ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত নারী গৃহপ্রধান যদি অন্য কোনো সরকারি ভাতা বা সহায়তা পান, সেক্ষেত্রে সেই বিদ্যমান সুবিধা বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। তবে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভাতা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে।
সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাল্টিপারপাস হলে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ ও বাস্তবায়ন কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়। অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদসহ সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
জানানো হয়, আগামী মঙ্গলবার (১০ মার্চ) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। দেশের ১৩টি জেলার ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে ভাতা দেওয়া হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম চালু করছেন।
কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়াই উপকারভোগী নির্বাচন করা হচ্ছে, যাতে প্রকৃত দুস্থরা এ সুযোগ পান তা নিশ্চিত করা যায়।
পরে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. জাহিদ কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। এরই অংশ হিসেবে পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার যুগান্তকারী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি জানান, আগামী ১০ মার্চ সকাল ১০টায় বনানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে (কড়াইল বস্তি সংলগ্ন) প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করবেন।
পাইলট কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে দেশের ১৩টি জেলার ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডের প্রতিটি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই ও তালিকা চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ওয়ার্ড কমিটি সরেজমিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা, সদস্য সংখ্যা, শিক্ষা, বাসস্থান, ব্যবহৃত আসবাব ও গৃহস্থালী সামগ্রী (টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, মোবাইল ইত্যাদি), রেমিট্যান্স প্রবাহসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছে।
পরে ইউনিয়ন কমিটি এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে এবং উপজেলা কমিটি অধিকতর যাচাই শেষে উপকারভোগীদের তালিকা চূড়ান্ত করে।
পাইলট পর্যায়ে সারাদেশে মোট ৬৭ হাজার ৮৫৪টি নারীপ্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের প্রক্সি মিনস টেস্ট বা দারিদ্র সূচক নির্ধারণ করে পরিবারগুলোকে হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির ৫১ হাজার ৮০৫টি পরিবারের তথ্য যাচাইয়ে ৪৭ হাজার ৭৭৭টির তথ্য সঠিক পাওয়া যায়। এর মধ্যে ডাবল ডিপিং (একই ব্যক্তির একাধিক ভাতা গ্রহণ), সরকারি চাকরি, পেনশন ইত্যাদি কারণে বাদ দিয়ে চূড়ান্তভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে ভাতা দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
পুরো প্রক্রিয়াটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রক্সি মিনস টেস্টের ভিত্তিতে সম্পন্ন হওয়ায় উপকারভোগী নির্বাচনে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই বলে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় প্রতিটি নারীপ্রধান পরিবার একটি আধুনিক কার্ড পাবেন। স্পর্শবিহীন চিপসম্বলিত এ কার্ডে কিউআর কোড ও এনএফসি (Near Field Communication) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, ফলে এটি নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও সহজে ব্যবহারযোগ্য হবে।
একটি ফ্যামিলি কার্ড একটি পরিবারের পাঁচজন সদস্যের জন্য প্রযোজ্য হবে। তবে যৌথ বা একান্নবর্তী পরিবারে সদস্য সংখ্যা পাঁচজনের বেশি হলে আনুপাতিক হারে একাধিক কার্ড দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
কর্মসূচির আওতায় যোগ্য উপকারভোগীরা পাইলট পর্যায়ে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা হারে ভাতা পাবেন। পরবর্তী সময়ে সমমূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
তবে কোনো পরিবারের সদস্য যদি সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে বেতন, ভাতা, অনুদান বা পেনশন পেয়ে থাকেন, কিংবা নারী পরিবারপ্রধান এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক বা কর্মচারী হিসেবে কর্মরত থাকেন, তাহলে সেই পরিবার ভাতা পাওয়ার যোগ্য হবে না।
এ ছাড়া পরিবারের নামে বাণিজ্যিক লাইসেন্স বা বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলে, বিলাসবহুল সম্পদ (যেমন গাড়ি বা এসি) থাকলে অথবা পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলেও ওই পরিবার ভাতা পাওয়ার যোগ্য হবে না।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ থেকে ফ্যামিলি কার্ডের ভাতা জি-টু-পি (Government to Person) পদ্ধতিতে সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। তথ্য সংগ্রহের সময়ই উপকারভোগীদের মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে কোনো বিলম্ব বা ভুল ছাড়াই তারা ঘরে বসেই সরাসরি সরকারের কাছ থেকে ভাতা পাবেন।
পাইলট পর্যায়ে জুন ২০২৬ পর্যন্ত কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা (৬৬.০৬ শতাংশ) সরাসরি নগদ সহায়তা হিসেবে দেওয়া হবে এবং ১২ কোটি ৯২ লাখ টাকা (৩৩.৯৪ শতাংশ) তথ্য সংগ্রহ, অনলাইন সিস্টেম তৈরি ও কার্ড প্রস্তুতসহ বাস্তবায়ন ব্যয়ে ব্যবহার করা হবে।
ফ্যামিলি কার্ড পাইলট বাস্তবায়ন গাইডলাইন–২০২৬ ইতোমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে এবং তা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছে।