শিরোনাম
◈ ভূমিকম্পে ঢাকার কোন এলাকা নিরাপদ? ◈ খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা একদমই ভালো না, সবাই দোয়া করবেন: আইন উপদেষ্টা ◈ গুগলকে কনটেন্ট সরাতে অনুরোধের সংখ্যা নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যা ◈ জামায়াতকে ভোট দিলে আমার মৃতদেহ পাবেন : ফজলুর রহমান (ভিডিও) ◈ প্রধান উপদেষ্টার প্রতি বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ◈ বাংলাদেশ সিরিজ স্থগিত করে শ্রীলঙ্কা নারী দল‌কে আমন্ত্রণ ভারতের ◈ শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য জরুরি বার্তা ◈ এক শতক পর আবারও কি সিলেট ঝুঁকিতে? ডাউকি ফল্টে ভূমিকম্পের ধাক্কা! ◈ সুখবর পেলেন বিএনপির আরও ৯ নেতা ◈ বড় চা‌পে ইউ‌রোপ, চল‌ছে জ্বালানি, জলবায়ু, অর্থনীতি ও জনসংখ্যা সংক‌ট

প্রকাশিত : ২৯ নভেম্বর, ২০২৫, ০১:৫৮ রাত
আপডেট : ২৯ নভেম্বর, ২০২৫, ০৯:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

কম ভূমিকম্প, তবু বড় ঝুঁকি: বাংলাদেশের দুর্বলতা কোথায় ব্যাখ্যা দিলেন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ

নরসিংদীতে ভূমিকম্পে আঘাতে সড়কে ফাটল (বাঁয়ে), বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী।

ভূমিকম্প পৃথিবীর স্বাভাবিক ভূ-প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ। প্রতিদিন বিশ্বে ৫০-৬০টি ভূমিকম্প হয়, আর বছরে এই সংখ্যাটি ২০ হাজারেরও বেশি। তবে সব ভূমিকম্প যে দুর্যোগ বা মহাদুর্যোগ সৃষ্টি করে এমন নয়। কম্পনের মাত্রা/শক্তি, উৎসের গভীরতা, কম্পন বা ঝাঁকুনির স্থায়িত্ব, অবস্থান এবং জনবসতির ঘনত্ব-এই পাঁচটি উপাদানের ওপর নির্ভর করে একটি ভূমিকম্প ভয়াবহ দুর্যোগে রূপ নেয় কি না। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠে-বিশ্বের ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

বাংলাদেশের মূলভূখণ্ড অপেক্ষাকৃত ছোট। এটি সরাসরি উচ্চ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ না হলেও এটি একটি বৃহত্তম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান তিনটি টেকটোনিক প্লেটের কাছাকাছি-ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট এবং বার্মা মাইক্রোপ্লেট। বাংলাদেশে বছরে ৪ মাত্রার বেশি ভূমিকম্পের সংখ্যা অন্যান্য উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তুলনায় কম হলেও ঘনবসতি এবং ভবন নির্মাণে চরম অনিয়মের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত ও মিয়ানমারের অনেক ভূমিকম্পই বাংলাদেশে অনুভূত হয়, কারণ ভূতাত্ত্বিকভাবে এই দেশ সক্রিয় অঞ্চলের খুব কাছেই অবস্থান করছে।

এ প্রসঙ্গে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী চ্যানেল 24 অনলাইনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ভূখণ্ড তুলনামূলক ছোট, আর চারদিকে সক্রিয় ফল্টলাইনযুক্ত ভারত ও মিয়ানমারের ভূকম্পন প্রায়ই এখানে অনুভূত হয়। এই দেশকে ভূমিকম্পপ্রবণ মনে করার মূল কারণ ভূমিকম্পের সংখ্যা নয়, বরং উৎসের জটিলতা। দেশে মোট পাঁচটি পরিচিত সিসমিক সোর্স রয়েছে এবং আরও দুটি ব্লাইন্ড সোর্স (অজানা উৎস) রয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত নই। ফলে মাঝারি মাত্রার একটি ভূমিকম্পও ত্রুটিপূর্ণভাবে নির্মীত ভবন ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।’ 

অন্যদিকে, সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, জাপান, ফিলিপাইন ও নিউজিল্যান্ড। এই দেশগুলোতে বছরে চার মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হয় কয়েকশ’ থেকে কয়েক হাজার বার। প্যাসিফিক ‘রিং অব ফায়ার'-এর ওপর অবস্থান করায় এই দেশগুলোতে আগ্নেয়গিরি সক্রিয়তা এবং প্লেটের সংঘর্ষ বেশি হয়। তবুও এসব দেশে মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম। কারণ আবাসিক এবং বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে কঠোর নিয়ম, উচ্চ প্রযুক্তি-নির্ভর নির্মাণ সামগ্রী, প্রস্তুতি মহড়া, সিসমিক ডিজাইন কোড এবং দুর্যোগ মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী। সেই সঙ্গে সেইসব দেশে জনবসতির ঘনত্ব অনেক কম। 

