শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৯ আগস্ট, ২০২২, ০৫:১৭ সকাল
আপডেট : ০৯ আগস্ট, ২০২২, ০৫:১৭ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত

ছবি: বণিক বার্তা

বণিক বার্তা: দারিদ্র্য বিমোচন এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে অত্যাবশ্যকীয় উপাদানের অন্যতম জ্বালানি। গ্রাম ও শহরের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য দূরীকরণে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতায়ন ও উন্নয়নের জন্য এক যুগের বেশি সময় আগে উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। সেই পরিকল্পনায় মূলত গ্যাস, জ্বালানি তেল ও কয়লার বাইরে গিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তিকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করা হয়। আর তারই অংশ হিসেবে ২০০৮ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ঘোষণা করে সরকার। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০ শতাংশ আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে। কিন্তু এ পরিকল্পনার ১৪ বছর অতিক্রান্ত হলেও এখনো সাড়ে ৩ শতাংশের বেশি অর্জিত হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তির অনভিজ্ঞতা এবং সৌরশক্তি ব্যবহারে প্রয়োজনীয় জমির সংকটেই লক্ষ্যের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে খাতটি।

গত এক যুগে দেশের বিদ্যুৎ খাতে অভাবনীয় সাফল্যের দাবি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তবে এ সফলতা এসেছে মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি প্রযুক্তির ওপর ভর করে। বর্তমানে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে অন্য সব জ্বালানির মতোই সমান গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সন্তোষজনক অবস্থান তৈরি করতে পারেনি বাংলাদেশ।

সাসটেইনেবল রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে মোটে ৯০৯ দশমিক ১৯ মেগাওয়াট, যা দেশে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের সাড়ে ৩ শতাংশের কিছু বেশি। এর মধ্যে শুধু সৌরশক্তি থেকেই উৎপাদন হচ্ছে ৬৭৫ দশমিক ২ শতাংশ বা মোট নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৭৪ শতাংশ। এছাড়া বায়ু থেকে আসছে ২ দশমিক ৯ শতাংশ, হাইড্রো থেকে ২৩০ মেগাওয়াট, বায়োগ্যাস থেকে দশমিক ৬৯ শতাংশ ও বায়োম্যাস থেকে দশমিক ৪ শতাংশ। সেক্ষেত্রে খাতটির অর্জন আসলে আরো কম। অথচ সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে চলতি বছরের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ পৌঁছানোর কথা ছিল আড়াই হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সৌর, বায়ু ও পানির মতো উৎসকে কাজে লাগিয়ে চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। যদিও বিশ্বের উন্নত দেশগুলো নবায়নযোগ্য শক্তিকে কাজে লাগিয়েই জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিচ্ছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চালানো হচ্ছে, এক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্যও পেয়েছে দেশটি।

২০১৮ সালে নবায়নযোগ্য বিভিন্ন উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনসংক্রান্ত একটি বছরভিত্তিক পরিকল্পনা করা হয়। ওই পরিকল্পনায় ২০১৮ সালকে ভিত্তি বছর ধরে পরবর্তী তিন বছরের (২০২১ পর্যন্ত) সম্ভাব্য অর্জনের একটি হিসাব করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী নানা ধরনের প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়েছিল। এ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে নবায়নযোগ্য বিভিন্ন উৎস থেকে মোট ৫৮৪ দশমিক ৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়ার কথা ছিল। এরপর ২০১৯ সালে নতুন ৪৩২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট, ২০২০ সালে ৬০৪ দশমিক ৫ ও ২০২১ সালে ৫৫৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে থাকার কারণ জানতে চাইলে স্রেডার সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রথমত অনভিজ্ঞতা, তারপর এটিকে ব্যবহারোপযোগী করতে কর্মপরিকল্পনায় দেরি হওয়া এবং এ জ্বালানির জন্য যে পরিমাণ জমি প্রয়োজন সেটির সংকট—এই সবকিছু মিলিয়েই নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ থেকে পিছিয়ে পড়তে হয়েছে। তবে এখন বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।

সোলার সিস্টেমের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়ে তিনি বলেন, সোলার সিস্টেম নিয়ে আমরা এগোনোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সেটার ক্যাপাসিটি খুবই কম। পাঁচ লাখ সোলার সিস্টেম থেকে মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। তাছাড়া সোলার নিয়ে বড় আকারে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমরা জায়গা সংকটে পড়েছি। এত বড় প্রকল্প করতে গেলে ৩৫০ একর জমির প্রয়োজন ছিল। যেটি আমরা করতে পারিনি। এছাড়া টেকনোলজি ডেভেলপ করাটাও বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল।

স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এ পর্যন্ত মোট ৪০টির অধিক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, যার বেশির ভাগই গৃহীত হয়েছে ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের ২৫ জেলায় স্থাপিত সোলার পার্ক থেকে মোট ২ হাজার ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। এর মধ্যে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট, পঞ্চগড় সদর উপজেলায় আট, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় ২০ ও জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার তিন মেগাওয়াট সক্ষমতার চারটি সোলার পার্কের কাজ শেষ হয়েছে। এর বাইরে ময়মনসিংহে নির্মিত এখন পর্যন্ত দেশের বৃহত্তম সোলার পার্কও এরই মধ্যে উৎপাদনে চলে এসেছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার কারণ জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সাইফুল হক বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পিছিয়ে থাকার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে বেশ সময় লেগেছে। ৩০ বছর আগে থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ শুরু হলেও বাংলাদেশ এটি ২০০৮-১০ সালের দিকে শুরু হয়েছে। গত ১২ বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ভালো ধারণা ও দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে সময় লেগে গেছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ বিভাগ ছিল জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। ফলে অন্যান্য উৎসকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখনো বেশ কঠিন। তাছাড়া এ প্রযুক্তি থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার হতো, সেগুলো ছিল উচ্চমূল্যের। এখন দাম কমে এসেছে, ফলে এখন বিনিয়োগ হচ্ছে।

  • সর্বশেষ