শিরোনাম
◈ ইরানে যে ৬ উপায়ে হামলা চালাতে পারেন ট্রাম্প ◈ ভোটারের মন জয় করতে তিন দলের ইশতেহারে জোর ◈ আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে ইরান ◈ বিতর্কিত মন্তব্য করে তোপের মুখে পরিচালক নাজমুলের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিল বিসিবি ◈ নির্বাচ‌নে অংশ নি‌চ্ছে ৫১টি রাজনৈতিক দল, আইন না থাকার কারণেই কি কমছে নারী প্রার্থীর সংখ্যা?  ◈ চার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনি জরিপে যা জানা গেল ◈ ‌সে‌প্টেম্ব‌রে এশিয়ান গেমসে দেখা যাবে ভারত–পাকিস্তান লড়াই?‌ ◈ যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কায় আকাশপথ বন্ধ করল ইরান ◈ ইএফএল কাপে চেল‌সি‌কে হা‌রি‌য়ে ফাইনালের পথে আর্সেনাল ◈ আজও ঢাকার তিন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের অবরোধ কর্মসূচি

প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৯:৪৩ সকাল
আপডেট : ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬, ০১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

৬ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ের পর অসমাপ্ত অবস্থায় বাতিল ২৯ প্রকল্প

গত অর্থবছরে প্রায় ৬ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ের পর ২৯টি প্রকল্পের কাজ অসমাপ্ত রেখেই সেগুলো সমাপ্ত ঘোষণা করে বাতিল করা হয়েছে। ১২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আওতায় থাকা এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা। সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

সোমবার (১২ জানুয়ারি) প্রকাশিত বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

বাতিল হওয়া উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাকাশ অবলোকন কেন্দ্র, খুলনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার প্রকল্প, বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহের প্রকল্প, কুড়িগ্রামের জামালপুর–ধানুয়া–কামালপুর–রৌমারী–দাতভাঙ্গা জেলা সড়ক (জেড–৪৬০৬) প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ, ফরিদপুর (মাইজকান্দি)–বোয়ালমারী–গোপালগঞ্জ (ভাটিয়াপাড়া) সড়কসহ সরাইল–আলফাডাঙ্গা–কাশিয়ানী সড়ক উন্নয়ন, ফেনীর দাগনভূঞায় ভাষাসৈনিক শহীদ সালাম স্মৃতি প্রতিবন্ধী সেবা কেন্দ্র ও কমিউনিটি হাসপাতাল নির্মাণ, মুক্তিযুদ্ধের মিত্রবাহিনীর শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ (দ্বিতীয় সংশোধিত), যশোরে শেখ জহুরুল হক পল্লী উন্নয়ন একাডেমি স্থাপন এবং বিভাগীয় শহরে ছয়টি টেলিভিশন স্টেশন নির্মাণ প্রকল্প।

সোমবার শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এই প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।

আইএমইডি ও পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর একটি হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাকাশ অবলোকন কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প। ফরিদপুরের ভাঙ্গায় কর্কট ক্রান্তিরেখা ও ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার সংযোগস্থলে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি এবং বিজ্ঞানচর্চা প্রসারের লক্ষ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালে ২১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায় এবং ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে ৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ের পর বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, অতিদ্রুত প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন ও অনুমোদনের কারণে এতে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল। সমীক্ষাও ছিল দুর্বল। বর্তমান নকশা অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করলে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না, বরং কার্যকর করতে হলে কয়েক গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। এসব কারণেই প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া আরেকটি বড় প্রকল্প হলো পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়ায় আনুষঙ্গিক সুবিধাদিসহ নদী বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্প। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) এই প্রকল্পটি ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য একনেকে অনুমোদিত হয়েছিল। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩৫১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৭৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ের পর প্রকল্পটি বাতিল করা হয়।

প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতা। ডিপিপিতে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য যে অর্থ ধরা হয়েছিল, চূড়ান্ত প্রাক্কলন তার চেয়ে ১৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বেশি হওয়ায় ডিপিপি সংশোধন ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ শুরু করা যায়নি। ফলে প্রকল্পের প্রধান নির্মাণকাজ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

এছাড়া প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নদীর তীররক্ষা কাজের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। নদীর মরফোলজিক্যাল পরিবর্তন, ব্যাংক লাইনের ঘনঘন স্থানান্তর এবং নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর বৃদ্ধির কারণে এই কাজের ব্যয় ৬৮০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ১০৬ কোটি টাকায় পৌঁছে। অনুমোদিত ডিপিপির সঙ্গে এই ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও জটিল হয়ে ওঠে।

