে।

বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে, ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনার পদে দেশের একজন সম্মানিত মুসলিম বুদ্ধিজীবীকে পাঠানো যায় কি না – খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দফতর তা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।

এই পদের জন্য একজন অবসরপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদ কিংবা একজন অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিবিদের কথা ভাবাও হচ্ছে। একজন সাবেক মন্ত্রী তথা সম্পাদকের কথাও ভাবা হয়েছিল, তবে তিনি নিজেই ওই পদে যেতে ইচ্ছুক নন বলে জানিয়েছেন।

এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সেটা হবে ভারতের জন্য খুব বিরল একটা ঘটনা – কারণ লন্ডন বা ওয়াশিংটনের বাইরে অন্য কোনো রাজধানীতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে ভারতের 'রাজনৈতিক নিয়োগ' করার নজির নেই বললেই চলে।

যদি শেষ পর্যন্ত তেমন কাউকে ঢাকাতে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয় – সেটা হয়তো 'টোকেনিজমে'-র বেশি খুব কিছু হবে না, কিন্তু ভারত যে বাংলাদেশের একটা বড় সংখ্যক মানুষের ভাবনাকে সম্মান দিচ্ছে সেই বার্তাটা অন্তত দেওয়া সম্ভব হবে!

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন না মিটলে কিছু হবে না

ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক তথা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, বাংলাদেশে যে একটা ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্ট প্রবলভাবে কাজ করে সেই বাস্তবতা সম্পর্কে দিল্লিও খুব ভালভাবেই অবহিত – তবে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেটাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয় তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

এর একটা বড় কারণ হতে পারে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ দিল্লিকে নিয়ে কী ভাবছে, সেটার পরোয়া না করেও ভারতের বেশির ভাগ স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে।

আসলে শেখ হাসিনার সরকারই যখন ভারতের দিকে সব সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, তখন দেশের সাধারণ মানুষ কী ভাবছে সেটা নিয়ে দিল্লির অত কিছু ভাবার প্রয়োজনই পড়েনি।

"ভারত যে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গেও বন্ধুত্বও চায় তাতে কোনো ভুল নেই – কিন্তু সেখানে কিছু ভারত বিরোধিতাও চিরকাল ছিল, থাকবে।"

"এটাকে মেনে নিয়েই দিল্লি ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে এসেছে, সেই বিরোধিতাটা তাতে কোনো বাধা হয়নি।"

"কিন্তু অগাস্ট ২০২৪-র পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে পরিবর্তন এসেছে তাতে ভারতকে এটা এখন বোঝাতেই হবে যে তারা সেই বিরোধী ভাবনাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে, অ্যাড্রেস করছে", বিবিসিকে বলছিলেন শ্রীরাধা দত্ত। তবে দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গীতে পরিবর্তন এলেও পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিধানসভা নির্বাচনের পর্ব না মিটলে বাস্তবে তার খুব একটা প্রতিফলন দেখা যাবে না বলেই তার ধারণা।

যেহেতু পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপি প্রবলভাবে জিততে চায় এবং ওই রাজ্যটিকে 'পশ্চিম বাংলাদেশ' না হতে দেওয়াটা তাদের প্রচারের একটি বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার , তাই ভারতের শাসক দল তাদের উগ্র বাংলাদেশ-বিরোধী রাজনৈতিক ন্যারেটিভে এখনই কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আনবে – সেই সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। পশ্চিমববঙ্গ ও আসামে নির্বাচনের পর ভোট গণনা ৪ঠা মে – শ্রীরাধা দত্ত এই কারণেই বিশ্বাস করেন বাংলাদেশ নিয়ে দিল্লির নীতিতে যা পরিবর্ত হওয়ার তা এর পরেই হবে।

সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার তাগিদই বড় ফ্যাক্টর
 
ঢাকায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী আবার গোটা বিষয়টিকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে চান। তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, "বাংলাদেশে একটা শ্রেণির মধ্যে যে তীব্র ভারত-বিরোধিতা আছে, সেটা তো নতুন কোনো কথা নয়।"

"কিন্তু আমার অবাক লাগে যখন এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় যে ভারত কি এটা বোঝে? আরে, আমরা বুঝবো না কেন – এর মধ্যে তো কোনো রকেট সায়েন্স নেই যে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হবে! ভারতের এই সাবেক শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিবিদের ধারণা, বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো ভারত-বিরোধিতাকে পুঁজি করে রাজনীতি করে থাকে, তারাই এই ধরনের প্রশ্ন তোলে যে একটি আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে ভারত বাংলাদেশের জনমতকে অগ্রাহ্য করছে।

মি চক্রবর্তীর যুক্তি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার লগ্ন থেকেই তাদের জনসংখ্যার একটা বড় অংশ ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এসেছেন – কিন্তু তাতে দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক থেমে থাকেনি। তাতে ওঠাপড়া থাকলেও সম্পর্ক কখনোই স্তব্ধ হয়ে যায়নি। এখন যেহেতু দুটো দেশেরই পরস্পরের সঙ্গে অনেক স্বার্থ জড়িত আছে এবং অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক খাতে একে অন্যের ওপর নানা ধরনের নির্ভরশীলতা আছে – সেই বাস্তবতাই সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে বিশ্বাস করেন মি চক্রবর্তী।

বাংলাদেশে যেমন একটা অংশের মধ্যে ভারত-বিরোধিতা আছে, তেমনি ভারতেও একটা শ্রেণির মধ্যে বাংলাদেশ বিরোধিতা আছে। সেটারও আবার সময়ে সময়ে তীব্রতার ওঠাপড়া আছে।

কিন্তু তাতে তো এতকাল ব্যবসা-বাণিজ্য, কানেক্টিভিটি, যোগাযোগ কিছুই বন্ধ হয়নি। আমার বিশ্বাস দুই দেশের সরকার প্রকাশ্যে যাই অবস্থান নিক. উভয়েই সম্পর্কটা স্বাভাবিক রাখতে চায় কারণ এতে তাদের স্বার্থ আছে, বলছিলেন মি চক্রবর্তী।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়