তিস্তা নদীর পানির হিস্যা পেতে ভারতের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে গেছে হাসিনা আমলেই। তবে ওই নদীকে বাঁচাতে বিকল্প হিসেবে সরকারের তিস্তা প্রকল্পে বিনিয়োগে আগে থেকেই আগ্রহী ছিল চীন। ভূ-রাজনৈতিক কারণে বেইজিং এতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসে। কিন্তু তখন প্রস্তাবটি বেশি দূর অগ্রসর হয়নি। কারণ দিল্লি ছিল সক্রিয়। তারা তিস্তা প্রকল্পে বিনিয়োগের কৌশলী প্রস্তাব দিয়ে রেখেছিল। যা অগ্রাহ্য করার মতো অবস্থানে ছিলেন না শেখ হাসিনা। কিন্তু ৫ই আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর প্রেক্ষাপট পাল্টে গেছে। হাসিনা সরকারের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে দিল্লির প্রভাবও কমেছে। তিস্তায় বহুমাত্রিক প্রকল্প গ্রহণে একতরফাভাবেই চীনের দিকে অগ্রসর হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় উৎসাহী হয়েছে প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে কাজ করছে। যদিও এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন অন্ধকারে।
দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে এ নিয়ে আলোচনা চলছে বেইজিংয়ের সঙ্গে। আলোচনার ফোকাল পয়েন্টে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। ২০২৫ সালে একাধিকবার এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে মন্ত্রণালয় এবং চীনা দূতাবাসের মধ্যে। প্রকল্পটির কারিগরি দিক খতিয়ে দেখেছেন চীনা বিশেষজ্ঞরা। এ নিয়ে চুক্তি বা সমেঝাতার জন্য একের পর এক সম্ভাব্য তারিখও হয়েছে। যদিও তা আর চূড়ান্ত হয়নি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী চীনের তরফে প্রকল্পটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। এই সমীক্ষা শেষ হলে চুক্তির বিষয়ে আলোচনা হবে। আপাতত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই চুক্তির সম্ভাবনা নেই। তবে সমীক্ষা শেষ হলে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই চুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো অবস্থায় রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
এ বিষয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মানবজমিনকে বলেন, তিস্তা চুক্তি ১২ই ফেব্রুয়ারির আগে হবে না, তবে হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা আমাদের কাগজপত্র সব জমা দিয়েছি। এখন তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এটা একটা জটিল প্রকল্প। আমরা দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এটা হচ্ছে না কারণ তাদের সমীক্ষা শেষ করার পর যদি সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করে তারপরও এক মাস লাগবে। দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মতি, দুই দেশ থেকে কারা যাবে, কোথায় সাইন হবে এমন নানা বিষয় আছে। এখনো যেহেতু সমীক্ষার ওপরে ওরা কনক্লুসিভ হয় নাই। ব্যাংকের রিভিউ, টেকনিক্যাল সাইডের রিভিউও চলছে। চায়না ফুললি কমিটেড। আবার প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে মনে হয় বিষয়টি আছে। তারাও আশাবাদী যে চুক্তিটা হয়ে যাবে। তারা কমিটেড আর আমরা আমাদের কাজ করে দিয়েছি।
ওদিকে গত ১৯শে জানুয়ারি তিস্তা নদী এলাকা পরিদর্শন করেন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার গাজীর ঘাট এলাকা পরিদর্শনকালে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত তার সঙ্গে ছিলেন। তিস্তা নদী পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন উপদেষ্টা। বলেন, আমরা আজ এখানে এসেছি মূলত কাজের অগ্রগতি দেখতে ও আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে। রাষ্ট্রদূত মহোদয় নিজেই এসেছেন, যা প্রমাণ করে চীন এই প্রকল্প নিয়ে কতোটা আন্তরিক। তারা প্রকল্প যাচাই-বাছাই করছে। আমরা কোনো তড়িঘড়ি করে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে চাই না। বরং একটি টেকসই সমাধান খুঁজছি। আশা করি, শিগগিরই আমরা চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবো।
পানি সম্পদ উপদেষ্টা বলেন, প্রকল্পটা করার ব্যাপারে চীন ও বাংলাদেশ সরকার উভয়ই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রকল্পটা অনেক বেশি জটিল হওয়ায় তিনটা জিনিস আমাদের দেখতে হচ্ছে- বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ ও একইসঙ্গে সেচ। ফলে এগুলো সঠিকভাবে যাচাই করার জন্য চীন একটু সময় নিচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে হতাশা না ছড়ানোর আহ্বান জানিয়ে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আমি আবারো আপনাদের বলছি, হতাশা ছড়িয়েন না। হতাশা ছড়িয়ে লাভ নেই তো কোনো। বরং আশার কথা, একজন রাষ্ট্রদূত এসেছেন, আমি এসেছি। নিশ্চয়ই এখানে আশার বড় বেশি জায়গা আছে বলেই আমরা এসেছি। আমরা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই নদী খনন ও পাড় বাঁধার কাজটা করতে চাই, যাতে আপনাদের আর ঘরবাড়ি হারাতে না হয়। পরিদর্শনকালে বন, পরিবেশ ও পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথমে তিস্তা সড়ক সেতুতে যান।