কারিগরি দিক থেকেও প্রকল্পটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বুয়েট কর্তৃপক্ষ জানায়, দৌলতদিয়া প্রান্ত একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় পূর্ববর্তী ডেটার ভিত্তিতে তীররক্ষা নকশা চূড়ান্ত করা সম্ভব নয়। নতুন করে ডাটা সংগ্রহ করে পুনর্নকশা করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে, যা প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব কারণেই প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে বলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে আইএমইডির সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে বিগত সরকার ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে ছয়টি বিভাগীয় শহরে ১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি টেলিভিশন স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এই প্রকল্পে চীন থেকে ৯৮৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব ছিল। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে প্রকল্পটিকে অগ্রাধিকারহীন বিবেচনায় বাতিল করেছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, "এ ধরনের প্রকল্প সমাপ্তির ঘটনা নতুন নয়, আগেও এমন দেখা গেছে। অপরিকল্পিতভাবে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, আংশিক কাজ করে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয় করা হয়, তারপর নানা অজুহাতে সেই প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটি শুধু একটি প্রকল্পের ব্যর্থতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার একটি ধারাবাহিক দুর্বলতার প্রতিফলন।"

তিনি বলেন, "সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই সমস্যাগুলো কি আগে থেকেই বোঝা যেত না? নদীর মরফোলজি পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয়, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা—এসব কোনো নতুন বিষয় নয়। এগুলো প্রকল্প গ্রহণের আগেই ফিজিবিলিটি স্টাডির মাধ্যমে নির্ণয় করা সম্ভব ছিল। অথচ দেখা যাচ্ছে, প্রকল্প অনুমোদনের পর এসব 'ঝুঁকি' সামনে আসছে এবং সেগুলোই প্রকল্প বন্ধ করার যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।"

ড. ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, "ফিজিবিলিটি স্টাডি নামমাত্র করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও জোরালোভাবে উঠছে। কাগজে-কলমে সমীক্ষা থাকলেও তা বাস্তবসম্মত, ডেটাভিত্তিক ও কারিগরি দিক থেকে শক্ত না হওয়ায় বারবার প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে কি যোগ্য বিশেষজ্ঞ নেই, নাকি সঠিক মানুষকে সঠিক কাজে লাগানোর সদিচ্ছার অভাব রয়েছে?"

তিনি বলেন, "এখানেই মূল গ্যাপটি স্পষ্ট হয়—পরিকল্পনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব। প্রকল্প কেন নেওয়া হলো, কোন ভিত্তিতে নেওয়া হলো, পরে কেন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেল—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, অনেক সময় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছেও পাওয়া যায় না। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো জবাবদিহি তৈরি হয় না।"

সাবেক পরিকল্পনা সচিব এমডি মামুন-আল-রশিদ বলেন, "সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব প্রকল্প বাতিল হওয়ার আগেই প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা সরকারি অর্থ ব্যয় হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রকল্প বাতিল হলেও রাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিশাল অঙ্কের অর্থ হারিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের নীতিগত ও আর্থিক ব্যর্থতা।"

তিনি বলেন, "বর্তমানে যে 'ফাইন্ডিং' বা কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে এসব প্রকল্প বাতিল করা হচ্ছে, তার সঙ্গে প্রকল্প গ্রহণের সময় করা ফিজিবিলিটি স্টাডির কোনো বাস্তব মিল নেই। এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠে আসে—যারা ফিজিবিলিটি স্টাডি করেছে, যারা সেই স্টাডির ভিত্তিতে প্রকল্প প্রস্তাব করেছে এবং যারা অনুমোদন দিয়েছে, তাদের সবাইকে কেন জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে না?"

তিনি আরও বলেন, "এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে ভবিষ্যতেও একই চক্র ঘুরে ফিরে আসবে—আগে প্রকল্প নেওয়া, পরে ব্যয় বৃদ্ধি ও ত্রুটি ধরা পড়া, তারপর বাতিল।" 

"এখান থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো নজির স্থাপন। অর্থাৎ, প্রপার ও স্বাধীন ফিজিবিলিটি স্টাডি ছাড়া কোনো প্রকল্প অনুমোদন না দেওয়া, স্টাডির সঙ্গে বাস্তবায়নের গরমিল হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং প্রয়োজনে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যতদিন এই জবাবদিহির সংস্কৃতি তৈরি না হবে, ততদিন রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের এই প্রবণতা বন্ধ হবে না," যোগ করেন তিনি। 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়