জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা-কল্পনা তৈরি হলেও এ বিষয়ে সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খোলেনি। এ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে অথবা নির্ভরযোগ্য কোন সূত্র স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেনি যে, ড. খলিলুর রহমান ঠিক কবে থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। তবে একাধিক সূত্র দাবি করেছে- তিনি জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রথম সপ্তাহ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
ওয়াশিংটনে তিনি বিভিন্ন সরকারি ও কূটনীতিকদের সাথে বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। যেমন: ৮ থেকে ১০ জানুয়ারি মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছেন। এর মধ্যে ৮ জানুয়ারি তিনি ওয়াশিংটনে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। অথচ দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য ইস্যুতে বাণিজ্য উপদেষ্টা অথবা বাণিজ্য সচিবের বৈঠক হওয়ার কথা।
১০ জানুয়ারি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, নিরাপত্তা উপদেষ্টার মতো রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত একজন ব্যক্তির সফর নিয়ে এরকম লুকোচুরি করা উচিত নয়। তিনি রাষ্ট্রীয় কোন কাজে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন নাকি ব্যক্তিগত কোন কাজে ছুটি নিয়ে গেছেন তা জনগণের সামনে খোলাসা করা উচিত। তা না হলে এ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে।
সুত্রমতে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে থাকা ব্যক্তির বিদেশ সফরের উদ্দেশ্য, কর্মসূচি ও আলোচ্য বিষয় নিয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না আসায় প্রশ্ন উঠেছে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উনি প্রধান উপদেষ্টার অ্যাসাইনমেন্টে গিয়ে থাকতে পারেন। সেটা প্রধান উপদেষ্টার দফতরই ভালো বলতে পারবে। সূত্র দাবি করেছে, ওয়াশিংটনে অবস্থানকালে ড. খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, পাশাপাশি প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
এ সব বৈঠকে সন্ত্রাসবাদ দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সাইবার নিরাপত্তা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। আরেকটি সূত্র বলছে, শোনা যায় উনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। সুতরাং তার সেইফ এক্সিটের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। নির্বাচনের আগে সরকার যেখানে নানা ইস্যুতে ক্রুসিয়াল টাইম পাস করছে সে সময়ে খোদ নিরাপত্তা উপদেষ্টার যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নির্বাচন পূর্ব-পরবর্তী বাস্তবতা আন্তর্জাতিক মহলের নজরে এসেছে। বিশেষ করে মানবাধিকার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সহিংসতা প্রতিরোধে সরকারের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে ধরাই এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে। কিন্তু সেটা স্পষ্ট করলে তো দোষের কিছু নেই। বরং লুকোচুরি করলে সেটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হতেই থাকবে। একই সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা এবং বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ভারসাম্য নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনের মাত্র এক মাস বাকি। এ সময়ে বাংলাদেশ তার ‘ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি’ বজায় রাখার বার্তা যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে জানাতে চাইলে সেটাও খোলাসা হওয়াই ভালো। এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শামসুল আলম বলেন, ড. খলিলুর রহমান রাষ্ট্রের খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। প্রধান উপদেষ্টা তাকে নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি কী ব্যক্তিগত কাজে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন, নাকি ছুটি নিয়ে গেছেন? নাকি কোন অ্যাসাইনমেন্টে গেছেন- সেটা নাগরিক সমাজের কাছে খোলাসা করা উচিত। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যুটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামনে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা পৃথিবীর নজর বাংলাদেশের দিকে।
