ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি অসংখ্য ভুয়া ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে অনলাইনে ব্যাপক বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। এসব ভিডিওতে এমন সব বিস্ফোরণ, ধ্বংসস্তূপে পরিণত শহরের রাস্তা কিংবা যুদ্ধবিরোধী সৈন্যদের প্রতিবাদের দৃশ্য দেখানো হয়েছে- যেগুলোর বেশিরভাগই বাস্তবে ঘটেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, গত দুই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ঘিরে কমপক্ষে ১১০টির বেশি আলাদা এআই নির্মিত ছবি ও ভিডিও শনাক্ত করা হয়েছে। এসব ভুয়া কনটেন্টে যুদ্ধের প্রায় সব দিকই বিকৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে তেল আবিব শহরে ভয়াবহ বিস্ফোরণে মানুষ আতঙ্কে পালাচ্ছে, আবার কোথাও দেখানো হয়েছে ইরানের শহরগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে কিংবা মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছে।
এসব ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিলিয়ন মিলিয়ন বার দেখা হয়েছে। এসব কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এক্স, টিকটক ও ফেসবুক সহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপগুলোর মাধ্যমেও এগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, এসব ভিডিও যাচাই করতে সাংবাদিকরা বিভিন্ন এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যার ব্যবহার করেছেন এবং ভিডিওগুলোর ভেতরে থাকা ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক পরীক্ষা করেছেন। পাশাপাশি ভিডিওতে দেখানো ভবন, রাস্তা বা পরিবেশ বাস্তবে আছে কি না তাও যাচাই করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে ভিডিওতে এমন ভবন দেখানো হয়েছে যা বাস্তবে নেই। আবার কোথাও লেখা বিকৃত বা অসংলগ্ন ছিল, কিংবা মানুষের নড়াচড়া ছিল অস্বাভাবিক- যা এআই ভিডিওর সাধারণ লক্ষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রজন্মের এআই প্রযুক্তি এখন খুব সহজে এবং প্রায় বিনা খরচে বাস্তবের মতো যুদ্ধের দৃশ্য তৈরি করতে পারে। ফলে যে কেউ কয়েকটি লিখিত নির্দেশনা দিয়েই বাস্তবসম্মত ভিডিও বানিয়ে ফেলতে পারে। কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির মিডিয়া অ্যানালিটিক্সের সহযোগী অধ্যাপক মার্ক ওয়েন জোনস বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও ভুয়া ভিডিও ছড়িয়েছিল, তবে এখন পরিস্থিতি আরও জটিল। তার ভাষায়, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময়ের তুলনায় এখন আমরা অনেক বেশি এআই নির্মিত কনটেন্ট দেখতে পাচ্ছি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সাইয়াব্রা’র এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই নির্মিত ভিডিওগুলোর একটি বড় অংশ ইরানপন্থী বার্তা ছড়াতে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব ভিডিওতে ইরানের সামরিক শক্তিকে অতিরঞ্জিত করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের শহরগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে- এমন ভুয়া দৃশ্য ছড়িয়ে দিলে যুদ্ধটি আমেরিকার মিত্রদের জন্য অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক বলে মনে হতে পারে।
অনলাইনে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোর একটি ছিল তেল আবিব শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দৃশ্য। একটি অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দা থেকে ধারণ করা বলে দাবি করা ভিডিওটিতে শহরের আকাশে একের পর এক বিস্ফোরণ দেখা যায়। ভিডিওটির সামনে একটি ইসরাইলি পতাকা দেখা যায়- যা বিশেষজ্ঞদের মতে এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার বড় একটি লক্ষণ। কারণ এআই সফটওয়্যার সাধারণত ‘ইসরাইলের ওপর হামলার দৃশ্য’ এমন নির্দেশনা পেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পতাকা বা ডেভিডের তারকা যুক্ত করে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তব যুদ্ধের ভিডিও সাধারণত এত নাটকীয় হয় না। অধিকাংশ ভিডিও দূর থেকে ধারণ করা হয় এবং রাতে ক্ষেপণাস্ত্রকে শুধু আলোর রেখা হিসেবে দেখা যায়। বিস্ফোরণ সাধারণত বড় আগুনের গোলা হিসেবে দেখা যায় না, বরং ধোঁয়ার মেঘ তৈরি হয়। কিন্তু এআই ভিডিওগুলোতে প্রায়ই বিশাল আগুনের গোলা, মাশরুম ক্লাউড কিংবা অতিরঞ্জিত ধ্বংসযজ্ঞ দেখানো হয়Ñযা হলিউড সিনেমার মতো মনে হয়।
এআই নির্মিত ভুয়া ভিডিও এক সময় বড় ধরনের বিতর্কও সৃষ্টি করে। মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন নিয়ে এমন একটি ঘটনা ঘটে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী প্রথমে দাবি করেছিল তারা জাহাজটিতে হামলা চালিয়ে বড় ধরনের ক্ষতি করেছে। এরপরই অনলাইনে অসংখ্য ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে যেখানে জাহাজটিকে আগুনে জ্বলতে দেখা যায়। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, হামলাটি ব্যর্থ হয়েছিল এবং জাহাজটির কোনো ক্ষতি হয়নি।
কিছু ভিডিও আবার ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচারণার অংশ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। এতে কখনও বিশ্বনেতাদের শক্তিশালী নায়ক হিসেবে দেখানো হয়েছে, আবার কখনও প্রতিপক্ষ নেতাদের অপমানজনকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একটি ভিডিও সিরিজে এমন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দৃশ্য দেখানো হয়েছে যেখানে স্কুলছাত্রীরা খেলছে, এরপর একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে।
ভিডিওগুলো ছোট চলচ্চিত্রের মতো করে তৈরি করা হয়েছে। গত বছর ওপেন এআই ভিডিও তৈরির অ্যাপ সোরা চালু করার পর থেকেই এ ধরনের ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও অনেক এআই ভিডিওতে ভুয়া বলে চিহ্নিত করার জন্য ওয়াটারমার্ক দেয়া থাকে, সেগুলো সহজেই মুছে ফেলা যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোও এই সমস্যার বিরুদ্ধে খুব সীমিত পদক্ষেপ নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এক্সে ঘোষণা দিয়েছে- যদি কেউ সশস্ত্র সংঘাত নিয়ে এআই নির্মিত ভিডিও পোস্ট করে কিন্তু সেটি ভুয়া বলে উল্লেখ না করে, তাহলে সেই অ্যাকাউন্ট ৯০ দিনের জন্য প্ল্যাটফর্ম থেকে আয়ের সুযোগ হারাবে।
তবে অনেক অ্যাকাউন্টের লক্ষ্য অর্থ উপার্জন নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দেয়া- বলছেন গবেষকরা। ওয়াশিংটনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক ভ্যালেরি ওয়ার্স্টচ্যাফার বলেন, এআই এখন কার্যত তথ্যযুদ্ধের একটি নতুন অস্ত্র হয়ে উঠেছে। যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি তথ্যের জগতেও লড়াই চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এআই নির্মিত ভুয়া কনটেন্ট আরও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। কারণ এগুলো খুব দ্রুত মানুষের মধ্যে আতঙ্ক, বিভ্রান্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম।