এপ্রিল মাসের প্রথম দিনটি বিশ্বজুড়ে ‘এপ্রিল ফুলস ডে’ হিসেবে পরিচিত। এ দিনে অনেকেই কাছের বা পরিচিত মানুষকে বোকা বানিয়ে মজা করার চেষ্টা করেন।
কিন্তু এপ্রিলের প্রথম দিনটি কীভাবে বোকা বানানোর দিন হলো? এ নিয়ে মার্কিন সাময়িকী ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইংরেজিভাষী দেশগুলোয় এপ্রিল ফুলস ডে বা ‘এপ্রিলের বোকা বানানোর দিন’ ব্যাপকভাবে উদ্যাপন করা হয়। তবে ইতিহাসবিদেরা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি, ঠিক কখন থেকে এমন উদ্যাপন শুরু হয়েছে। তবে এটা স্পষ্ট যে, ১৫০০ শতক বা তারও আগে থেকে কোনো না কোনোভাবে এই দিনটি পালিত হয়ে আসছে।
কিছু প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, এপ্রিল ফুলস ডের জন্ম মধ্যযুগের ইংল্যান্ডে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এর মূলে রয়েছে আধুনিক ফ্রান্স। অন্য অনেকের মতে, এই দিনটির শিকড় প্রাচীন রোম বা অন্যান্য জায়গার বসন্তকালীন উৎসবের গভীরে প্রোথিত। এর উৎস নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও দিনটি এখনো একটি ‘রহস্যময়’ দিন হয়ে টিকে আছে।
কেন ১ এপ্রিল? শীর্ষ তিনটি দাবিদার
উৎসের বিষয়টি অস্পষ্ট হলেও কিছু নথিপত্র ইঙ্গিত দেয় যে, এই প্রথাটি ৬০০ বছরেরও বেশি পুরোনো হতে পারে। লোকবিজ্ঞানী স্টিভেন উইনিক তিনটি প্রধান তত্ত্ব তুলে ধরেছেন: একটি ইংল্যান্ডের এবং অন্য দুটি ফ্রান্সের।
ইংরেজ কবি জিওফ্রে চসার ১৩৯০ সালের দিকে প্রকাশিত তাঁর “দ্য নান’স প্রিস্ট’স টেল” কবিতায় একটি মোরগ এবং একটি শিয়ালের গল্প বলেন, যেখানে তারা একে অপরকে বোকা বানানোর চেষ্টা করে। কবিতাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই ঘটনাটি ঘটেছিল মার্চ মাস শুরুর ৩২ দিন পর, হিসাব অনুযায়ী যা ১ এপ্রিল। তবে কিছু পণ্ডিত মনে করেন, মূল পাণ্ডুলিপিতে অনুলিখনের সময় হয়তো কোনো ভুল হয়েছিল, যা ইংল্যান্ডে এই উৎসবের উৎপত্তির দাবিকে কিছুটা দুর্বল করে দেয়।
দ্বিতীয় তত্ত্বটি এসেছে ফ্রান্স থেকে, যেখানে দাবি করা হয়েছে, শত শত বছর ধরে ১ এপ্রিল “পয়সন দ্য’আভ্রিল” বা ‘এপ্রিলের মাছ’ পালন করা হয়। আজও ফ্রান্সে কৌতুকপ্রিয় মানুষেরা অন্যের অগোচরে তাদের পিঠে একটি কাগজের মাছ লাগিয়ে দেন এবং যখন শিকার বুঝতে পারে যে সে বোকা হয়েছে, তখন সবাই ‘এপ্রিল ফিশ!’ বলে চিৎকার করে ওঠে।
এই প্রথাটির লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায় ১৫০৮ সালে ফরাসি কবি ও সুরকার ইলোই ডি’আমেরভালের লেখা একটি কবিতায়, যেখানে তিনি ‘এপ্রিল ফিশ’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন। এই শব্দটি মাছের সঙ্গে বোকা মানুষের সংযোগের প্রমাণ হতে পারে অথবা ১৬ শতকে প্রচলিত কোনো প্রথাকে নির্দেশ করতে পারে।
তৃতীয় এবং জনপ্রিয় তত্ত্বটি হলো ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা পরিবর্তন। ১৫৬৪ সালে ফ্রান্সের তরুণ সম্রাট নবম চার্লস তাঁর রাজ্য সফরে বের হন এবং ১০০টির বেশি শহর পরিদর্শন করেন। ভ্রমণের সময় তিনি লক্ষ্য করেন, বিভিন্ন অঞ্চলে একেক সময় নতুন বছর শুরু হয় এবং উৎসবগুলো ভিন্ন ভিন্ন ক্যালেন্ডার মেনে চলে। তাই তিনি ‘এডিট অব রুসিলিয়ন’ জারি করেন, যা ঘোষণা করে যে ফরাসি নববর্ষ থেকে ১ জানুয়ারি পালিত হবে।