সুতরাং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদধারীরা কে, কখন, কোথায় যাচ্ছেন বা অবস্থান করছেন-তা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় অথবা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্লিয়ার করতে পারে। তা না করায় বিষয়টি নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক হচ্ছে। দেশের মানুষ তথা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সন্দেহের উদ্রেগ হচ্ছে- যা কাম্য হতে পারে না। ড. খলিলুর রহমানের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকে তিনি ‘রহস্যজনক’ উল্লেখ করে বলেন, আমাদের ৫ আগস্টের চেতনা ভুলে গেলে চলবে না। এটাকে মাথায় রেখেই এ ধরনের রাষ্ট্রীয় বিষয়ে গোপনীয়তা সমীচীন নয়। তথ্য অধিকার আইনেও জনগণের তথ্য জানার অধিকার রয়েছে। সে কারণে আমি এক কথায় বলবো-নিরাপত্তা উপদেষ্টার যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান নিয়ে সরকারের একটা বিবৃতি দেয়া উচিত। এতে করে বিভ্রান্তি দূর হবে।
এর আগেও গত বছর নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এক নাগারে দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেন। সে সময়ও বলা হয়েছিল- তার সফরে রোহিঙ্গা সংকটও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। মিয়ানমারের চলমান সংঘাত, সীমান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং শরণার্থী প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় আসতে পারে। তবে বাস্তবে এর কোন ইতিবাচক ফল দেশবাসীর চোখে পড়েনি। গত দেড় বছরে একজন রোহিঙ্গাও ফেরানো যায় নি। উল্টো নতুন করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর যেভাবে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা বলা হয়েছিল তার কোনো কার্যকর ফল দেশের মানুষ দেখেনি। অন্যদিকে, মিয়ানমারে করিডোর ইস্যুতেও কোন ইতিবাচক ফল আসেনি। গতকালও টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের ভূখ-ে সাম্প্রতিক গোলাগুলি এবং এতে এক বাংলাদেশি শিশু আহত হওয়ার ঘটনায় ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত ইউ কিয়াও সো মো-কে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দুপুরে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে মন্ত্রণালয়ে ডেকে এনে এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। আর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে একটার পর একটা হত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে। ভারতের বিএসএফ সীমান্ত থেকে বাংলাদেশিদের ধরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করা অব্যাহত রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সফর সাধারণত কৌশলগত ও সংবেদনশীল হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে পুরো বিবরণ প্রকাশ না করলেও সফরের সামগ্রিক উদ্দেশ্য ও জাতীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট দিকগুলো জনগণকে জানানো সরকারের দায়িত্ব। অথচ এই সফর নিয়ে নীরবতা বজায় রাখায় নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে আসছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ এবং নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে। এ ধরনের সংবেদনশীল ইস্যুতে গোপনীয়তা থাকলেও ন্যূনতম তথ্য না দেওয়ায় বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ প্রশ্ন তুলছে-কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, আর কোন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে বা নেওয়া হচ্ছে? রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, সরকারের এই নীরবতা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী। তাদের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তা বা পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণকে অন্ধকারে রাখা উচিত নয়। একই সঙ্গে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছে, এই সফরের মাধ্যমে কোনো একতরফা কৌশলগত অবস্থান নেওয়া হচ্ছে কি না, যা ভবিষ্যতে দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ড. খলিলুর রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই গুরুত্ব যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে সরকারের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন। সফরকালে অথবা সফর শেষে একটি স্পষ্ট ও দায়িত্বশীল ব্যাখ্যা না এলে এই নীরবতা রাজনৈতিক বিতর্ক আরও উসকে দেবে বলে মনে করছেন তারা। এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বাবিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর তারানা বেগম বলেন, নিরাপত্তা উপদেষ্টার দীর্ঘ সফর বর্তমান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোন বোঝাপড়ার অথবা নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সমর্থনের বিষয় থাকতে পারে।
কিন্তু সেটা জনগণের সামনে ক্লিয়ার করা দরকার। তিনি বলেন, বিশ্বের একটা শক্তিশালী দেশে দীর্ঘদিন অবস্থান করার নেপথ্যে কোন পরিকল্পনাও থাকতে পারে। কিন্তু আসলে আমরা এসবের কিছুই জানি না। যা বলা হচ্ছে- সবই কল্পনাপ্রসূত। এজন্যই এটা নিয়ে স্বচ্ছতার প্রয়োজন আসতেই পারে।
সূত্র: ইনকিলাব