সেখানে তাকে প্রকল্পের নকশা দেখান প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পরে তিনি, চীনের রাষ্ট্রদূতসহ তিস্তা রেলসেতুর কাছে নৌকায় ঘোরেন। পরে কাউনিয়ার বালাপাড়া ইউনিয়নে গাজীর ঘাটে নদীভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। উল্লেখ্য, প্রতিনিধিদলের প্রাক্কলন মতে, ১০ বছর মেয়াদে ওই প্রকল্পে ব্যয় হবে ১২ হাজার কোটি টাকা। প্রথম ৫ বছরে সেচ, ভাঙন রোধ, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ গুরুত্ব পাবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনার একটি খসড়া চীন সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। রিভারাইন পিপলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর তিস্তার ভাঙন ও প্লাবণে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন উত্তরের ৫ জেলার বাসিন্দা। এ ছাড়াও বাস্তুভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরুর আশা করেছিল চীনের ডিরেক্টর অব দ্য পলিটিক্যাল সেকশন জং জিং।
তার নেতৃত্বে চীনা প্রতিনিধিদল বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ ও তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনসহ নদীপাড়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০১৪ সাল থেকে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি আরও কমে যায়, ভারত পানি প্রত্যাহার করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আর বর্ষাকালে তিস্তায় প্রবাহিত হয় তিন থেকে চার লাখ ঘনফুট পানি। সব কপাট খুলে দেয়া হয়। দ্রুত বেগে নেমে আসা তিস্তার পানিতে উত্তরের পাঁচ জেলা নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। ভাঙনের পাশাপাশি ব্যাপক ফসলি জমি ক্ষতির মুখে পড়ে। তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানির মতে, ১০ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে অববাহিকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে আসছি।
বিগত আওয়ামী সরকার তিস্তাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়েছিল, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তাতে তিস্তাপাড়ের মানুষের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন ঘটেছে। তবে তিস্তা নদীকে ঘিরে চীনের প্রস্তাবিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের আগে এ অঞ্চলের নদী ও প্রকৃতিকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন পরিবেশ ও নদী রক্ষা আন্দোলনের বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, চড়া সুদের বিদেশি ঋণে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে নদী শাসনের যে কারিগরি নকশা করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে নদী আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বাপা’র সহ-সভাপতি ও জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণা বিভাগের সাবেক প্রধান নজরুল ইসলামের মতে, তিস্তা উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী এবং সারা দেশের চতুর্থ বৃহত্তম নদী। এই নদী আজ সংকটাপন্ন। এই সংকটের মূল কারণ দু’টি। একটি হচ্ছে ভারত এই নদীর পানি সরিয়ে নিচ্ছে গজলডোবা বাঁধ দিয়ে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে বাংলাদেশে আর তেমন পানি আসে না। বিগত সরকার তিস্তা নিয়ে বহু আশা দেখিয়েছে উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম বলেন, ভারতের সঙ্গে এই বুঝি একটা চুক্তি হলো। চুক্তি হলেই এই সমস্যার সমাধান হবে। ওটা ছিল একটা মরীচিকা।
কারণ আমরা জানি ভারতের সঙ্গে গঙ্গা নিয়ে চুক্তি হয়েছে ১৯৯৬ সালে। কিন্তু তাতে এই শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের গঙ্গা অথবা পদ্মায় সামান্যতম পানি বৃদ্ধিও ঘটেনি। চীনের প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, সেখানে বহু প্রশ্ন অমীমাংসিত। এই প্রকল্পে বলা হচ্ছে যে তিস্তা নদীকে প্রায় এক-চতুর্থাংশ সংকুচিত করবে। এই রকম মারাত্মকভাবে সংকুচিত করলে শীতকালের প্রবাহ না হয় ধরা যাবে।
কিন্তু বর্ষাকালে যে বিশাল প্রবাহ আসে অথবা হরকা বন্যা বা যে প্রবাহ আসে, সেটা কীভাবে এই নদী ধারণ করবে? তার উত্তর কি?’ যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ভূতত্ত্ব ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামানের মতে নদীভাঙনের সমাধান হচ্ছে, ভাঙনের কারণ কী, এটা আমাদের বুঝতে হবে। কারণ হচ্ছে বর্ষাকালে অধিক পানি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভারত আমাদের দিকে ঠেলে দেয়। জাতিসংঘ নদী প্রবাহ আইনে বাংলাদেশকে সই করতে হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্কের (বেন) এই বৈশ্বিক সমন্বয়ক বলেন, এ আইনে সই করে নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হবে। দরকার হলে আমাদের যে উন্নয়ন সহযোগী, অর্থাৎ যারা ভারতেও কাজ করে বাংলাদেশেও কাজ করে যেমন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ হতে পারে। এ রকম সংগঠনের সহযোগিতায় ও মধ্যস্থতায় আমাদের এই পানির সমস্যার সমাধানটা করতে হবে। উৎস: মানবজমিন।