এদিকে বাংলাদেশ বিশেষ করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ঢাকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। জনসংখ্যার দিক থেকে জাপানের টোকিওকে পেছনে ফেলে এই তালিকার শীর্ষ দুইয়ে উঠে এসেছে রাজধানী ঢাকা। ২৫ নভেম্বর প্রকাশিত জাতিসংঘের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালিকায় বর্তমানে প্রথম স্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা। আর, যে গতিতে জনসংখ্যা বাড়ছে তাতে ২০৫০ সাল নাগাদ ঢাকাই হতে যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর।
 
বিশ্ব সংস্থাটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের (ইউএন ডিইএসএ) ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাস ২০২৫' শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহরের তালিকায় ২০০০ সালে শীর্ষস্থানে উঠে আসে টোকিও। কিন্তু এবারের প্রতিবেদনে জাপানের রাজধানী নেমে গেছে তৃতীয় স্থানে। টোকিওর জনসংখ্যা এখন ৩ কোটি ৩৪ লাখ। অন্যদিকে, তালিকার নবম স্থান থেকে এক লাফে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ভবন নির্মাণে অনিয়ম, যথাযথভাবে সিসমিক কোড না মানা, নরম মাটির গঠন এবং অতিরিক্ত জনবসতি-এই চারটি কারণে মাঝারি ধরনের ভূমিকম্পও এখানে মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এর আগে ঢাকার অতি ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকার ভবনগুলো, চট্টগ্রামের পাহাড়সংলগ্ন কাঠামো এবং সিলেটের পলি-মাটি অঞ্চলে ৪ থেকে ৫ মাত্রার ভূমিকম্পেও আতঙ্ক ও ক্ষয়ক্ষতির উদাহরণ রয়েছে।

যদিও বাংলাদেশে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প খুব বেশি হয়নি, তবুও ভূমিকম্পপ্রবণতার দিক থেকে দেশের অবস্থান মাঝারি ঝুঁকির গণ্ডিতে। এক জরিপে দেখা গেছে, ২০০১–২০১৭ সালের ১৭ বছরে দেশে কমপক্ষে ৬০০টি কম্পন অনুভূত হয়েছে। এই সময়কালে ৪.০ বা এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের সংখ্যা বছর গড়ে ৫-৮টি। বেশিরভাগই মাইক্রো বা মৃদু মাত্রার।

পৃথিবীর সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর অন্যতম জাপান বছরে লক্ষাধিক মাইক্রো কম্পন হয়। তবে সাধারণভাবে অনুভূত কম্পন বা ৪ মাত্রা বা এর বেশি মাত্রার কম্পনের সংখ্যা বছরে প্রায় ১,০০০-১,৫০০টি। নিউজিল্যান্ডও সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের উপর অবস্থান হওয়ায় এখানে বছরে রেকর্ড ২০ হাজারের এর মতো কম্পন নথিভুক্ত হয়। কিন্তু এর বড় অংশ মাইক্রো কম্পন। ৪.০ বা এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হয় বছরে ৪০-৭০টি।

কম্পনের সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশের তালিকায় নেই, কিন্তু সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিচারে অবস্থান তুলনামূলক উচ্চ ঝুঁকির দিকে। কারণ ভূমিকম্পের মাত্রা নয়, বরং এর আঘাত নিম্নমানের ভবন এবং এর মধ্যে বসবাসকারী মানুষের ওপর কীভাবে পড়বে-সেইটাই মূল চ্যালেঞ্জ।

ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, ভূ-প্রাকৃতিক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ভূমিকম্পকে ঠেকানো না গেলেও ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণহানি কমিয়ে রাখা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন ভবন নির্মাণে কঠোরতা, মানসম্মত সিসমিক ডিজাইন কোড বাস্তবায়ন, নগর পরিকল্পনায় শৃঙ্খলা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি। ভূমিকম্প স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও প্রস্তুতির অভাব, অনিয়মই সেটিকে দুর্যোগের স্তরে নিয়ে যায়।

ভূমিকম্প সরাসরি মানুষ হত্যা করে না। বরং নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ও ত্রুটিপূর্ণ ভবন ধসে কংক্রিটের স্ল্যাবের চাপে মানুষের নির্মম মৃত্যু হয়। বিশ্বে বছরে ৪ মাত্রার বেশি ভূমিকম্পের মধ্যে অধিকাংশই আঘাত হানে জাপান, ইন্দোনেশিয়া, নিউজিল্যান্ডে। তবে ইন্দোনেশিয়ায় প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হলেও জাপান ও নিউজিল্যান্ডে অনেক কম। সাত মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প যখন জনবসতিপূর্ণ বা নগরে আঘাত হানে তখনই সেটি মুহূর্তে মহাদুর্যোগ হয়ে উঠে তবে যখন সেটি মহাসাগরের তলায় হয়ে থাকে তখন মাঝে মাঝে সৈকত বা উপকূলীয় অঞ্চলে সুনামির সতর্কতা জারি করা হয়।  উৎস: চ্যানেল২৪

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়