মনিরুল ইসলাম : চলমান জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদে উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে। সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তরপর্ব, জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশ ও সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্যরা। এ বিষয়ে সংসদ অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি জানান, দেশে বর্তমানে কোনো জ্বালানি সংকট নেই, বরং সম্ভাব্য চাহিদার চেয়েও সরকারের বেশি প্রস্তুতি ও মজুত রয়েছে। এরআগে প্রশ্নোত্তর পর্বে একই কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
সোমবার স্পিকার ব্যারিষ্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশ নিয়ে আলোচনা শেষে ৩০০ বিধিতে বিবৃতিতে দেন মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতের সাথে আমাদের অর্থনীতি, স্থিতিশীলতা, দৈনন্দিন জীবন ও উৎপাদন ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে জড়িত। বৈশ্বিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশের গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মজুত ও অগ্রিম প্রস্তুতির বিষয়টি দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করা জরুরি মনে করেছি।
তিনি বলেন, অযথা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি ক্রয় ও মজুত করার কারণেই বাজারে একটি কৃত্রিম চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ও তত্ত্বাবধানে আমরা সঠিক এবং সময়োপযোগী প্রস্তুতি নিয়েছি। দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। গত বছরের তুলনায় সরবরাহ আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ চাপের মুখে রয়েছে।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের দিন (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলের মজুত ছিল ২ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন। আজ (৩০ মার্চ) মজুত আছে ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন। এই ৪১ দিনে ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে। বিপুল সরবরাহের পরও মজুত বৃদ্ধি প্রমাণ করে, সরকার আগাম প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা সুদৃঢ় রেখেছে।
মানুষের যাতায়াত, পরিবহন, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মজুত বাড়ানো হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, গত বছরের মার্চ মাসের চাহিদাকে ভিত্তি ধরে এবার ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রকৃত চাহিদা সে অনুপাতে বাড়েনি। জনমনে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি জানান, গত বছর মার্চে ডিজেলের দৈনিক চাহিদা ছিল ১২ হাজার মেট্রিক টন, অকটেন ১ হাজার ২০০ এবং পেট্রোল ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। অথচ চলতি বছরের ১ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত অকটেন বিক্রি হয়েছে ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন (দৈনিক গড়ে ১ হাজার ২৫৮ মেট্রিক টন)। তেজগাঁওয়ের একটি পরিচিত পেট্রোল পাম্পের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, সেখানে গত বছরের চেয়ে অকটেন বিক্রি প্রায় ৯৬ শতাংশ বেড়েছে।
মোট ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৫ শতাংশই ডিজেল, যার সরবরাহ স্বাভাবিক উল্লেখ করে জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, অকটেন (৬.৮%) ও পেট্রোলের (৬.৭৭%) জন্য ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সঠিক চিত্র নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সংগ্রহের প্রবণতায় এই সংকট কৃত্রিমভাবে তৈরি হয়েছে। এ সংকট উত্তরণে ইতোমধ্যে ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান চালিয়ে ১৫৩টি মামলা, ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং ১৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি। এপ্রিলে ৫০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানির উদ্যোগ এবং দেশীয় উৎস থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন পাওয়ার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকারের মজুতে আরো দুই মাসের চাহিদা অনায়াসে পূরণ হবে।
জ্বালানি খাতে সরকারের বিশাল ভর্তুকির চিত্র তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, মার্চ-জুন প্রান্তিকে ডিজেল ও অকটেনে ১৬ হাজার ৪৫ কোটি এবং এলএনজি আমদানিতে ১৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হবে। বৈশ্বিক সংকটেও দেশের পরিবহন, শিক্ষা ও শিল্পকারখানা সচল রাখার চেষ্টার কথা তুলে ধরে তিনি দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন।
সীমান্তে পাচার রোধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, সবাই মিলে সাশ্রয়ী ও সচেতন হলে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হবে। অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহার ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযত হওয়া এখন সময়ের দাবি। আসুন, আমরা ঐক্যবদ্ধ হই, ব্যক্তি নয়, দেশ; অপচয় নয়, সাশ্রয়; বিভক্তি নয়, ঐক্য। সবার আগে বাংলাদেশ।
সংসদে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী : সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমান বিন কাশেমের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্যামা ওবায়েদ বলেন, জ্বালানি যেন আমরা একাধিক উৎস থেকে সরবরাহ করতে পারি, সেজন্য প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে জ্বালানি মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও অন্যান্য যেসব উৎস থেকে আমরা জ্বালানি আনতে পারি, সে বিষয়ে আমরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ, আমরা সফল হবো।
এ সময় কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। আমি নিজে আজকে পাম্পে পাম্পে ঘুরেও আমার গাড়ির জন্য তেল পাইনি। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি তাহলে কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা সহজেই অনুমেয়।
তার এই বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলাম বলেন, তার নির্বাচনী এলাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতেও পেট্রোল ও অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করেন, পাম্পে তেল না থাকলেও বাইরে বোতলে করে ঠিকই বেশি দামে তেল বিক্রি হচ্ছে। মোটরসাইকেল চালকরা বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে তেল কিনছেন। এতে করে সাধারণ মানুষ চরম হয়রানির শিকার হচ্ছে।
এরপর রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে অন্যান্য সংসদ সদস্যরাও জ্বালানি সংকট ও তা নিয়ে জনগণের দূর্ভোগের বিষয় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা জ্বালানি তেলের এই কৃত্রিম সংকট বা সরবরাহ ঘাটতি দ্রুত নিরসনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।