মনিরুল ইসলাম : গণভোট সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মূখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, আসন্ন গণভোটে 'হ্যাঁ'র পক্ষে প্রচারণা চালানো সরকারি কর্মচারীদের নৈতিক দায়িত্বও বটে। অগুনতি শহীদের জীবন বিনিময় এর ভিত তৈরি করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার প্রতিফলনই ঘটবে গণভোটে।
তিনি বলেন, এক ব্যক্তির ইচ্ছার কাছে গণতন্ত্র, আইনের শাসন আর মানবিকতাকে বিসর্জন দিতে না চাইলে, ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের যাতাকলে নিষ্পেষিত হতে না চাইলে, দুর্নীতির গহ্বরে দেশ নিমজ্জিত হোক তা না চাইলে, দেশের সম্পদ বাইরে পাচার না চাইলে গণভোট হ্যাঁকে বিজয়ী করতে হবে।
গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশে বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সকালে ময়মনসিংহ টাউন হলে বিভাগীয় প্রশাসন, ময়মনসিংহ এ সভার আয়োজন করে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদ মর্যাদা) ড. আলী রীয়াজ বলেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনায় ‘একবাক্যে’ মত পেয়েছি-গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ওপর আইনগত নিষেধাজ্ঞা নেই। যারা এ বিষয়ে বাধা আছে বলে প্রচার করছে, তারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে অথবা ভিন্ন উদ্দেশ্যে বিষয়টি উত্থাপন করছে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে যে ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল, তার বিরুদ্ধে যারা সংগ্রাম করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন, জেল–জুলুম–নিপীড়ন সহ্য করেছেন, গুমের শিকার হয়েছেন, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন-তারাই আমাদের দুইটি সুস্পষ্ট দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র যেন আর ফিরে আসতে না পারে, সেই পথ রুদ্ধ করা। আরেকটি দায়িত্ব হচ্ছে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের পথনকশা নির্মাণ।
আলী রীয়াজ বলেন, দীর্ঘ সময় ভোট নিয়ে অনাস্থার কারণে অনেকের কাছে গণভোট নতুন অভিজ্ঞতা। ফলে জনগণকে বোঝাতে হবে কীভাবে ব্যালটে ভোট দিতে হবে এবং ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের অর্থ কী। গণভোটের ব্যালটে ‘টিক চিহ্ন’কে প্রচারণার মূল প্রতীক হিসেবে ধরে জনগণকে ভোটকেন্দ্রে আনতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
আলী রীয়াজ আরও বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তিনটি ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ করছে-সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। নির্বাচন সরকার আয়োজন করে না; অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে সরকার, আর নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। একইভাবে বিচারও আদালত পরিচালনা করবে, সরকার শুধু বিচার প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখতে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করছে।
অতীতে এক ব্যক্তির ইচ্ছায় সংবিধান সংশোধন হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনী করার জন্য জাতীয় সংসদের একটা কমিটি করা হয়েছিল। তাতে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দলের সদস্যরা ছিল না। সেই কমিটি ২৫ থেকে ২৬টি বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকবে। একটা বৈঠকে সেটা পরিবর্তিত হয়েছে। সেই বৈঠকটা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে পঞ্চদশ সংশোধনী তৈরি হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়েছে এক ব্যক্তির ইচ্ছায়। সংবিধান সংশোধনী ছেলেখেলায় পরিণত যাতে আর না থাকে সেটা বন্ধ করা দরকার।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন বলেন, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ স্বদেশ উপহার দিতে চাইলে, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইলে, দুর্নীতি, দুঃশাসন বন্ধ করতে গনভোট 'হ্যাঁ'র পক্ষে রায়ের বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, যারা বলছে, 'হ্যাঁ' জয়ী হলে সংবিধানে বিসমিল্লাহ থাকবে না, আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস বাদ দেয়া হবে তারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তিনি বিভ্রান্তির বিপরীতে জনগণকে সঠিক তথ্য দিতে সরকারি কর্মচারীদের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের নির্মমতা ও নৃশংসতায় যে তরুণ,ছাত্র, কৃষক, দোকানদার, শ্রমিক প্রাণ দিয়েছেন তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে গণভোটে 'হ্যাঁ' বলতে হবে।
তিনি বলেন,গণভোটের মূল কথা হলো জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে আমরা সমুন্নত রাখতে চাই কি না। তিনি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা অব্যাহত রাখতে, রাষ্ট্রকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে, ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ কায়েম করতে আসন্ন গণভোটে 'হ্যাঁ'কে বিজয়ী করতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে সরকারি কর্মচারীদের আহ্বান জানান।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার ফারাহ শাম্মীর সভাপতিত্বে সভায় বক্তৃতা করেন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. ফজলুল হক ভুঁইয়া, আতাউল কিবরিয়া প্রমুখ।
সভায় ময়মনসিংহ বিভাগের জেলাসমূহের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।