এই তত্ত্বের সমর্থকেরা মনে করেন, এই নতুন ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা (অথবা সম্ভবত ১৫৮২ সালে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ) মানুষের মধ্যে নববর্ষের তারিখ নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল। যারা ১ জানুয়ারির বদলে এপ্রিলেই বছর শুরু করতে চেয়েছিলেন, তাদের ‘বোকা’ বলে ঠাট্টা করা হতো। সেখান থেকেই হালকা ধাঁচের বিদ্রূপ এবং মজার মাধ্যমে এই দিনটি উৎসবের রূপ নেয়, যা পরে ইউরোপসহ অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাচীন বসন্তকালীন উৎসব
১ এপ্রিলের এই তিনটি সম্ভাব্য উৎস নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এগুলো ইঙ্গিত দেয় যে বসন্তকাল বরাবরই মজার কৌতুক ও প্র্যাঙ্ক করার সময় ছিল। যদিও এই প্রাচীন রীতিগুলো সরাসরি এপ্রিল ফুলস ডে-কে অনুপ্রাণিত করেছে কি না তা স্পষ্ট নয়। তবে অনেক প্রাচীন ও আধুনিক বসন্ত উৎসবে ছদ্মবেশ ধারণ বা কৌতুক করার চল রয়েছে।
প্রাচীন রোমে ‘হিলারিয়া’ উৎসব পালিত হতো বসন্ত বিষুবের পর। এর সঠিক উৎসও বেশ ধোঁয়াশাচ্ছন্ন, তবে এর সবচেয়ে পুরোনো উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে। এই উৎসবটি উর্বরতার দেবী সিবেলের (ম্যাগনা মেটার নামেও পরিচিত) সম্মানে আয়োজিত একটি বড় অনুষ্ঠানের অংশ ছিল।
ধর্মীয় ইতিহাসবিদ জ্যাকব ল্যাথামের বর্ণনায় এটি ছিল একটি ‘মুখোশধারী উৎসব বা কার্নিভাল’, যেখানে সামাজিক মর্যাদার বাধা ভেঙে সবাই আনন্দ করত। রোমান ইতিহাসবিদ হেরোডিয়ান উল্লেখ করেছেন, ‘যে কেউ যে কোনো চরিত্রের ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারত; কোনো পদমর্যাদাই এত গুরুত্বপূর্ণ বা একচেটিয়া ছিল না যে কেউ সেই পোশাক পরে নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে বোকা সাজতে পারত না।’
বসন্তকালে পালিত অন্যান্য ‘মজার’ উৎসবের মধ্যে রয়েছে-
হোলি: মার্চ মাসে পালিত হিন্দু বসন্ত উৎসব, যাতে হালকা মেজাজের কৌতুক ও আনন্দ থাকে।
সিজদাহ বেদর: বসন্ত বিষুবের ১৩ দিন পর (২ এপ্রিল) পালিত একটি ইরানি উৎসব। নওরোজ উৎসবের অংশ হিসেবে এই দিনটিতে মজা করতে মিথ্যা কথা বলা বা কৌতুক করার চল রয়েছে, যা এপ্রিল ফুলসের মতোই মনে হয়। ধারণা করা হয়, এর ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৬ অব্দ পর্যন্ত পুরোনো।
১ এপ্রিল কীভাবে এপ্রিল ফুলস ডে হয়ে উঠল, তা কি আমরা কখনো নিশ্চিতভাবে জানতে পারব? সম্ভবত না। লোকবিজ্ঞানী অ্যালান ডান্ডেস ১৯৮৮ সালে লিখেছিলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত ১০০ বছরেরও বেশি সময়ের গবেষণা এই অদ্ভুত প্রথাটি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বা বোঝার ক্ষেত্রে খুব সামান্যই নতুন তথ্য যোগ করতে পেরেছে।’
তবে যা স্পষ্ট তা হলো, শীতের জড়তা কাটিয়ে বসন্তের আগমনে একে অপরের সঙ্গে একটু হাসি-ঠাট্টা ও আনন্দ করার এক অমোঘ টান মানুষের চিরকালই রয়েছে।